স্ট্রেস কেন হয় কীভাবে সামলাবেন

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৭ এএম

নিবরাজ জাহান হুজায়রা

থেরাপেডিট কাউন্সেলর অ্যান্ড সাইকোলজিস্ট, তাকওয়া স্পেশলাইজড হাসপাতাল, ঢাকা।

সুষমা ধরফড় করে বিছানা থেকে উঠে বসল। বুকটা বেশি অস্থির করছে। অবশ্য সারা রাতও ভালো ঘুম হয়নি। অস্থিরতায় গলা শুকিয়ে গেছে। ঢক ঢক করে পানি খেল।

কোনোভাবেই অস্থিরতাটাকে কমাতে পারছে না। বরং হাত-পা কেমন কাঁপছে মনে হচ্ছে। সুষমার এই অস্থিরতা, কারণ আজ তার প্রেজেন্টেশন আছে। এমনিতে অফিসে তার পারফরম্যান্স খারাপ না। কিন্তু এতগুলো মানুষের সামনে তার প্রেজেন্টেশন, যদি কোনো ভুল হয়। সবাই স্ল্যাইডের দিকে, তার দিকে তাকিয়ে থাকবে, যদি বাজে উচ্চারণ করে, যদি থ্রোটব্লক হয়ে যায় বা প্রশ্নোত্তর পর্বে ঠিকমতো আনসার করতে না পারে... ইত্যাদি ভাবতে ভাবতেই তার গত ২-৩ দিন চলে গেছে। আজ যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেই গেল, এখন আর চাইলেও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। সুষমার এই অবস্থাকে Stress বলে। যাকে বাংলায় বলা হয় ‘চাপ’।

মানুষের স্টেস মূলত ৩ ধরনের হয়।

তীব্র চাপ : (Acute Stress) তীব্র চাপ হলো স্বল্পমেয়াদি চাপ, যা আসে এবং চলে যায়। আমরা প্রত্যেকেই মাঝেমধ্যে এ ধরনের চাপের সম্মুখীন হই।

পর্যায় ক্রমিক তীব্র মানসিক চাপ : (Episodic acute stress) কোনো ব্যক্তি যখন বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করে বা রুটিন মেনে না চলার কারণে কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে এবং সেই ঝামেলা থেকে যেই স্ট্রেস তৈরি হয়, সেটাই এপিসোডিক একিউট স্ট্রেস।

দীর্ঘস্থায়ী চাপ : (Chronic stress) আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র ‘fight-or-flight’ অর্থাৎ ‘লড়াই বা পলায়ন’ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে চাপমুক্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারি। ‘ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে আমরা নিজেকে সাহায্য তো করতে পারিই না বরং শরীরের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

স্ট্রেসের কারণ

নানা কারণে স্ট্রেস হতে পারে। দুটো দিক থেকে চাপের কারণগুলো ভাগ করতে পারি। যেমন : বাহ্যিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ চাপ

বাহ্যিক চাপ 

পড়ালেখার তীব্র প্রেশার থাকলে বা কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ বেশি হলে বা বস বা কলিগ কারও দ্বারা ইরিটেড হলে স্ট্রেস হতে পারে।

জীবনের ঘটনাপ্রবাহে বড় কোনো পরিবর্তনের কারণে স্ট্রেস হতে পারে।

ডিভোর্স বা সেটেলড বিয়ে, খুব কাছের মানুষের মৃত্যু, পছন্দের কোন বাসা বা জায়গা পরিবর্তন বা সন্তান প্রসব করা বা হঠাৎ চাকরি হারানো ইত্যাদি।

অর্থনৈতিক সংকট যেমন বর্তমানে জীবনযাত্রার অত্যধিক ব্যয়, ঋণের বোঝা, অপ্রত্যাশিত খরচ যেমন হঠাৎ কারও অসুস্থতার কারণে টাকার প্রয়োজন।

পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন। যেমন কোনো সম্পর্কের ব্রেকআপ হওয়া বা স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার মানসিক বা পারিবারিক দূরত্বসহ যেকোনো সম্পর্কের জটিল টানাপড়েনে চাপ বা স্ট্রেস হতে পারে।

আরও অনেক কারণে স্ট্রেস হয়। অনেকের অতিরিক্ত কোলাহল বা ভিড়ে স্ট্রেস হতে পারে, অনেকের তীব্র আলো বা শব্দে আবার অনেকের অনিয়ন্ত্রিত বা অনিরাপদ জীবনযাপনে তীব্র স্ট্রেস হয়ে থাকে।

অভ্যন্তরীণ চাপ 

ব্যক্তিত্বের ধরনের সঙ্গে এই স্ট্রেসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন perfectionism আচরণ যাদের রয়েছে। সব নিখুঁত হতে হবে, এমন বা ভীষণ রকমের পরিশ্রমী বা কাজ পাগল টাইপের মানুষ (ঞুঢ়ব ‘অ’) ব্যক্তিত্ব এবং যারা সব সময় অন্যকে খুশি করতে বা সুখী দেখতে চায় (People-Pleaser) ব্যক্তিদের স্ট্রেস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

যারা নিজেদের মধ্যে হীনম্মন্যতায় ভোগে। নিজেকে বাজেভাবে বিচার করে বা সহজেই মানসিক ফাঁদে আটকে যায়, যেন সবচেয়ে খারাপ টাই তার সঙ্গে ঘটবে বলে বিশ্বাস করে, তাদের মধ্যে স্ট্রেস বেশি হয়ে থাকে।

ভয় বা উদ্বেগ যাদের বেশি আছে। জনসমক্ষে কথা বলা স্টেজ ফ্রাইট বা প্রেজেন্টেশনের আতঙ্ক যাদের রয়েছে। তা ছাড়া বাসে চড়ে লম্বা জার্নির ভয়, প্লেনে ওঠার ভীতি ইত্যাদি।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন যেমন ধূমপান, মদ্যপান বা মাদক সেবনের মতো কারণে বা অপর্যাপ্ত ঘুম ইত্যাদি কারণে স্ট্রেস বাড়তে পারে মানুষের মধ্যে।

স্ট্রেসে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয় : আমাদের শরীরের অটোমেটিক নার্ভাস সিস্টেম আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হার্ট রেট, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তনসহ অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিক স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আমাদের শরীরকে লড়াই বা পলায়ন প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে চাপপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমাগত মানসিক চাপের মধ্যে কেউ থাকেন। ব্যক্তির মধ্যে শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত মানসিক চাপের লক্ষণ দেখা যায়।

শারীরিক চাপ

বুকে ব্যথা, চাপ অনুভব করা। হার্টবিট বেড়ে যাওয়া,  শরীরে যন্ত্রণা করা। মাথাব্যথা ,ভীষণ ক্লান্ত লাগা, ঘুমের সমস্যা হওয়া। 

পেশিতে টান অথবা চোয়াল শক্ত করে রাখা। ঘুমের মধ্যে দাঁত কামড়ানো বা কিড়মিড় করা। পেটে হজমের সমস্যা হওয়া। পায়খানা পাতলা বা কষা হওয়া। যৌন মিলনে আগ্রহ বোধ না করা ইত্যাদি।

মানসিক চাপ

 বিষন্নতা। উদ্বেগ বা খিটখিটে মেজাজ। প্যানিক অ্যাটাক বা হঠাৎ তীব্র আতঙ্ক। বিষাদ বা দুঃখবোধ।

একই কাজ বারবার করার অভ্যাস তৈরি হওয়া। অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্য ব্যবহারজনিত সমস্যা দেখা দেওয়া। অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস তৈরি হওয়া। অতিরিক্ত কেনাকাটা বা ইন্টারনেট আসক্তি। এ ছাড়াও জুয়া আসক্তি, বাধ্যতামূলকভাবে যৌনমিলনের উৎসাহ বৃদ্ধিসহ আরও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।

স্ট্রেস থেকে মুক্তির উপায়

স্ট্রেস বা চাপ কিন্তু সবসময় খারাপ বা নেতিবাচক নয়। যেসব স্ট্রেস আমাদের কাজে অনুপ্রেরণা জোগায় বা লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে তাদের ইউস্ট্রেস বা ভালো চাপ বলে। কিছু নিয়ম মেনে চলতে পারলে সচেতনভাবে কিছু কাজ বর্জন বা যোগ করতে পারলে আপনি স্ট্রেস মুক্ত থাকতে পারবেন।  মাইন্ডফুলনেসের মাধ্যমে বর্তমানে থাকার চর্চা করা এবং মেডিটেশন করা। প্রতিদিনই ১৫-২০ মিনিট রৌদ্রে হাঁটা ও শারীরিক ব্যায়াম করা। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ব্যালান্স ডায়েট মেনে চলুন। পর্যাপ্ত ঘুম ঘুমানো খুবই জরুরি। অতিরিক্ত চাহিদাকে ‘না’ বলুন। প্রতিদিন নিজের জন্য সময় রাখুন। সেই সময়টাতে মোবাইল, কম্পিউটার এসব থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন। কথা বলুন। নিজের বিশ^স্ত কারও সঙ্গে। না হলে একজন প্রফেশনালের সাহায্য নিন। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। মনে রাখবেন যতই ওষুধ গ্রহণ করেন না কেন, মানসিক চাপ বা স্ট্রেস দূর করার জন্য কথা বলা অর্থাৎ কাউন্সেলর সঙ্গে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখবেন, সঠিক পরিচর্যা ও সচেতনতায় স্ট্রেসকে পাশ কাটিয়ে জীবনকে সুন্দর করা সম্ভব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত