বিলম্বে চাল আমদানিতে ত্রিমুখী ক্ষতি

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২১, ১১:৪২ পিএম

গত ২৯ মার্চ দেশ রূপান্তরে লিড নিউজ করা হয়েছে চাল আমদানি নিয়ে; বলা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করে পাঁচ মাস বিলম্বে চাল আমদানি করা হচ্ছে। এটা সত্য হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিশ্চয়ই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আমার এই নিবন্ধ সেটা নিয়ে নয়, বরং বিলম্বে চাল এলে আমাদের কী কী সমস্যা ও অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে, সেটা নিয়ে। গত ২৯ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি কলামে এ রকম একটা আশঙ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেটা এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। খবরটায় আরও বলা হয়েছে যে, চাল আমদানিতে সুবিধা করতে না পেরে সরকার এখন ভরসা করছে ঝুঁকিপূর্ণ বোরো ফসলের ওপর। এই তথ্যটি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে এই বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা করব।

খবরে বলা হয়েছে যে, সরকারি-পর্যায়ে ১১ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। এ পর্যন্ত চুক্তি হয়েছে ৯ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ১.৯৫ লাখ টন দেশে এসেছে। আরও দেড় লাখ টন চাল আমদানির জন্য চুক্তিপত্র সম্পাদন প্রক্রিয়াধীন। আমার প্রশ্ন হলো চুক্তি করা এবং সামনে চুক্তিতব্য চালের কতটুকু আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে দেশে এসে পৌঁছাবে। মে মাস থেকে বোরো ধান কাটা শুরু হয় এবং জুন মাসের মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়। পরপর দুই মৌসুমে দাম ভালো থাকায় এবার বোরোর আবাদ বেড়েছে। এখন পর্যন্ত আবাদের অবস্থা ভালোই দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বছর বেশি চাল উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে দেশে ফসল খারাপ হওয়ার কোনো আশঙ্কা দেখি না।

মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানের চাল সরকারি ভাণ্ডারে আসা শুরু হবে। ফলে আমদানি করা চালের ওপর ভরসা করতে হবে মাত্র মাত্র এক-দেড় মাস, অর্থাৎ এপ্রিল মাস ও মে মাসের সর্বোচ্চ ১৫ দিন। এই দেড় মাসে সরকারি-পর্যায়ে আর কতইবা চালের প্রয়োজন হবে সর্বোচ্চ তিন থেকে চার লাখ টন। চুক্তি করা চালের মধ্যে এপ্রিল মাসে তিন-চার লাখ টন এলেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট। কারণ, সরকারি ভাণ্ডারে এখনো চালের মজুদ চার লাখ টনের কিছু ওপরেই রয়েছে। এজন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের উচিত এপ্রিল মাসের মধ্যে চুক্তি-করা চালের যতটা সম্ভব দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। এপ্রিল মাসের পরে যে চাল পাওয়া যাবে, তা আমদানির উদ্দেশ্য তো পূরণ করবেই না, বরং তা উল্টো সমস্যা বাড়াতে সহায়তা করবে। এজন্য এই অবেলায় নতুন করে চাল আমদানির চুক্তি করা হলে তাতে মজুদের স্থান সংকট সৃষ্টি হবে এবং অকারণে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়বে; এটা এড়াতে নতুন চুক্তি না করা এবং আগের চুক্তিগুলোর সময়সীমা বৃদ্ধি না করাই হবে সমীচীন। 

