ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ০৩:২৩ এএম

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদিরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই ইহুদিবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা। সেই সময় প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ছিল তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। এটি মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত ইতিহাসে ১৪ মে, ২০১৮ ছিল আরেকটি বিষাদময় দিন। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করছিল। আর সেদিন গাজা পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে সেদিন গাজায় নিহত হয় ৫৮ জন। আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এক দিনে এত বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি। সেই দিনটি ছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। ১৯৪৮ সালের এই দিনটিতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি হচ্ছে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়ের দিন। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেদিন ইসরায়েলে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। প্রতি বছর দিনটিকে তারা ‘নাকবা’ দিবস হিসেবেই পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্র যে তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে এসেছে, সেটিও খুবই বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পর তা ফিলিস্তিনিদের মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে। ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই সেখানকার অধিবাসী লাখ লাখ আরবের ওপর নেমে আসে অনিঃশেষ বিপর্যয়। 

এমনকি ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে জোরপূর্বক দখলদারি নিয়ে যাত্রা শুরু করে ইসরায়েল হিব্রু বাইবেলের পুরোকথার দোহাই পেড়ে ‘ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে আসা’র মধ্য দিয়ে। সেই থেকে এক অনিঃশেষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয় ফিলিস্তিনিরা, যা আজও চলছে। আর তাই প্রতি বছর ১৫ মে ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবস হিসেবে পালন করে। এবারের নাকবা দিবসও এসেছে জায়ানবাদী তথা উগ্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের ৭৩তম জন্মবার্ষিকীর পাশ ঘেঁষে। এসেছে গাজায় ইসরায়েলের বিমান-বোমা হামলা-নিধনযজ্ঞ আর জেরুজালেমে হারাম-আল-শরিফ প্রাঙ্গণে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন-দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে।

এ নিয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদ খুব চমৎকার একটা কথা বলেছিলেন পৃথিবীর সব সন্ত্রাসের মূলেই ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে, সেখানের ৯০ ভাগ আরব জনগণকে উৎখাত করে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টিই হচ্ছে আধুনিক সন্ত্রাসবাদের শুরু। ইসরায়েলকে থামাতে না পারলে সারা দুনিয়াকে সন্ত্রাসমুক্ত করা যাবে না। কারণ ইসরায়েল হচ্ছে সারা দুনিয়ার সন্ত্রাসের মূল উৎস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্য যে, এই বাস্তবতাটা আরব বিশ্বের নেতারা এখনো বুঝলেন না, বা বুঝতে চাইলেন না। অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে রইলেন। তা না হলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিসর, কুয়েত, জর্ডানসহ আরও যেসব আরব দেশ আছেÑ তারা কেন নিষ্ক্রিয়? এ নিয়ে ফিলিস্তিনিদেরও অভিযোগের শেষ নেই। যে আরব বিশ্বের প্রতি তাকিয়ে আছে ফিলিস্তিনি মজলুম জনতা সেই আরবরাই ফিলিস্তিনিদের দিকে মুখ তুলে তাকায় না। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে বৈঠক করছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া।

মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থা ওআইসি। এটি তো একটি নামসর্বস্ব সংগঠন। যে ওআইসির জন্মই হয়েছিল মসজিদে আকসা এবং ফিলিস্তিনের জন্য। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানটি গত ৫২ বছরে ফিলিস্তিনের জন্য কিছুই করল না! আর গত এক দশকে তো নেতৃত্বের লড়াইয়ে আরও অকেজো হয়ে পড়েছে এই সংগঠনটি। ওআইসিতে তুরস্কের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব।

পশ্চিমা সেই তথাকথিত মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারা সুন্দর করে দোষ চাপিয়ে দিলেন ওই নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ওপর। ইউরোপ এবং আমেরিকার রাজনৈতিক নেতারা কি নির্লজ্জভাবে ফিলিস্তিনি সাধারণ জনগণকে দোষারোপ করলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কয়েকদিন আগে তথাকথিত সেই আর্মেনীয় গণহত্যার স্বীকৃতিদানকালে কী বলেছিলেন। আমি মানবতার এবং মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছি। সুতরাং সারা বিশ্বে মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নিতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু এখন ফিলিস্তিনে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, কোথায় তার সেই মানবাধিকার?

প্রশ্ন হচ্ছে, তুরস্ক কী করছে এই ফিলিস্তিনিদের জন্য? এক কথায় যদি বলি তাহলে বলতে হবে কিছুই না। নেতারা বিবৃতি বক্তৃতা দিচ্ছে, জনগণ মিছিল-মিটিং করছে ঠিকই কিন্তু আসলে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেই তুরস্কের পক্ষ থেকে। তাহলে কোথায় সেই নতুন করে খেলাফত ফিরে আসার আষাঢ়ে গল্প আর নতুন আরেক সালাহউদ্দিন আইয়ুবির ফিরে আসার স্বপ্ন? যে তুরস্ক, লিবিয়ায়, সিরিয়ায়, ইরাকে, আজারবাইজানে, সোমালিয়াতে এমনকি ইউক্রেনেও লড়াই করছে বিশ্বের অনেক পরাশক্তির বিরুদ্ধে সেই তুরস্ক, সেই এরদোগান কেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছে না? আর কতদিন অপেক্ষা করবে। আর কত রক্ত ঝরাতে হবে ফিলিস্তিনিদের? ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু মাত্র ছোট্ট একটি দেশ বা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে পুরো এক পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অনেক সময় বলা হয়, আরবরা যদি খালি থুতু ফেলে তাতেই ইসরায়েল তলিয়ে যাবে। কথাটিতে যুক্তি আছে। খুবই ছোট একটি দেশ ইসরায়েল। কিন্তু এখানে ইসরায়েল মানে আমেরিকা, ইসরায়েল মানে ব্রিটেন, ইসরায়েল মানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

বর্তমানে জেরুজালেমের একটি এলাকায় ইসরায়েলি পুলিশ এবং ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের জেরে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা বিরাজ করার পর এই লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছে। ওই এলাকা মুসলিম এবং ইহুদি দুই ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র। কিন্তু গাজা ভূ-খন্ডে ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা তীব্র আকার নিয়েছে। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতি একটা পূর্ণাঙ্গ মাত্রার যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে।

লেখক : গবেষক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত