হেফাজতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৭ পিএম

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘদিনের সন্ধি কি তবে ভেস্তে গেল? জামায়াত-বিএনপির মতো হেফাজতকেও কি তবে ক্ষমতাসীনরা শত্রুর কাতারে ঠেলে দিল? ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর মধ্যেও একের পর এক হেফাজতের শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এখন দেশের অন্যতম একটি বৃহৎ ধর্মীয় সংগঠন। এই সংগঠনের রয়েছে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক। ২০১৩ সালের মে মাসের পর থেকে এই সংগঠনটির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের এক ধরনের বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সংগঠনটি সরকারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর সমালোচনার পথে এগোয়নি। বরং নানা সময়ে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা ও দাবি-দাওয়া আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় গত ২৬ মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। হাটহাজারী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের থানা আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার নানা ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি হয়েছে কমপক্ষে ১৭ জনের। এ সময় হেফাজত নেতাদের মুখে সরকার পতনের হুমকিও উচ্চারিত হয়।

এরপরই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। হেফাজত ও আওয়ামী লীগ সরকার মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। সরকার লকডাউন ঘোষণার সময় অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোও বন্ধ রাখার জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করে। তারপর শুরু হয় হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তারের পালা। এরই মধ্যে প্রায় ডজনখানেক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রমজান মাসে হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার করাটা নিঃসন্দেহে দুঃসাহস। কারণ ‘পবিত্র রমজান মাসে সরকার আলেম-ওলামাদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করছে’ এমন একটা প্রচারণা বা হুজুগ তুলে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত সৃষ্টির এটা একটা সুযোগও বটে। বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা এই হুজুগ তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা মোটেও সুবিধা করতে পারেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় হেফাজত নেতারাও সম্ভবত ভীত হয়ে পড়েছে। তারাও খুব একটা মাঠ গরম করার সুযোগ পায়নি। এমনকি হেফাজত নেতাদের ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে কোনো মিছিল পর্যন্ত বের হয়নি।

হেফাজত ইস্যুতে ক্ষমতাসীনরা অবশ্য অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংস ঘটনার সঙ্গে সরাসরি ও নেপথ্যে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ২০১৩ সালে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে যে সহিংসতা হয়েছিল, সেই মামলাগুলোও সামনে এনে জড়িতদের আইনের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে সরকার ও প্রশাসন।

অতিমাত্রায় রাজনীতি করতে গিয়ে হেফাজতে ইসলাম এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। হেফাজতের বর্তমান আমির বাবুনগরী, যিনি সারাক্ষণ সরকারবিরোধী বুলি উচ্চারণ করে থাকেন, তিনিও ঘোষণা দিয়েছেন যে, আমরা সরকারবিরোধী নই। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানো এটা আমাদের এজেন্ডা নয়। বাবুনগরী নরম সুরে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার না করার জন্য।

হেফাজতের অন্য নেতারাও প্রাণপণে সরকারের সঙ্গে আপস করতে চাইছেন। নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়ে এবং সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দফায় দফায় তদবির করছেন তারা। আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে মানাতে চেষ্টাও করে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। গত ১৯ এপ্রিল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা। তারা গণগ্রেপ্তার বন্ধ এবং মাদ্রাসা খুলে দেওয়ার জন্য স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান। স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গণগ্রেপ্তার হচ্ছে না, অপরাধে জড়িতদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এবার হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে সরকার আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছে বলে মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কিছু প্রবীণ নেতা এবং ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও হেফাজতের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। ১৪ দলের শরিকদের অনেকেই মনে করেন, হেফাজতিরা মূলত ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে, ইসলামকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্ব কওমি মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষকদের প্ররোচিত করে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুর, সরকারি অফিস-আদালত, ভূমি অফিস, পুলিশ স্টেশন, বিদ্যুৎ অফিস, শিশুদের বিদ্যালয়, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত যানবাহনে ও ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। ২০১৩ সালের ৫ মে তাণ্ডবের পরই হেফাজতের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ছিল বলেও কেউ কেউ মতপ্রকাশ করেন।

কোনো ধর্মের ‘হেফাজত’ করার জন্য একটা সংগঠন লাগে, এই ‘প্রয়োজন’ বা আইডিয়া বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমাদের এই হুজুগের দেশে সেটা আছে এবং দিন দিন তা শক্ত-পোক্ত হচ্ছে। হেফাজত দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখে ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন বলে দাবি করলেও হেফাজত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রীতিমতো রাজনীতি শুরু করে দিয়েছেন। তারা ২০১৩ সালের ১৩ মে সরকার পতনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে, ধর্মের চেয়ে তাদের মধ্যে ‘রাজনীতির হেফাজত’ করার আগ্রহ বেশি। এর জন্য অবশ্য দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাই দায়ী। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ হেফাজতকে ক্ষমতায় থাকার কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি মনে করে। ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতাসীনদের উচ্ছেদ করতে হেফাজতের কাঁধে ভর করেছিল। কিন্তু সেটা তারা পারেনি। এরপর থেকেই ক্ষমতাসীনরাও হেফাজতিদের সমীহ করে চলার নীতি গ্রহণ করে। কলাটা-মুলোটা দিয়ে নানা কায়দায় তাদের বশীভূত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু শাহ আহমদ শফী মারা যাওয়ার পর ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হেফাজতিদের সন্ধি ভেঙে যায়। বাবুনগরী ও মামুনুলরা নেতৃত্ব দখল করার পর থেকেই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের নানা ইস্যুতে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

আমাদের দেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেকটাই চন্দ্রের মতো। সূর্যের আলোয় আলোকিত। আর এই সূর্য হচ্ছে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াতের বিকাশ ঘটেছিল বিএনপির ওপর ভর করে। হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনেও ছিল বিএনপির ভূমিকা। ২০১৩ সালে হেফাজতের মহা-উত্থানের পেছনেও ছিল জামায়াত-বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়-মদদ-সমর্থন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে জামায়াতের তাণ্ডবের পর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে এদের কর্মতৎপরতা ও বিকাশ অনেকটাই ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীও অনেকটাই কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু হেফাজত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পক্ষের প্রশ্রয় পেয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

আওয়ামী লীগ যদি হেফাজতের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে এই সংগঠনটির পরিণতিও জামায়াতের মতো হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে শুধু প্রশাসনকে ব্যবহার করে এই ধর্মীয় শক্তির উত্থান ঠেকানো যাবে না। এর জন্য আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সবার আগে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কী করে, কী পড়ে, কোত্থেকে টাকা আসে, এসব বিষয় মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের মতো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে (বেফাক) শক্তিশালী করতে হবে। কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এবং হাইয়াতুল উলয়া থেকে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

যেসব ধর্মীয় নেতা ওয়াজ-নসিহত-বয়ানের নামে লাখ লাখ টাকা আয় করেন, বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, তাদের অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে এনবিআরকে কাজে লাগাতে হবে। ধর্ম কারবারিরা বিনা পুঁজির এই ব্যবসায় প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও এরা রাষ্ট্রকে কখনো ট্যাক্স দেয় না। এদের ট্যাক্সের আওতায় আনলে আস্ফালন এমনিতেই কমে যাবে।

দেশের সবগুলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা দরকার। তাহলে কেউ টাকা যেমন মেরে খেতে পারবে না। টাকার জোরে ‘রাজনীতির হেফাজত’ করার আকাক্সক্ষাও কমে যাবে। দরিদ্র মাদ্রাসা ছাত্রদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজের স্বার্থের সেবাদাস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সে ক্ষেত্রে কমে যাবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত