চার বছরের ছোট্ট ইভানাকে নিয়ে সেতু-আসলাম দম্পতি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পাড়ি দিয়েছে বিশ বছর আগে। স্কিলড ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত বাবা-মায়ের উদ্বেগের অন্ত নেই ইভানার লেখাপড়া নিয়ে। স্কুলে পাঠানোর পর থেকেই গভীর মনোযোগ ও উৎসাহের সঙ্গে লক্ষ্য করে যাচ্ছে উন্নত এ দেশটির পড়াশোনা পদ্ধতির ধরন। মেয়ে যতই ওপরের ক্লাসে উঠছে, বিস্ময়ের সঙ্গে এ দম্পতিটি খেয়াল করছে যে, বিভিন্ন দফায় শিক্ষাব্যবস্থার গুণাগুণ মাপতে রাষ্ট্রীয় বা বোর্ড পর্যায়ে যতগুলো পরীক্ষা হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সাহিত্য এবং গণিতকে! অবশ্য, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষাকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গেও যেন-বা সাহিত্যের গাঁটছড়া বেঁধে দিতে চাইছে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা।
অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক এবং গণিতবিদ ড. মিজান রহমান, যিনি সাহিত্য এবং দর্শনের গভীর পাঠক এবং লেখালেখির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তিনি বলতেন, আসলে গণিতও একপ্রকার সাহিত্যই! নিচু শ্রেণিগুলোতে সেটা চট করে ধরা না পড়লেও উচ্চতর গণিত সাহিত্য থেকে দূরের কিছু নয়। বরং গণিত এবং সাহিত্য একে অপরের পরিপূরক। একটি ধারা অপর ধারাটিকে পুষ্ট করে! একটি ধারার দুর্বলতা অপর ধারাটিকে দুর্বল করে। তার এই বক্তব্যের পেছনে ব্যাখ্যাটি অনেকটা এ রকম যে, শেষ পর্যন্ত যে কোনো একটা সমস্যাকে ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করে গণিত। সাহিত্য মানুষকে একরকম করে ব্যাখ্যা করে, গণিত আরেক রকম ভাবে। সবই হলো জীবনযাপনকে ব্যাখ্যা করা, এগিয়ে নেওয়া এবং সমস্যার সমাধান খোঁজা। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন, যদি কানাডার শিক্ষাব্যবস্থায় গণিতের ব্যবহার এবং চর্চা খেয়াল করে থাকেন। এদের গণিতে প্রচুর লিখিত অংশ বা ব্যাখ্যামূলক ব্যাপার থাকে। অনেকটা গণিতের ভেতর সাহিত্যকে মিলিয়ে দেওয়ার মতো।
সাহিত্য ও ভাষাজ্ঞান আসলে কী করে! ভাষাজ্ঞান মানুষকে তথ্য পরিষ্কার করে বুঝতে ও আত্মস্থ করতে সাহায্য করে। মানুষের নিজেকে, পরিপার্শ্বকে এবং সমাজকে ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা তৈরি করে। সবল ভাষাজ্ঞানের অভাবে একজন মানুষের নিজের পূর্ণ বিকাশ হয় না। সে পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়াদিতেও সম্পূর্ণ মাথা খাটাতে পারে না। বিশেষ করে, মৌখিক ও লিখিত যোগাযোগের বেলায় কোনো চিন্তা সঠিকভাবে বোঝা, আয়ত্ত করা এবং প্রত্যুত্তর করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। তার ওপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ডিজিটাল যোগাযোগ প্রক্রিয়া পুরোদমে চেপে বসেছে আমাদের ওপর। প্রিন্ট বা ডিজিটাল মিডিয়াম যাই হোক না কেন, ভাষাজ্ঞান আয়ত্তে থাকলে উন্নয়ন ও যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়। একজন মানুষের নিজস্ব যে যোগ্যতা সেটারও বিকাশ ঘটতে পারে না পর্যাপ্ত ভাষাজ্ঞান দখলে না থাকলে। নিয়মিত সাহিত্য-পাঠ ও অন্যান্য বইয়ের পাঠ ভাষাজ্ঞানকে মসৃণ ও সমৃদ্ধ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত শতকের শেষ থেকে শুরু করে আজ অবধি ভাষাজ্ঞানকে কতখানি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে, কানাডার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণিতে সাহিত্য ও ভাষার দক্ষতার ওপর পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষ হিসেবে ভবিষ্যতের তরুণরা কতটুকু উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার খতিয়ান হিসাব করা। হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের একটি শর্ত এই ‘লিটারেসি টেস্ট’। লিটারেসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর প্রভিন্সের লক্ষ্যমাত্রার কম হলে হইচই শুরু হয়।
লিটারেসি পরীক্ষা নিয়ে সরকার কেন এত উদ্বিগ্ন থাকে? সাহিত্য, বিশেষ করে নিয়মিত লিখিত টেক্সট না-পড়া অথবা না-শোনার সঙ্গে মানুষ হিসেবে পিছিয়ে পড়ার যোগ রয়েছে। এরা তথ্য বিশ্লেষণ এবং তা কমিউনিকেট করতে পারে না। গুছিয়ে কোনো একটা চিঠি বা মেসেজ ভালোভাবে লিখতে পারে না, চাকরির দরখাস্ত করতে পারে না, সাধারণ ফাইলিং করতে অসুবিধে হয়, একটি মোটামুটি জটিল লেখা পড়ে বুঝতে পারে না। একজন মানুষের প্রতিদিনের যোগ্য জীবনযাপনে যেসব বুদ্ধিমত্তা ও চালচলন দরকার, সাহিত্য আত্মস্থ না-করা মানুষগুলোর জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে না। দুর্বল পড়া এবং লেখা, সেই সঙ্গে গণিতের দুর্বলতা একজন মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী করে ফেলে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পার না। সাহিত্য এবং ভাষাজ্ঞানের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নতুন নতুন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন দক্ষতা শেখার যে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে, মানুষের ওপর সেগুলো তারা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারে না। ইন্টারনেটের কল্যাণে নতুন পৃথিবী সম্পর্কে তথ্য আপডেট থাকার যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগ এরা নিতে পারে না।
‘প্রোগ্রাম ফর দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অফ অ্যাডাল্ট কমপিটেন্সিস’ (পিআইএসিসি) এর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কানাডার সিনিয়র সিটিজেনদের প্রায় অর্ধেকের এই দুর্বলতা রয়েছে। তারা স্কুল শেষ করার পর যেসব পেশায় গিয়েছেন সেগুলোতে সাহিত্যপাঠ ও ভাষাচর্চার সুযোগ ছিল না। তারা এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও সাহিত্যপাঠ থেকে দূরে ছিলেন। ভাষাজ্ঞানের ব্যাপারটা সাইকেল চালানো শেখার মতো কোনো ব্যাপার না যে একবার শিখলেই হয়ে গেল। এর নিয়মিত চর্চা থাকা দরকার। কানাডার অনেক চাকরির বেলাতেই ভাষাচর্চার ব্যাপারটা উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে। ফলে দেখা গেছে, এই সব মানুষরা এক পর্যায়ে ভাষার দক্ষতা মোটামুটি হারিয়ে ফেলেছেন এবং ব্যক্তিগত ও কাজের জায়গার সমস্যা সমাধানে খুবই দুর্বল ভূমিকা পালন করছেন। এই সব সিনিয়ররা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে নতুন বিশ্বকে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন প্রচুর সংখ্যায় এবং সর্বতোভাবে ছিটকে পড়েছেন পরিবর্তিত বিশ্ব ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে। এরা একই কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ও সক্রিয়ভাবে জড়াতে পারছেন না। মোদ্দা কথা, পরিবর্তিত পৃথিবী ও পরিবেশের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
স্ট্যাটিসটিকস-কানাডার ২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিতান্ত বেসিক ভাষাজ্ঞানের পরীক্ষায় প্রতি ৬ জনের ভেতর ১ জন ফেল করছে। প্রায় অর্ধেক কানাডীয়র স্ট্যান্ডার্ড ভাষাজ্ঞান নেই। ইন্টারন্যাশনাল স্কিল অ্যাসেসমেন্টে আরও দেখা গেছে, ভাষাজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চায় কানাডা জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও হল্যান্ডের চেয়ে পিছিয়ে আছে। কভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সম্ভাব্যতার আলোচনায় আবারও সাহিত্যচর্চার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কভিড-পরবর্তী অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ভাষাজ্ঞান চর্চায় পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে সমস্যা হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
কথা হচ্ছে, যোগ্য মানুষ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর একটি দেশ সাহিত্যকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে! গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত এবং দৈব দুর্বিপাকে যেসব দেশ অবিচল থেকে সামাল দিচ্ছে সেসব দেশের মানুষরা সাহিত্য এবং ভাষাজ্ঞানে তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ। উন্নয়নের এই সূচকে কানাডা খানিকটা পিছিয়ে আছে জি-৭ দেশগুলোর তুলনায়। যদিও গত তিন-চার দশকে কানাডিয়ান সরকার ভাষাজ্ঞান বাড়ানোর ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, তারপরও পুরনো জেনারেশনের মানুষদের পিছিয়ে পড়াটা ঠেকানো যায়নি।
সে কারণেই কভিড-উত্তর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আলোচনায় সাহিত্য যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন কর্মক্ষম মানুষের প্রতিদিনের জীবনের যেসব মৌলিক যোগ্যতা অত্যাবশ্যক তার ভেতরে ভাষা ও সাহিত্যের দক্ষতা অন্যতম। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে হলে চিন্তা, সামাজিক যোগাযোগ, নতুন কিছু শেখার দক্ষতা, জটিল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে নিয়োজিত রাখতে হয়। কিন্তু স্কুল-কলেজের পর আর সাহিত্য কিংবা ভাষাচর্চার সঙ্গে যোগাযোগবিহীন নাগরিকরা এসব জায়গায় পিছিয়ে পড়ে। আর সাহিত্যজ্ঞানসমৃদ্ধ মানুষ সমাজে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে সক্ষম হয়। সেটা শুধুমাত্র চাকরির বেলায়ই নয়, সামাজিক সমস্যা সমাধানে, সম্পর্কের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় চিন্তার যে সুসংহত প্রকাশ দরকার তা এই মানুষগুলোর বেলায় বেশি কার্যকর থাকে। যেহেতু, ভাষার বড় একটা অংশ প্রকাশে এদের দখলদারিত্ব থাকে, কাজেই জীবনের নানা বাঁকে সেটা কাজে লাগে। ফলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলা সবখানেই সাহিত্যপাঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হচ্ছে।
লেখক : কানাডায় কর্মরত নার্স ও প্রবাসী সাংবাদিক
