পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ৩০ মার্চ খুলছে না দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে ঈদুল ফিতরের পর আগামী ২৩ মে। সে হিসেবে ৪৩০ দিন পর স্কুল-কলেজ ও ৪৩১ দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলতে যাচ্ছে। দেশে চলমান করোনা মহামারীতে সম্প্রতি নতুন করে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কভিড-১৯-সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির সঙ্গে পরামর্শক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে নতুন এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময় অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। উল্লেখ্য, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক উপস্থিতি বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি (২০২১) আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাশেষে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন করোনার নমুনা শনাক্তের হার ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। কিন্তু কয়েক দিন ধরেই শনাক্তের হার বাড়ছে। ২৪ মার্চ নমুনা শনাক্তের হার ছিল ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। কভিড-সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শ ছিল করোনার নমুনা শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার।
গত বছরের মার্চে বন্ধ হওয়ার পর কয়েক ধাপে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ২২ জানুয়ারি ২০২১ করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে গাইডলাইন প্রকাশ করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এ গাইডলাইন অনুসরণ করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতিও নিতে বলা হয়েছিল। স্কুল-কলেজগুলোয় পাঠানো ৩৯ পাতার গাইডলাইনে বলা হয় যে, ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্কুলগুলো প্রস্তুত রাখতে, যাতে যেকোনো মুহূর্তে সেগুলো খুলে দেওয়া যেতে পারে। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতির রূপান্তর পুরো পরিস্থিতিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। শিক্ষাসচিব জানিয়েছেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এখনো সেটাই অগ্রাধিকার পাবে।’ ১৫ এপ্রিল ২০২১ থেকে পবিত্র রমজান শুরু হতে পারে। এ সময় সাধারণত স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে। ঈদের ছুটির পর ২৪ মে বিশ^বিদ্যালয় এবং ১৭ মে থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলো খোলার ঘোষণা দেওয়া আছে। সে ক্ষেত্রে আগামী দিনে করোনার সংক্রমণ কমে গেলে ঈদের পর বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গেই স্কুল-কলেজ খোলা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সম্প্রতি ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত রাখতে হবে। যেকোনো পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হবে।
অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না পারায় চলতি বছরের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সিলেবাস এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত করে আনা হয়েছে। সব বিদ্যালয়ের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা বাতিল করে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। বাতিল করে দেওয়া হয়েছে ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলের ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা। ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষাও বাতিল করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্কুল-কলেজ এ মুহূর্তে খোলা হলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। যে কারণে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাও ১৬ মার্চ এক আদেশে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের পরীক্ষাগুলো আপাতত স্থগিত থাকবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে। এভাবে ২০২০ ও ২০২১ শিক্ষাবর্ষে ল-ভ- হয়ে গেছে সর্বস্তরের শিক্ষাসূচি।
প্রত্যক্ষ হিসেব নিয়ে দেখেছি, এনজিও পরিচালিত ও সরকারের ‘সেকেন্ড চান্স’ এডুকেশনের বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীদের কোনো হদিস কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না, তার মানে হচ্ছে তারা আর স্কুলে আসছে না। ঠিকমতো পড়াশোনা ও মূল্যায়ন ছাড়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে উঠে গেছে। রয়ে গেছে বিশাল লার্নিং গ্যাপ। কিন্তু দেশের শিক্ষার্থীদের এই ভয়াবহ ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে সেই ধরনের কোনো বিশদ পরিকল্পনা দৃশ্যমান হচ্ছে না।
সাধারণত বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যালয়ে নানা-ধরনের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বনভোজনসহ বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকেন। এগুলোও শিক্ষা জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ। এবার এসব কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হলো না, আর অ্যাকাডেমিক বিষয়ে তো হাতই দেওয়া গেল না। কী হবে শিক্ষার্থীদের? কী হবে শিক্ষার? গত বছরের মে মাস থেকে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোয় অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষা ও জুলাই মাস থেকে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকা, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হয়নি। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলোয় নতুন ব্যাচের ভর্তিও পিছিয়ে গেছে।
জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় অন্তত ৫০০ পরীক্ষা স্থগিত করেছে। বড় ধরনের সেশনজটে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। এসব কারণে করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্রচণ্ড বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে, গ্রাম-শহর ও ধনী-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। শহরের শিক্ষার্থীরা টেলিভিশনের ক্লাস না দেখলেও অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস করছে। এমনকি পরীক্ষাও দিচ্ছে। অনলাইনে প্রাইভেট পড়ছে অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েরা। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এসবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিদ্যালয় খোলা থাকলে অন্তত কিছু না কিছু তারা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা পেত, সেটি না থাকায় প্রচলিত গ্যাপ বেড়েই চলেছে। এক দশক ধরে পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাসূচি অনুযায়ীই চলছিল শিক্ষাব্যবস্থা, হঠাৎই সেখানে ছেদ পড়ল। প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। ফল প্রকাশের পর মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়েই বিশ^বিদ্যালয়ে প্রবেশ করত শিক্ষার্থীরা। পুরো বিষয়ই থমকে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অনলাইন ব্যবস্থা যে সেই অর্থে উন্নত নয় এবং একটি বিশেষ অংশকে সঙ্গে নিতে পারছে না, এটাই নির্মম বাস্তবতা। আবার অ্যাসাইনমেন্ট যে প্রকারে জমা দেওয়া হচ্ছে, তাও আমাদের অজানা নয়। কাজেই এই দুটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করে আমরা প্রকৃত লার্নিং ক্রাইসিসকে এড়াতে পারছি না।
শিক্ষা ক্ষেত্রের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের কী করা উচিত, কীভাবে করা উচিত এবং কাদের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত তা নিয়ে বিশদ আলোচনা ও নানা ধরনের মূল্যায়ন করা উচিত এখন। এজন্য শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ কমিশন গঠন করা উচিত সরকারের।
লেখক : শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষক