‘চুপি চুপি একা একা’র ভেতরে আগেরকার বাংলা ছবির নায়ক-নায়িকার পারস্পরিক ভাব আদান-প্রদানের বেশ একটা বিষয় আছে, সে জীবনও এর বাইরে নয়। আজকাল তো চুপি চুপি বলে প্রায় কিছুই নেই, এমনকি ইশারাও। তাই কথা আর ইশারা দুটোরই সামাজিক দর ভীষণরকম পড়তির দিকে। চারটি শব্দ যেখান থেকে নেওয়া, কবীর সুমনের বিখ্যাত গীতিকবিতা ‘আমাদের জন্য’-এর ঠিক আগের কয়েকটি শব্দ বসালেই পুরো বাক্যের ইঙ্গিত একেবারে বদলে যায়। ‘সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা, কত কবি মরে গেল চুপি চুপি একা একা, আমাদের জন্য।’ সমকালে দারুণ পরিচিত, যার জীবনে জনান্তিক বলে কিছুই নেই, দেশ-বিদেশে সবখানে এমন মানুষের চুপি চুপি মরণের কথা আমাদের জানা আছে।
লেভ তলস্তয় সাধারণ জনতার ভেতরে বাস করবেন বলে ইয়াসনায়া পলিয়ানার জমিদারি ছেড়ে, মস্কো-কুসর্ক লাইনের আস্তাপভো নামের ছোট রেলস্টেশনে মারা গিয়েছিলেন। অমন জাঁদরেল মানুষটার সেই মরণ তো একেবারেই চুপি চুপি। উল্টো ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। তার শেষযাত্রার স্মারক হিসেবে শ্মশানসঙ্গীরা চুলদাড়ি ছিঁড়ে কিছুই রাখেনি। চিতায় তোলার সময়ে তাকে দেখতে পালকহীন রাজহাঁসের মতন লেগেছিল। মহামরণ বাংলার কবি-সাহিত্যিক কারও কারও জীবনেই ঘটেছে। গোটা দেশের কেটেছে উৎকণ্ঠিত প্রতিটি প্রহর। কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদের শেষ সময় এমন ছিল। সেখানে মৃত্যু বিষয়টা ঠিক চুপি চুপি যেন ঘটেনি। সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রেও একই। যদিও, ও গানে ‘চুপি চুপি একা একা’ যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা একেবারেই ভিন্ন। সে অর্থকে কোনোভাবেই অন্যর্থ করার সুযোগ নেই।
‘মরে গেল’ শব্দ দুটো আগে বসে ‘চুপি চুপি একা একা’ শব্দ চারটির অর্থের তাৎপর্য একেবারেই বদলে দিয়েছে। সম্প্রতি কবি নূরুল হকের মৃত্যুর পরে তা মাথার চারপাশে ঘুরেছে। এখানে ‘দিস্তে দিস্তে লেখা’ বিষয়টিও জুড়ে নেওয়া যাক। নিজের সমকালে দিস্তে দিস্তে লেখা লেখকের মৃত্যুও একসময়ে চুপি চুপি ঘটতে পারে। নূরুল হক দিস্তে দিস্তে লেখেননি, শুধু কবিতা লেখকের সেই সুযোগ কম, কিন্তু কবিতাজগতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ। ‘নিরন্তর’ সাহিত্যপত্রের নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত একটি সংখ্যায় প্রথম তার ছোট দুটো কবিতা পড়েছিলাম, তারপর থেকেই তিনি চুপি চুপি আমার কাছে আমার মতো করে ছিলেন। পরের এই প্রায় তিন যুগে সেই চুপি চুপি ভাবটা কাটেনি। নিশ্চয়ই আরও অনেকের সঙ্গেই ছিল তার লেখার প্রতি এমন সম্পর্ক-সংযোগ। সেই অদৃশ্য সংযোগই হয়তো তার মৃত্যুকে অমন একাকিত্বের সরূপ দিয়েছে। এর উল্টো উদাহরণও তো যথেষ্টই আছে।
সাহিত্যের বাইরে আরও বেশি। সাহিত্যেও কি কম! বিভূতিভূষণ ঘাটশিলায় কী নিভৃতে মারা গিয়েছিলেন। এর আগে এক শ্মশানযাত্রায় শবের মুখের কাপড় তুলে নাকি সেখানে দেখেছিলেন নিজের মুখ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুুদিন আগে হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে নেওয়া হয়েছে হাসপাতালে, মাঝখানের সময়ে তার শরীর যে এতটাই খারাপ হয়েছে, সেই সংবাদ জানতেন না বন্ধুস্বজনরা কেউ। তার স্ত্রী কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, অবস্থা যে এতটাই খারাপ তা ফোন করে জানাতে পারতেন, বউদি। কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি, তাতেও তো চার আনা পয়সা লাগে, ভাই। কিন্তু এই মৃত্যুর পরে শেষযাত্রার ট্রাকটাই যেন ফুলের ভারে প্রায় নুয়ে পড়ে, আর তাতে মানিকের বুকটা বুঝি ভেঙে যায়। এ নিয়ে সুভাষের কবিতা, ফুলগুলো সরিয়ে নাও, আমার বুকে বড় লাগছে!
ওদিকে সতীনাথ ভাদুড়ীর মৃত্যুটাও একেবারেই নিভৃতচারী। পূর্ণিয়ার বাড়িতে বাগান করতেন তিনি, উদ্যানচর্চা বিষয়ে নিজস্ব মতামতও ছিল। সেই বাগানে সকালবেলায় ‘ঘুরে ঘুরে বই পড়তেও দেখা গেছে কিছুক্ষণ, হঠাৎ ফেটে গেল অনেকদিনের স্থায়ী সে টিউমারটি। মুখে উঠে এলো রক্ত, উঠোনের ওপর পড়ে গেলেন তিনি, শেষ হয়ে এলো প্রাণ। বাড়িতে তখন ছিল না আর কেউ।’ এটাই সম্ভবত চুপি চুপি একা একা মৃত্যুর বড় উদাহরণগুলোর একটি। লেখক হিসেবে তিনি ভীষণ নিভৃতচারী ও বৈষয়িক বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। কলকাতার প্রকাশক তাকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সামনে পেয়ে সম্মানী নিয়ে কথা বলতে চাইলে বলেছিলেন, ও নিয়ে বড়দার সঙ্গে কথা বলবেন। অর্থাৎ, এসব নিয়ে তার কোনোমাত্র আগ্রহ নেই।
জীবনানন্দের মৃত্যুও কি অমন সঙ্গোপনেরই তরজমা নয়? ট্রামের ধাক্কা ও হাসপাতাল পর্ব, বাদ রাখছি। মানুষটা রাসবিহারী এভিনিউয়ে বাস করেও জনকোলাহলের বাইরেই তো থাকতেন। যদি কলকাতা মহানগরী না হয়ে সেদিনের বরিশাল শহর হতো, তাহলে বিষয়টার এমন কিছু ব্যতিক্রম ঘটত না। তপন রায়চৌধুরীর জনপ্রিয় আত্মকথা ‘বাঙালনামা’য় বরিশাল শহরের বিশিষ্টজনের উল্লেখ তো কম নেই। শুধু একজন সম্পর্কে আছে, তিনি ওই ছোট্ট শহরে একবারেই একা আর নিভৃতচারী, তার কোনো বন্ধু ছিল না। সেদিন ওই শহরে তাকে প্রায় কেউ চিনত না, আজ সবাই চেনে। কিন্তু শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালের শয্যায় আহত জীবনানন্দকে সেদিন ওই তিলোত্তমা নগরীর সাহিত্যজগতের বাইরে কজনই-বা চিনত, যদিও হাসপাতালের একজন নার্স চিনেছিলেন বলে জানা যায়।
এমন চুপি চুপি সকাল থেকে মহাকালের রাস্তার দিকে ধাববান তো বাংলা সাহিত্যে অনেকেই। প্রকাশিতব্য একটিমাত্র উপন্যাসের রচয়িতা তরুণ অদ্বৈত মল্লবর্মণ যক্ষ্মার কাছে হেরে হাসপাতালে, বইখানি বেরুক বা না-ই বেরুক, তিনি নিশ্চয়ই সেখান থেকে বাংলার একেবারে পূর্বপ্রান্তে তিতাসের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন, ওই নদের বুকভরা জলের কত কথা এখনো বলা বাকি রয়ে গেল। তার জেলার আর-একজন, বারো ঘর এক উঠোনের বাসিন্দারা যদি ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে, সেই ইচ্ছায় কলকাতা নগরীর শহরতলির এক বিচিত্র জীবনের খোঁজ দিয়েছেন যে ঔপন্যাসিক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী তো সবার ভেতরে ছিলেন দারুণ একা। তার মৃত্যুও তো সেই কোলাহলে থেকেও নিভৃতচারণের অন্য নাম।
এই পর্যন্ত এসে, একটা বিষয় বেশ খেয়াল হচ্ছে, এরা প্রত্যেকেই দেশভাগ-উত্তর নগর কলকাতায় উদ্বাস্তু, পূর্ব বাংলার মানুষ। নিভৃতচারণের সঙ্গে স্বভূমিত্যাগের কি কোনো সম্পর্ক আছে। নাকি, জনকোলাহলে থেকে একজন একা হতেই পারে, তখন মৃত্যু এসে ডাক দিলে তা চুপি চুপি একা একাই হয়। ঘরভরতি মানুষের ভেতরে সে এক ভিন্ন নৈঃশব্দ্যের বারতা।
স্বভূমিত্যাগের প্রসঙ্গ ভাবলে, মাহমুদুল হকের নায়কোচিত মুখ চোখের সামনে ভাসে। বারাসাত, সেই বারাসাত, সে তখন কত দূরে। মাহমুদুল হকের নিভৃতযাপনের শুরু যৌবনেই। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে তিনি কলম ধুয়েমুছে তাকে তুলে রেখেছেন। এরপর একে একে বন্ধুজন সাহিত্যিক পরিম-ল থেকেও তার দূরে সরে যাওয়া। যে মৃত্যুটাকে তিনি সাদরে বরণ করে নিলেন এর চেয়ে সঙ্গোপনে আর কী হতে পারে। সে তুলনায় কায়েস আহমেদ ভীষণ অদ্ভুত। কাউকে কিছু বোঝার সুযোগই দিলেন না। নির্বাসিত একজন তিনি, হুগলির বড় তাজপুর সীমান্তের ওপারে, সেকথা জানা থাকার পরেও মনে হয়, সেই উনিশ শ বিরানব্বইয়ের কোরবানির ঈদের পরের নিস্তব্ধ ঢাকা শহরে ওই সময়টাকে তিনি খুব চুপচাপ নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রকৃত সুযোগ ভেবেছিলেন। হয়তো এর কিছুই নয়, এসব আমার স্রেফ ধারণা করে নেওয়া।
সব মৃত্যুই তো চুপি আসে, তাই স্বাভাবিক। কিন্তু আবারও লিখছি, এই চুপি চুপি মরে যাওয়াটা একেবারেই ভিন্ন। কলম খোলা রেখে যে মৃত্যু তাও চুপি চুপিই আসে, কিন্তু ধরনটার ভেতরে সক্রিয়তার আভাস পুরোপুরিই লেগে থাকে। বুদ্ধদেব বসু কি দেবেশ রায়। একজনের কলম তখনো খোলা, অন্যজন কলমটা এই বন্ধ করে হাসপাতালে গেলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঘুমের ভেতরে। শঙ্খ ঘোষও। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অপারেশনে একটি পা কলকাতায় রেখে এসেছেন, একটু ভালোর দিকে, যদিও ক্যানসার ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু এ সময়ে এক ভোরে চলে গেলেন। ‘দেখি নাই ফিরে’ শেষ না-করেই যখন সমরেশ বসুর প্রস্থান, সেই মৃত্যুতে অন্য হাহাকার, ওই লেখার কী হবে এবার। যেন স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টির অসমাপ্ততায় তীব্র কাতরতা।
এই মৃত্যুগুলো কোনোটাই ওই চুপি চুপি একা একার মাত্রায় নয়। বরং, সক্রিয়তার এক ভিন্নমাত্রার ভেতরে মৃত্যুই তার কাছে হানাদারের মতো এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু নিজেকে সব থেকে দূরে রেখে, হয়তো একটু অক্রিয় থেকে, এক ধরনের নিভৃতচারিতায় ওই মৃত্যু নামক নৈঃশব্দ্যের ডাক শোনার আকুল পিপাসার নিশ্চয়ই ভিন্ন সংজ্ঞার্থ আছে। সে সবই আমাদের সাধারণ বোধের বাইরে। এতটাই বাইরে যে, ‘জলের মতো একা কথা কয়’ হয়ে ঘুরে ঘুরে চারপাশে কথা কয়ে চলেছে। সেই ঘুরে ঘুরে কথায় বারবার মনে হয়, কত কবির একজন নূরুল হকের মৃত্যুতে এই কথাগুলো ঘুরেফিরে মাথার ভেতরে জলের মতো কলকল কথা কয়ে চলেছে!
লেখক কথাসাহিত্যিক