প্রতিবেদনটিতে বোরো ফসলকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে তার ওপর ভরসা করা কঠিন মন্তব্য করে পরোক্ষভাবে এই অসময়ে চাল আমদানিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমি বিনয় সহকারে এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। একসময় এ দেশে আমন ধান ছিল প্রধান ফসল, বোরো আবাদের পরিমাণ তখন ছিল যৎসামান্য। আমন রোপণ করা হয় বর্ষা ও শরৎকালে যখন বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে হরহামেশা। গত বছর আমন ফসলের যে ক্ষতি হয়েছিল, তার কারণ ছিল একাধিক বন্যা। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তারও অন্যতম কারণ ছিল বন্যায় বারবার তখনকার প্রধান ফসল আমনের ক্ষয়ক্ষতি। পক্ষান্তরে শীতকালের শুকনো মৌসুমে বোরো ধান রোপণ করায় তখন প্রাকৃতিক দৈব-দুর্বিপাক থাকে না বলেই চলে। ফলে আমনের চেয়ে বোরো ফসল অধিকতর নির্ভরযোগ্য। তবে এই ফসলটা যখন কাটা হয়, তখন বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়, মাঝেমধ্যে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়। আবার হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা হলে তাতেও কিছু ধানের ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে মোট উৎপাদনের তুলনায় এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়। অবশ্য ২০১৭ সালে বৃহত্তর সিলেটের হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢলে যে আগাম প্লাবন হয়, সেটা ছিল অবশই ব্যতিক্রম; যুগে হয়তো একবার-দুবার এ জাতীয় অঘটন ঘটে থাকে, যার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বাংলাদেশ আজ যে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, তার পেছনে সেচনির্ভর স্থিতিশীল বোরো ফসলের প্রবৃদ্ধির ভূমিকাই প্রধান। খাদ্য বিভাগও তাদের খাদ্যশস্য সংগ্রহের শতকরা ৮৫ ভাগ অর্জন করে বোরো মৌসুম থেকে। এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ফসল; এখন উৎপাদনের পরিমাণ ১ কোটি ৯০ লাখ থেকে ২ কোটি টন। কাজেই এটা অবশই ভরসার জায়গা। কোনো কারণে যদি এই মৌসুমের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নাও হয়, তবে সে ঘাটতি পূরণে আমদানি করতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। 

এবার আবাদের পরিমাণ ও তার অবস্থা ভালো হওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১২ থেকে ১৪ লাখ টনের কম হওয়ার কথা নয়। এর মধ্যে একটা অংশ হবে ধান। চালের চেয়ে ধান সংরক্ষণে দেড় গুণেরও বেশি জায়গার প্রয়োজন হয়। খাদ্য অধিদপ্তরের মোট কার্যকর সংরক্ষণ ক্ষমতা ২০ লাখ টন। এর মধ্যে সাইলোর ২.৭৫ লাখ টন ধারণক্ষমতায় শুধু গম সংরক্ষণ করা যায়। মাঠপর্যায়ের গুদামগুলোয় গম ও খালি বস্তা মজুদে বেশ কিছু জায়গা ব্যয় হয়। আবার কিছু কিছু গুদাম এমন সব জায়গায় অবস্থিত যেগুলো কৌশলগত কারণে ব্যবহারের উপযোগী হয় না। বরিশাল অঞ্চলে অনেক সংরক্ষণাগার রয়েছে, যেখানে তেমন কোনো বোরো সংগ্রহ হয় না। আবার শেরপুরের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত শ্রীবরদী এবং ঝিনাইগাতী এলএসডির পর্যাপ্ত খালি জায়গা ব্যবহারের জন্য উল্টোপথে পণ্য পরিবহন করলে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়। ঠাকুরগাঁওয়ের লাহিড়ী হাট এলএসডিরও একই অবস্থা। এ রকম আরও অনেক সংরক্ষণাগার রয়েছে। ফলে তেরো-চৌদ্দ লাখ টনের বেশি জায়গা সামনের বোরো মৌসুমে সংগ্রহকাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। এর মধ্যে যদি মে ও জুন মাসে আমদানির অবশিষ্ট সাত-আট লাখ টন চলে আসে, তবে তা আমাদের এখনকার মতো নিষ্ফলা সময়ের চাহিদা তো মেটাবেই না, বরং সরকারি গুদামে খালি জায়গার পরিমাণকে অর্ধেকে নামিয়ে আনবে; অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে চাষিরা ধানের প্রণোদনামূলক মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে। শুধু তা-ই না, এই চাল যখন দেশে গ্রহণ করা হবে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ফসলের আবির্ভাবে চালের দামও কমে যাবে। কিন্তু চড়া দামের সময় করা চুক্তির ওই হারেই মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ফলে আমাদের ত্রিমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

প্রতিবেদনটিতে বিলম্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কৃষি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগত ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। ‘কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে তৃণমূলপর্যায়ের মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ধান মজুদ রয়েছে’ এই জাতীয় তত্ত্ব কীসের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং খাদ্য বিভাগ কেন তা অতিসরল ভেবে গ্রহণ করল তা আদৌ বোধগম্য নয়। বিগত বছরের বোরো মৌসুমে রেকর্ড দুই কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও খাদ্য বিভাগ শেষের দিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। আমন মৌসুমের শুরু থেকেই সব স্বাভাবিকতাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে চালের মূল্য বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটা জরিপ শেষে সংবাদ সম্মেলন করে জানান দেয় যে, আমন ফসলের অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ লাখ টন ক্ষতি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও কৃষি বিভাগের তথ্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের পেশাদারির পরিচয় বহন করে না। খাদ্যশস্যের উৎপাদন তথ্যের জন্য তাদের কৃষি বিভাগ নয়, এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিসংখান ব্যুরোর ওপর নির্ভর করা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো পরিসংখ্যান ব্যুরোইবা কতটা বস্তুনিষ্ঠভাবে তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উপস্থাপন করতে পারে, তা অবশই বিবেচনার দাবি রাখে; এ বিষয়ে মাঝেমধ্যেই তাদের কৃষি বিভাগের সঙ্গে দেনদরবার করতে দেখা যায়। এজন্য খাদ্য বিভাগকে তাদের অভিজ্ঞতা ও পেশাদারি দিয়ে এ ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও পেশাদারি নিয়ে পরিচালনার জন্য ২৮টি ক্যাডারের সঙ্গে ১৯৮১ সালে বিসিএস (খাদ্য) ক্যাডার সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা আর জিইয়ে রাখা নিয়োগবিধির জটিলতায় এই ক্যাডার এখনো তার শৈশবকাল শেষ করতে পারছে না; কর্মকর্তারাও অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এখানে এখনো শীর্ষপদে যারা নিয়োগ পান, তারা বাইরে থেকে এসে দু-এক বছর কাজ করে আবার বাইরে চলে যান। ফলে তারা সব সময় মুদ্রার একটি পিঠ দেখতে পান; এর বিপরীত যে আরেকটি পিঠ রয়েছে, তা তারা বিবেচনায় নিতে পারেন না। ফলে কিছুদিন পর পর চক্রাকারে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ২০১৭ সালে কৃষকদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে দীর্ঘ দেন-দরবারের পর চাল আমদানির ওপর আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক লম্বা ব্যবধানে দুই দফায় যখন কমানো হলো, তত দিনে পানি অনেক ঘোলা হয়ে গিয়েছিল; উৎস ও গন্তব্য উভয় প্রান্তে দাম বেড়ে গিয়েছিল। এবারও ৬২.৫ শতাংশ শুল্ক কমাতে গিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় কৃষকদের চিন্তায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ল; পাটিগণিতের লাভ ক্ষতির অঙ্কের মতো মূল্য বেশি লিখে আকর্ষণীয় ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে বেশি লাভ করতে চাইল। কৃষি বিভাগের কাজ খাদ্য বিভাগ করতে গিয়ে নিজের ব্যবস্থাপনাকে নাজুক করে ফেলল।

খাদ্য ক্যাডারের এই দুরবস্থার কারণে এখানকার অনেক জ্যেষ্ঠ মেধাবী কর্মকর্তা ভাগ্যান্বেষণে তদবির করে উপসচিব হয়ে কনিষ্ঠদের অধীনে কাজ করতে হবে জেনেও নিজ ক্যাডার ত্যাগ করে থাকেন। ফলে এই ক্যাডারে পেশাদারির বিকাশ ঘটছে না; উন্নত ও মানসম্মত সেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এই ক্যাডারের খোলনলচে বদলিয়ে আধুনিক যুগের উপযোগী করে কাঠামো পুনর্গঠন ও পেশাদারির বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই শুধু এই স্পর্শকাতর সেক্টরে সেবার মান উন্নত করা সম্ভব। আশা করি সরকার এ সেক্টরের স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত এর মানোন্নয়নে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবেন।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত