বছরের পর বছর নদী বা সমুদ্রের পানিতে ফেলা হচ্ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য। আর ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিক দ্রব্য। যা বছরের পর বছরেও নষ্ট হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন প্লাস্টিকসামগ্রী ক্ষয় হতে হাজার বছরেরও বেশি সময় লাগে। অথচ যেখানে সেখানে প্লাস্টিক দ্রব্য ফেলা হয়। এতে মাটি দূষিত হয়। আর নদী ও সমুদ্রে গড়িয়ে সেসব পানি দূষিত করছে। প্লাস্টিকের মধ্যে অনেক ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে। যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্লাস্টিকে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ প্রাণিস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। এসব পদার্থ সরাসরি বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিছু কিছু প্লাস্টিকে ডিইএইচপি নামক পদার্থ থাকে। যা থেকে ক্যানসার রোগের সৃষ্টি হয়। প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্যরে ক্ষতিকর পদার্থ মানবস্বাস্থ্য এবং প্রাণিস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি। মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এসব পদার্থ। শিশুর বিকাশ ব্যাহত হয় এতে। এভাবে চললে দেশ সুনাগরিক পেতে ব্যর্থ হবে। তাই এখনই ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য হচ্ছে ক্রটিপূর্ণ এবং অব্যবহার্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এগুলো মূলত ভোক্তার বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। যেমন- ফ্রিজ, ক্যামেরা, মাইক্রোওয়েভ, কাপড় ধোয়ার ও শুকানোর যন্ত্র, টেলিভিশন, ক¤িপউটার, মোবাইল ফোন, ইত্যাদি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালে একটি প্রতিবেদন মোতাবেক ২০১৮ সালে দেশে মোট ৪ লাখ টন বৈদ্যুতিক ও বৈদ্যুতিক বর্জ্য জমা হয়। এর মধ্যে কেবল ৩ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিং শিল্পে ব্যবহার করা যায়। বাকি ৯৭ শতাংশই যেখানে-সেখানে ফেলা হয়। পরিকল্পিত ভাগাড়ে ফেলা হয় খুব কমই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে ই-বর্জ্য বাড়ছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এই ই-বর্জ্য বছরে ৪৬ লাখ টনে দাঁড়াবে। যা বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে যেতে পারে। এ জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা হাতে নেওয়া মঙ্গলকর হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে নিয়মনীতিহীন ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ থেকে মানবস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং পরিবেশ দূষণ হতে পারে। রসায়নবিদদের মতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ডিভাইসের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে বর্জ্যও বাড়ছে। এই বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে রাখলে ‘এসিডিক কন্ডিশন’ তৈরি হয়। যা পরে মাটির স্তর ভেদ করে পানির স্তর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে যায়। ই-বর্জ্যে থাকে বিভিন্নরকম ক্ষতিকর পদার্থ। সিসা, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, পারদ, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), আর্সেনিক, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি) ইত্যাদি অন্যতম। এই ক্ষতিকর পদার্থ মাটি, পানি ও বায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়ে মানুষের জন্য বিষাক্ত এক উপাদান সৃষ্টি করে। এগুলো আমরা দেখতে পাই না বলে এদের ভয়াবহতা স¤পর্কে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু এগুলো নীরব মারণবিষ! যারা এগুলো সংগ্রহ করে, এগুলো নিয়ে কাজ করে, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও মারাত্মক।
একটি তথ্য দিয়ে বিষয়টির ভয়বাহতা বোঝা যেতে পারে। কেবল একটি সেলফোনে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়ামই ছয় হাজার লিটার পানি দূষণ করতে পারে। এতে ব্যবহৃত অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান যেমন সিসা, বেরিলিয়াম ক্যানসার, যকৃত ও স্নায়ুযন্ত্রের ক্ষতি করে। ডিসপ্লে ও বোর্ডে ব্যবহৃত পারদ বা মার্কারি মস্তিষ্ক ও কিডনি নষ্ট করে। গবেষণায় দেখা যায় যে, এক চা-চামচ পারদে বিশ একর জমির পানি দূষিত হতে পারে। ভেবে দেখুন একবার আমাদের অজান্তেই কত বড় দূষণ ঘটছে! সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। আর বাড়ছে স্বাস্থঝুঁকির হার। উন্নয়নশীল দেশের ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত শ্রমিক সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও অনেক বেশি। এ-সমস্ত বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন প্রক্রিয়াতে শ্রমিকরা ভারী ধাতুর সং¯পর্শে যেন না আসে, সে ব্যাপারে অত্যন্ত যতœবান হওয়া উচিত।
২০১৪ সালে জাপানে অবস্থিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় The Global E-waste Monitor 2014: Quantities, Flows and Resources শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বলা হয় যে বিশ্বে প্রতি বছর ৪ কোটি টনেরও বেশি ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সারা বিশ্বের ই-বর্জ্যরে এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। ভারত ই-বর্জ্য উৎপাদনে বিশ্বে ৫ম। ভারতে ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয় বছরে ২০ লাখ টন। কিন্তু ই-বর্জ্যে অনেক অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু ও অন্যান্য উপাদান আছে, যেগুলো পুনঃচক্রায়ন করা সম্ভব। লোহা, তামা, সোনা, রূপা, অ্যালুমিনিয়াম, প্যালাডিয়াম থাকে ই-বর্জ্য।ে প্রতি বছর বিশ্বে ই-বর্জ্য বৃদ্ধি পায় প্রায় ১০ শতাংশ হারে। অন্যদিকে এই বর্জ্যরে শতকরা ৫ ভাগের বেশি পুনরুদ্ধার করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া যথাযথ না হলে ই-বর্জ্য হতে তৈরি হওয়া নতুন সামগ্রীও পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের মধ্যে সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি রাসায়নিক থাকে। এসব রাসায়নিক দেশের মাটি ও পানিকে দূষিত করছে। নানাভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এবং নানারকম ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে গর্ভবতী মা ও শিশুদের ঝুঁকি বেশি ই-বর্জ্য খুবই ক্ষতিকর। ই-বর্জ্যরে কারণে অপরিণত শিশুর জন্ম নেওয়া, শিশুর ওজন কম হওয়া, এমনকি মৃত শিশুর জন্ম দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ই-বর্জ্যরে সিসা নবজাতকের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। শিশু বড় হলে ফুসফুস, শ্বাসতন্ত্র, থাইরয়েড জটিলতা, ক্যানসার এবং হৃদরোগের মতো বড় রোগের জটিলতায় পড়ে।
সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রিক এবং প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়েই যাচ্ছে। কিন্তু এসব থেকে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য এখনই সময়োপযোগী নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা দরকার। একই সঙ্গে এই আইন প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। সেটা করতে হলে এসব পণ্য উৎপাদন, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কো¤পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে চুক্তির আওতায় আনতে হবে। এসব বর্জ্য সংগ্রহ করা এবং পরিবেশবান্ধবভাবে পুনঃব্যবহার উপযোগী করার কাজেও তাদের চুক্তিবদ্ধ করতে হবে। ভাগাড় তৈরি করতে হবে পরিকল্পিতভাবে। এক্ষেত্রে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। সর্বোপরি জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক