সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এবং সড়কে ককটেল উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক উত্তাপের জের ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে আবারও ছড়ানো হচ্ছে ককটেল আতঙ্ক। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে রাজধানীর ব্যস্ততম চারটি পৃথক পয়েন্টে পরপর আটটি শক্তিশালী ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া প্রগতি সরণির কোকাকোলা ক্রসিং এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। জনমনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চালানো এ সিরিজ বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও নগরজুড়ে বিরাজ করছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। রাত নামলেই রাজধানীবাসীর আতঙ্ক বাসে আগুন কিংবা ককটেল বিস্ফোরণ। প্রায়ই সড়কের কোথাও না কোথাও ঘটছে নাশকতার ঘটনা। এসব ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তথ্যমতে, চলতি নভেম্বর মাসের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ১৫টি স্থানে ১৭টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া গত সাত দিনে ঢাকাতেই ৩টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ প্রসঙ্গে ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করছে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন স্থানে ককটেলসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, রাজপথের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ধাপে ধাপে এসব হামলার ছক সাজাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। রাজধানীতে এক রাতেই ছয়টি পৃথক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আদাবর, খিলগাঁও, বিমানবন্দর, মিরপুরের কালশী ও শাহবাগ এলাকায় এসব বিস্ফোরণ ঘটে। এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরও রয়েছে। একের পর এক এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরের ভেতরে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। খিলগাঁও থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, সদর দপ্তরের ভেতরে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আশপাশের কোনো বাসার ছাদ অথবা নিচের কোনো স্থান থেকে ককটেলটি নিক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে। শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দরের গোলচত্বরে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, উড়াল সেতু থেকে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই রাতে মিরপুরের কালশী মোড়েও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিওতে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে করে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
এ বিষয়ে মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, কারা এ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে রাজধানীর শাহবাগেও পুলিশের ডিউটি গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটে শাহবাগ থানাধীন আইবি গেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা পুলিশের ডিউটি গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১২টা ১ মিনিটের দিকে শাহবাগের জুলাই চত্বরের পাশেও আরেকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এভাবে একই রাতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ করছে।
তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীদের দমনে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। অভিযানে প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সড়কে নীরবতার সুযোগে আবার আবাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা টার্গেট করে ঝটিকা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, মিরপুর, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে। মেরুল বাড্ডা, শাহজাদপুর ও মিরপুর এলাকায় তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা প্রতিটি স্পটের আশপাশের ট্রাফিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করছি। নাশকতা সৃষ্টিকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এ ব্যাপারে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃৃষ্টির উদ্দেশ্যে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যাতে মানুষ ভয় পায়। আবার আতঙ্ক ছড়ানো কিংবা কাউকে হুমকি দিতেও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এসব বিস্ফোরক ব্যবহার করে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করা হয়। পুলিশের কাছে আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঠিক তথ্য না থাকা কিংবা অপ্রস্তুত অবস্থার কারণেও এসব হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
জানা যায়, রাজনৈতিক সংঘাত কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণ একসময় ছিল ঢাকা শহরের আতঙ্ক। মানুষ বাইরে বের হয়ে গাড়িতে চড়তেও ভয় পেত। মাঝে কয়েক বছর এটা কম ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ককটেল বিস্ফোরণ। শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। পাড়া-মহল্লার সংঘর্ষেও ফুটছে ককটেল, যেটা আগে খুব বেশি দেখা যায়নি। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য একটি চক্র সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নেই, এমন জায়গা টার্গেট করা হচ্ছে।
ঢাবিতে মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় গতকাল রবিবার সন্ধ্যার পর আট থেকে ৯টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে টিএসসি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া রাজধানীর পল্লবী থানা প্রাঙ্গণে ও সিআইডি কার্যালায়ের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এসআরবির এক সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। রবিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঢাবিতে ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে প্রক্টর ও সহযোগী অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, আট থেকে ৯টি ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, নীলক্ষেত, সিনেট ভবনের গেটে, বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের মাঝখানের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণ হয়। সন্ধ্যা সোয়া ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে এসব ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজন হলেন নাটোরের রেজাউল করিম, রাজশাহীর সোহেল রানা ও গোপালগঞ্জের নাজমুস সাদ।
এদিকে রাজধানীতে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণকে পরিকল্পিত নাশকতা বলে অভিহিত করেছেন ডিএমপির মুখপাত্র ডিসি আকতার হোসেন। গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে তিনি বলেন, ‘একটি গ্রুপ নাশকতা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এসব কর্মকান্ড চালাচ্ছে বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য রয়েছেন। প্রতিটি এলাকায় বিশেষ নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে, যেন অপরাধীরা কোনো প্রকার সুযোগ নিতে না পারে। মানুষের মধ্য থেকে আতঙ্কের ছাপ দূর করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।’
ভাটারায় স্কুল বাসে আগুন : রাজধানীর ভাটারায় সড়কের পাশে পার্কিং করা জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাসটিতে আগুন লাগার খবর পায় ভাটারা থানা পুলিশ। ঢাকায় দুই দিনে এ নিয়ে তিনটি বাসে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেল। শনিবার রাতে দুটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।