বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, তার দিকে বিশ্বের অর্থনীতির বোদ্ধারা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল। বিগত অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) যখন তাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রকাশ করে, তখন আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশীসহ আমরা নিজেরাও কম বিস্মিত হইনি। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, কভিডের আগ্রাসনে ২০২০ সালে ভারতের ১০.৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হওয়ায় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে যায়; এ সময় বাংলাদেশিদের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়ায় ১৮৮৭.৯৭ মার্কিন ডলার, আর ভারতীয়দের ১৮৭৬.৫৩ মার্কিন ডলার; যদিও একই প্রতিবেদনের উপাত্তের ভিত্তিতে হিসাব করা ক্রয় ক্ষমতার সমতা (purchasing power parity) অনুযায়ী বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের জন্য এর পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮৬১.৪৫ ও ৫৯৪৪.৬৯ মার্কিন ডলার। এরপর বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে আসে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সুখবর; বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির (CDP) দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক সভায় স্বল্পোন্নত দেশের ক্লাব থেকে স্নাতক হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার সুপারিশ পেয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে আগামী ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নের কৈশোর-ক্লাব থেকে বের হয়ে দৃপ্ত পদে যৌবনে পদার্পণ করবে। এজন্য তার পরিবৃত্ত কৌশল হতে হবে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তসমর্থ ও বহুমুখী, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশগত ভাবে টেকসই। অন্যথায় মধ্য আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ যখন দ্বিতীয় দফায় সিডিপির সুপারিশ পায়, তখন তিনটি মানদণ্ড অর্থাৎ মাথাপিছু স্থূল জাতীয় আয় (GNI), অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক (EVI) ও মানব সম্পদ সূচক (HAI) এর মধ্যে যে কোনো দুটি অর্জন করতে পারলেই যথেষ্ট ছিল; কিন্তু তিনটিতেই পর্যাপ্ত প্রান্তদেশসহ পাস করে সে যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। এর মানে এই নয় যে, এই পথ পরিক্রমায় তার কোনো দুর্বলতা নেই; এখানে অনেক দুর্বলতা আছে। মানুষের শৈশব ও কৈশোরে যেরূপ দ্রুত শারীরিক প্রবৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ঘটে, কিন্তু যৌবনে তেমনটা হয় না; তখন সামান্য পরিবর্তনের জন্য অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। রাষ্ট্রের বেলাতেও তাই। এর ওপর অতিমারীর দ্বিতীয় তৃতীয় ছোবল কত বিষ ঢালবে, তার হিসাব কেউ জানে না। সেই জন্য তার দুর্বলতা, শক্তিমত্তা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে ২০২৬ পর্যন্ত উপযুক্ত পরিবৃত্তি কৌশল নেওয়া হলে উত্তরণ যেমন হবে মসৃণ, তেমনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের উন্নয়ন তৎপরতাও পাবে দৃঢ় ভিত্তি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি কুশীলবদের সক্ষমতা গড়ে তোলা। আনুষ্ঠানিকভাবে স্নাতক হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পর ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এখন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমাদের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি বাণিজ্য অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের পর আমরা শুধু এই অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারই হারাব না, তখন প্রতিটি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়া ও লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে আমদানি-রপ্তানি পরিচালনা করতে হবে। মেধাস্বত্বের বাণিজ্যিক শর্তগুলোর শিথিল প্রয়োগের স্থলে শুরু হয়ে যাবে কঠোর ও ব্যয়বহুল প্রতিপালন। এখন যেমন শুধু পেয়ে যাচ্ছিলাম, দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ছিল না। তখন কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হবে। আর এই দেওয়া ও নেওয়ার ফলে অর্থনীতিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে কী প্রভাব পড়বে তা অগ্রভাগে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। পণ্যের মান উন্নত করতে হবে, শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে, নেগোশিয়েশনের দক্ষতা বাড়াতে হবে, অবকাঠামো উন্নত করতে হবে, সর্বোপরি ব্যয়ের দক্ষতা এবং মান বাড়াতে হবে।
এই কাজগুলোর স্বল্প ও মধ্য মেয়াদি অংশ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অনেক সহায়ক ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য Enhanced Integrated Framework (EIF) এর আওতায় বাংলাদেশ স্নাতকোত্তর ৫ বছর সহায়তা পেয়ে থাকবে। প্রযুক্তি ব্যাংকের কাছ থেকেও অনুরূপ সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে। স্নাতক হওয়ার পর জলবায়ু তহবিল থেকে সহায়তা না পেলেও প্রভাবিত দেশ হিসেবে বিশেষ জলবায়ু তহবিল ও সবুজ জলবায়ু তহবিলে প্রবেশাধিকার থাকবে। ২০২০ সালে Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights (TRIPS) এর কাউন্সিল সভায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্নাতকোত্তীর্ণ দেশগুলোকে মেধাস্বত্বের বাণিজ্যিক শর্তগুলোর কঠোর প্রতিপালন থেকে ২০৩২ পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম বাংলাদেশ বিগত দশকে প্রায় আড়াই ডজন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বাস্তবোপযোগিতা যাচাই করে দেখেছে, কিন্তু একটার সঙ্গেও চুক্তি করতে পারেনি। কারণ, এই সব অনুশীলনের আগে ঐ সব দেশের সঙ্গে আমাদের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য রয়েছে কি না, বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে তারা আদৌ আগ্রহী কি না, সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যাচাই করা এই সব দেশের মধ্যে কেন একটিও চুক্তিতে আগ্রহী হয়নি, আর কেনই বা যাচাই কাজের মধ্যে নাইজেরিয়া, জর্ডান, মালি, মেসিডোনিয়া, মৌরিতাসের মতো অকিঞ্চিৎকর বাণিজ্যিক ভূখণ্ড গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে স্টাডিতে স্থান পেল, তার সদুত্তর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ভালো দিতে পারবে। এই জাতীয় কমিশন কী উদ্দেশ্য সাধন করবে, তা বোঝার জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই।
ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। তাদের সঙ্গে বছরে এখন বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যেখানে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি আকাশচুম্বী। ২০১৮- ১৯ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে রপ্তানি করে ৯.২১ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ সেখানে করে ১.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। আমাদের রপ্তানির তালিকায় রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র পণ্য। বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করতে সেখানে রপ্তানি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অথচ ২০১৭ সাল থেকে ভারত আমাদের পাট পণ্যের ওপর প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫১.৭২ মার্কিন ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে রেখেছে। অনুরূপ ডিউটি আরোপ করে রেখেছে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও ফিশিং নেটের ওপর। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিষয়টি আধাবিচারিক (quasi-judicial); এতে আলোচনা করে সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও গত মার্চ মাসে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দুদেশের মধ্যে সচিব পর্যায়ের যে সভা হলো, সেখানে বাংলাদেশ পক্ষ বেশ জোরেশোরে বিষয়টি উপস্থাপন করে। ভারতীয় পক্ষ কূটনৈতিক কৌশলে হাসিমুখে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানোর কথা বলে প্রসঙ্গের ইতি টানেন।
আইন ও বিধিগত বিষয় হওয়ায় বাংলাদেশের উচিত এই জাতীয় বাণিজ্য বিবাদ মিটানোর জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার Dispute Settlement Body (DSB) তে মামলা দায়ের করা। জলসীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে বিবাদ ছিল, তা নিয়ে বাংলাদেশ মামলা করলে হেগের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালে যে রায় দেয়, তাতে বিবাদমান ২৫,৬০২ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশ পায় ১৯,৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার।
মামলা না করায় বাংলাদেশের দুর্বলতা দেখে ইন্দোনেশিয়া বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে সে দেশে বাংলাদেশি তৈরি-পোশাক পণ্য আমদানিতে প্রতি পিসে ০.৩৮ মার্কিন ডলার থেকে ১১.২৯ মার্কিন ডলার রক্ষাকবচ শুল্ক (Safeguard duties) আরোপ করে। সামনের দিকে এই জাতীয় বিবদমান বিষয় নিয়ে বাংলাদেশকে হাজার হাজার মামলায় লড়তে হবে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, অর্থ ও সময়। এজন্য এখন থেকেই এগুলোর চর্চা শুরু করে হাত পাকাতে হবে।
বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো তার মানুষ। এদেশের মানুষ বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী, কষ্টসহিষ্ণু, উদ্যমী এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাসম্পন্ন। আজ এই দুঃসময়েও তারা অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার তাগড়াই রিজার্ভ ধরে রেখেছে। গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলের মাঝে দূরত্ব হ্রাস উন্নয়ন কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ সহজ করে ফেলেছে। আবার অতিরিক্ত জন-ঘনত্ব এবং তাদের সহজাত আবেগ ও অস্থিরতা মাঝে মধ্যে পরিস্থিতিকে করে ফেলে টালমাটাল। এদেরকে মানব সম্পদে রূপান্তর করে কাজে লাগাতে পারলে যেমন দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব, তেমনি এদের অংশ বিশেষ অবহেলিত থাকলে তারা শুধু জঞ্জালেই পরিণত হবে না; বরং হয়ে উঠতে পারে ভঙ্গুরতা ও বিনাশের অমোঘ নিয়ামক। কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের উৎপাদনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। সেদিন খবরের কাগজে দেখলাম লালমনিরহাটের অজপাড়াগাঁয়ে মেয়েরা পর্যন্ত অনলাইনে ফ্রি লান্সিং করে স্বাবলম্বী হয়ে পড়েছে।
আমাদের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের যে শিক্ষাদান করে যাচ্ছে, সে সব পাঠের বর্তমানে কি আদৌ কোনো উপযোগিতা আছে? বেকার সমস্যার এই দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান সেক্টর তৈরি পোশাক শিল্পের ১৬ শতাংশ ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্মী এখনো বিদেশ থেকে আনতে হয়। সেখানে তেমন কোনো গবেষণা পরিচালিত হয় না, অথচ দ্রুত পরিবর্তনশীল এই যুগে সর্বাধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি আহরণ, সৃজন ও সেগুলো বিতরণ খুবই জরুরি। দেশে পর্যাপ্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে নীতি সমর্থন ও নীতি-স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা ও দেশে তাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা। সবার ওপর প্রয়োজন সুশাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
মোদ্দা কথা, উন্নয়নের এই পর্যায়ে আর কোনো আত্মপ্রসাদ বা বাগাড়ম্বর নয়, মন্ত্র সাধনের অঙ্গীকার নিয়ে এগোতে হবে; শরীর পতনের কোন মওকা রাখা যাবে না। তা হলেই কেবল আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক