কুয়াকাটার সুরক্ষিত এলাকায় বেড়েছে লাল কাঁকড়া

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১২ এএম

প্রকৃতির অনন্য উপহার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। এখানের অন্যতম আকর্ষণ সৈকতে চিকচিক করা বালিয়াড়িতে লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। নিজের তৈরি বাসা থেকে বেরিয়ে ছোটাছুটি এবং পা দিয়ে নানান আকৃতির তৈরি আল্পনা পর্যটকদের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। অথচ অবাধ পর্যটন, হইচই আর যানবাহনের চাকায় প্রতিনিয়ত থেঁতলে যাচ্ছিল লাল কাঁকড়ার শান্ত নীড়। তবে এবার আশার আলো দেখাচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা।

কুয়াকাটার সৈকতে সামান্য সুরক্ষা আর মানুষের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করতেই ঘটেছে চমকপ্রদ পরিবর্তন। অসংরক্ষিত অঞ্চলের তুলনায় সুরক্ষিত এলাকায় মিলেছে প্রায় ১৯ গুণ বেশি কাঁকড়ার গর্ত!

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই তথ্য প্রমাণ করছে মানুষের একটু সচেতনতা আর সঠিক পদক্ষেপই জীববৈচিত্রকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ফিরিয়ে দিতে পারে সৈকতের প্রাণ।

‘কুয়াকাটার বালুকাময় সৈকতে লাল কাঁকড়ার প্রাচুর্য ও আচরণের ওপর মানুষের বিচরণজনিত প্রভাব হ্রাসে সংরক্ষণ উদ্যোগের ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণায় কুয়াকাটার লেম্বুরবন, চর গঙ্গামতি ও চর বিজয় এলাকায় কাঁকড়ার গর্তের ঘনত্ব ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর এ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘রিজিওনাল স্টাডিজ ইন মেরিন সায়েন্স’-এ।

এতে গবেষকরা ৬ হাজার ৫৭৫টি গর্ত নথিভুক্ত করেন। ফলাফল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত এলাকায় গর্তের ঘনত্ব অসংরক্ষিত অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ১৯ গুণ বেশি। গবেষণা ফলাফল অনুযায়ী, সৈকতের সংবেদনশীল এলাকায় মানুষের বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করে কাঁকড়ার আবাসস্থল সফলভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এজন্য বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে সংরক্ষণব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যটকদের নির্দিষ্ট চলাচলের পথ নির্ধারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও জনগণকে এই সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।

‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, সংরক্ষিত এলাকায় কাঁকড়ার গর্তের ঘনত্ব বেশি হওয়ার প্রধান কারণ মানুষের বিচরণ ও অন্য বাহ্যিক বিরক্তি কম থাকা।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, লাল কাঁকড়া শুধু কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বালুতে গর্ত তৈরির মাধ্যমে এরা মাটির গঠন ও বায়ু চলাচলে ভূমিকা রাখে। মৃত জৈব পদার্থ ও ক্ষুদ্র প্রাণী খাওয়ার মাধ্যমে পুষ্টি উপাদানের পুনঃচক্রায়ন এবং খাদ্যজালের ভারসাম্য রক্ষায়ও অবদান রাখতে পারে।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামীম রেজা বলেন, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি ও চর বিজয়সহ যেসব এলাকায় কাঁকড়ার বিচরণ বেশি, সেখানে সংরক্ষণ, নিয়মিত পাহারা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পর্যটকদের ভ্রমণের শুরুতেই কাঁকড়ার পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝাতে হবে এবং কাঁকড়া ধরে ছবি তোলা থেকে বিরত রাখতে হবে।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি কাঁকড়ার আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি। নির্বিচারে পর্যটকদের বিচরণ, কাঁকড়া ধরে ছবি তোলা এবং সৈকতে বর্জ্য ফেলার মতো কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আবাসস্থল সংরক্ষণে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।

বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম মনিরুজ্জামান বলেন, চর বিজয়, লেম্বুরবন ও গঙ্গামতি এলাকায় বর্তমানে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থলের অবস্থা সন্তোষজনক রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত