মাধ্যমিকে ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্ট

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১০:১৭ পিএম

শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক শিক্ষার্থী যারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় তাদের জন্য একটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা পাস করার পর যেসব শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় তাদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ ওই শ্রেণির সিলেবাসের সঙ্গে এবং হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না। তার একটি বড় কারণ হচ্ছে তারা বিশাল লার্নিং গ্যাপ নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং একপর্যায়ে গিয়ে ঝরে পড়ে। দারিদ্র্যে পড়ে ঝরে পড়ার এটি আরেকটি বড় কারণ। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘এসইএসডিপি’ প্রজেক্টের মাধ্যমে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই এরিয়াগুলোকে কীভাবে অ্যাড্রেস করা যায় যাতে তারা পড়াশোনায় আনন্দ পায় এবং ভালোভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে সেই লক্ষ্যে ‘ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্ট’ নামক নতুন একটি প্রস্তুতি-পর্ব শুরু করতে যাচ্ছে। বিষয়টি আসলেই প্রশংসনীয়। তবে, এর সঙ্গে অনেক বিষয় চলে আসে।

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার ৯৭-৯৮ শতাংশ এবং উত্তীর্ণ প্রায় ৯৬.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকপর্যায়ে তথা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হচ্ছে। বিগত দশ বছরে মাধ্যমিকপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলেও এখনো ষষ্ঠ শ্রেণিতে আগত ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণি শেষ না করেই এবং প্রায় ৩৬.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক/সমমান শেষ না করেই ঝরে পড়ছে। আর এর কারণ কিন্তু শুধু দারিদ্র্য নয়।

২০২০ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী এই স্কিম পর্যালোচনা করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই আলোকে স্কিমটি সংশোধন করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমের রূপরেখা চূড়ান্ত হলে ‘ইমপ্রুভিং স্টুডেন্টস রেডিনেস ফর সেকেন্ডারি এডুকেশন অ্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস’ স্কিমটি চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিএমসি কমিটির মতামতের জন্য পাঠানো হবে। গত ২ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী, শিক্ষাসচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) এবং শিক্ষাসচিব (মাদ্রাসা ও কারিগরি) মাউশি মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষক, শিক্ষা গবেষকদের উপস্থিতিতে ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। সভাটি চার ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এতেই বোঝা যায় যে, বিষয়টিকে মাউশি তথা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছে। আমরা আমাদের মতামত প্রদান করেছি। আরও মতামত একটি মেইলের মাধ্যমে চাওয়ার কথা ছিল, সেটি আর প্রয়োজন হয়নি। মোটামুটি একটি সিদ্ধান্তে মাউশি উপনীত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বল স্থানসমূহ দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এই ‘ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্ট’, যার জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ব-প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। প্রাথমিকপর্যায়ে পরিচালিত জাতীয় মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, মাত্র ২০-২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণি সমাপনীর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছে। (সূত্র : এনএসএ রিপোর্ট)। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের শিখন মান ও বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, শিক্ষার্থীদের সবল ও দুর্বল দিক সম্পর্কে শিক্ষককে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া। পাবলিক পরীক্ষার মতো এ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে না এবং এটি হবে মূলত বিদ্যালয়কেন্দ্রিক। এ ধরনের পরীক্ষা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষেই আয়োজন করবেন এবং ক্লাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন টেস্ট গ্রহণ করবেন। দুর্বল শিক্ষার্থীদের শনাক্ত-পূর্বক একটি রিপোর্ট করবেন, যা বিদ্যালয় সংরক্ষণ করা হবে। এটির ওপর ভিত্তি করে প্রতিকারমূলক কিংবা রিমেডিয়ালাল কিংবা ব্রিজিং ক্লাসের আয়োজন করা হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু আছে। যেহেতু এটি একটি নতুন কার্যক্রম, তাই প্রাথমিক অবস্থায় এ কার্যক্রমটিকে সম্পূর্ণভাবে স্কুলভিত্তিক করা সমীচীন হবে না। কেন্দ্রীয়ভাবে এ কাজ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষকদের অবহিতকরণ ও প্রশিক্ষণ। টেস্ট আইটেম প্রস্তুত ও পাইলটিং। টেস্ট গ্রহণ, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রতিবেদন প্রেরণ, ঘাটতি পূরণের জন্য বিশেষ সেশন পরিচালনা, আগস্ট-টেস্ট আইটেম ও অন্যান্য ম্যাটেরিয়ালস প্রস্তুত, নভেম্বর-টেস্ট পেপার মুদ্রণ ও বিতরণ করার প্রস্তাব করা হয়। জানুয়ারিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে আর ফেব্রুয়ারি-মার্চে পরীক্ষা গ্রহণ করে রিপোর্ট তৈরি করার প্রস্তাব করা হয়।

ক্যাডেট কলেজে যখন সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় তখন দেখেছি ‘মেধা যাচাই’ কিংবা ট্যালেন্ট শো নামে দুটো বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পুনরায় যাচাই করা হয়। ধাপে ধাপে পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বাছাই করা হয়। তারপর কলেজে প্রবেশের পর আবারও ‘মেধা যাচাই/ট্যালেন্ট শো’ নামক বিষয়ের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। বিষয়টি চমৎকার। ওই ট্যালেন্ট শোতে অ্যাকাডেমিক কোয়ালিটির বাইরে একজন শিক্ষার্থীর অনেক ধরনের কোয়ালিটি থাকে সেগুলো বেরিয়ে আসে। ওই শোতে একজন ক্যাডেট যা প্রদর্শন করে এর মাধ্যমে মোটামুটি তার পুরো ছয় বছরের ক্যাডেট জীবনে একটি আলাদা পরিচিত বহন করে। অনেক ক্যাডেট অ্যাকাডেমিক বিষয়ে তাদের সহপাঠীদের মতো প্রথম, দ্বিতীয় হচ্ছে না বা একটি বিষয় তাদের মতো অত দ্রুত আয়ত্ত করতে পারছে না কিন্তু তার এমন কণ্ঠ যে পুরো হলের মানুষকে নীরব করে ফেলে, বিমোহিত করে ফেলে দেশাত্মবোধক কিংবা নজরুলগীতি কিংবা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে। পরে দেখা যায় ওই ক্যাডেটই হচ্ছে হাউজ কালচারাল প্রিফেক্ট, কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট। একইভাবে অনেককে দেখেছি চমৎকার নাচতে, চমৎকার নাটক করতে। আমাদের সিভিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় তাদের চাঙা করতে, তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে, নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এবং তাদের লাজুক অবস্থা দূর করতে, সবার সঙ্গে পরিচিতি হতে শুধু অ্যাকাডেমিক বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে এক ধরনের ‘ট্যালেন্ট শো’র আয়োজনও করা উচিত। আমি এর আগে বেশ কয়েকটি লেখায়ও তা উল্লেখ করেছি। কারণ শিশু শিক্ষার্থীরা যখন দেখবে তাদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করার জন্য পরীক্ষা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেটি তাদের শিশুমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে।

ওয়ার্কশপে উপস্থিত কেউ কেউ উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনেছেন। এখানে একটি বিষয় হচ্ছে, এক-এক দেশের কনটেক্সট এক-এক ধরনের। এক দেশের উদাহরণ অন্য দেশের পক্ষে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের উদাহরণ তৃতীয় বিশ্বের কিংবা উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না। হ্যাঁ, তারা ভালো কী করছেন সেটি আমাদের কনটেক্সট কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায় এবং কতটা করা যায় সেটি দেখতে হবে। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর নরওয়েতে শিক্ষা যা যা হয় তার সবকিছু তো দূরের কথা অনেক কিছুই আমাদের কনটেক্সটে মিলবে না। আমাদের ব্যবস্থা আমাদের মতোই করতে হবে। কানাডায় ডায়াগনস্টিক টেস্ট বিদ্যালয়ভিত্তিক হয়, আমাদের এখানেও তা-ই করার কথা দু-একজন বলেছেন। কিন্তু আমাদের দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সেই অবস্থায় আছে? তা ছাড়া কানাডা এক বিরাট দেশ, তার এক-এক প্রদেশের বৈশিষ্ট্য এক-এক ধরনের।

এখন দুর্বলতা চিহ্নিতকরণের পর কীভাবে রিমেডিয়াল সেশন পরিচালনা করা হবে, কখন করা হবে, কীভাবে করা হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়। যেসব শিক্ষক এর সঙ্গে জড়িত থাকবেন তাদের সম্মানী দিতে হবে কি না এবং কীভাবে বিষয়টিকে টেকসই করা হবে, এজন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় ইত্যাদি বিষয়ও আলোচিত হয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণে এটিকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। অনেকেই শিক্ষকদের সম্মানীর বিষয়টিতে সায় দেননি। এখানেও আমার একটি অভিমত আছে সেটি হচ্ছে, আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষা প্রায় পুরোটাই (৯৭ শতাংশেরও বেশি) বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত। তার মধ্যে সবাই আবার এমপিওভুক্ত নন। কাজেই অর্থনৈতিক সংকট তাদের আছেই। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এবং ট্র্যাডিশন অনুযায়ী প্রায় সব বিদ্যালয়েই প্রাইভেট পড়ানোর প্রথা চালু আছে। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করার পর তাদের জন্য যে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হবে সেটি শিক্ষকরাই করবেন। সেখানে কিছুটা অর্থের ব্যবস্থা থাকলে তারা যেমন উৎসাহিত হবেন, তেমনি প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টিও কমে আসবে। অনেক অভিভাবককে প্রাইভেটের জন্য অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়, সেটি তাদের জন্য একটি বোঝা। শিক্ষার্থীদের ‘রিমেডিয়াল কিংবা ব্রিজিং’ কোর্স যাই বলিনি কেন, সেটি প্রতিষ্ঠান থেকে করা হলে অভিভাবকদের প্রাইভেটের মতো অর্থ গুনতে হবে না। শিক্ষার্থীদেরও প্রাইভেটের জন্য আলাদা সময় দিতে হবে না। এই রিমেডিয়াল ক্লাস অনেকে বলেছেন নির্দিষ্ট ক্লাসের মধ্যে করতে। সেটি আসলে বাস্তবসম্মত নয়, কারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাধারণ সিলেবাস তো অনুসরণ করতে হবে। সেটি তাহলে কীভাবে করা হবে? আর একটি ক্লাসের সবাই তো রিমেডিয়ালের আওতায় আসবে না সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক শিক্ষাবিষয়ক লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত