দুই যুগ আগের এক অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের পরিবর্তে কেবল নামের আংশিক মিলের কারণে মো. আলমাস নামের এক নির্দোষ ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ এক বছর কারাবাস করার পর অবশেষে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। রবিবার (৮ নভেম্বর) বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার এই আদেশ দেন।
নাম ও বাবার নামের হুবহু সাদৃশ্যের সুযোগ নিয়ে ভুল ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ায় নিজের নিরপরাধিতা দাবি করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন কারাগারে থাকা আলমাস। এই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট একটি চার সপ্তাহের রুল জারি করে, যেখানে প্রকৃত আসামির বদলে আলমাসকে গ্রেপ্তার করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং তাকে কেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় ও ঠিকানা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ওই আদেশের পর ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে অনুসন্ধান সম্পন্ন করে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়।
জবানবন্দি ও নথিপত্র বিশ্লেষণ শেষে প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, ২০০২ সালের ওই বিতর্কিত অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছ এবং গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস সম্পূৰ্ণ ভিন্ন দুজন ব্যক্তি। গ্রেপ্তারকৃত আলমাস ওই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না কিংবা তিনি মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও নন।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য ও বক্তব্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে উঠে আসে যে, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নেই এবং তিনি বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে জানান, পুলিশ ও তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রাথমিক গাফিলতি এবং নাম ও বাবার নামের অত্যাধিক মিলের কারণেই মূলত এই মারাত্মক পরিচয় বিভ্রাটের সৃষ্টি হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে প্রধান তিনটি কারণ হিসেবে দুই ব্যক্তির গ্রামের নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের মিল এবং ২০০২ সালের মামলার নথিতে তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ভুল ঠিকানা লিপিবদ্ধ করাকে দায়ী করা হয়েছে।
মূলত প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের আদি বাড়ি ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়ায়ির গ্রামে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী আলমাসের পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল একই উপজেলার বাহ্ রা গ্রামে। তদন্ত কর্মকর্তা ২০০২ সালের মামলায় আসামি চালানের সময় পূর্ব ধোয়ায়িরের পরিবর্তে অসতর্কতাবশত ভুল ঠিকানা লেখায় পরোয়ানা জারির সময় থেকে বিভ্রান্তির সূত্রপাত হয়।
এছাড়া প্রকৃত আসামির বাবার নাম খলিলুর রহমান বা আবুল খায়ের হলেও গ্রেপ্তার আলমাসের বাবার নাম ছিল শেখ খলিল। বাবার নামের এই আংশিক মিল এবং পুলিশের গাফিলতি পরিচয় নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে মারাত্মক গোলযোগ তৈরি করে।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বিকালে দোহারের সুন্দরীপাড়া এলাকা থেকে পুলিশ আলমাসকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পরপরই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ও স্বজনরা পুলিশকে নিশ্চিত করেছিলেন যে আলমাস প্রকৃত আসামি নন। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি পাঠিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি এবং নির্দেশ পালনের দোহাই দিয়ে আলমাসকে আদালতে চালান করে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালে মিরপুর থানায় করা অস্ত্র মামলায় আলমাছকে রিভলবারসহ গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তীকালে তিনি জামিনে গিয়ে আত্মগোপন করেন এবং ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন।
ভুক্তভোগী আলমাস এই ঘটনায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করে অবিলম্বে মুক্তি ও সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। হাইকোর্টের আজকের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের ফলে নিদারুণ ভুল ও অবহেলার শিকার আলমাসের এক বছরের কারাবাসের অবসান ঘটছে।