ডেঙ্গু, মশক ও সিটি করপোরেশন

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২১, ১০:৫৮ পিএম

কভিড-১৯ এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের শেকল ভাঙার তৎপরতায় কোরবানি ঈদের পূর্ব-পশ্চাৎ মানুষ তথাকথিত কঠিন বিধিনিষধের শেকলে  গৃহবন্দি। কিন্তু সেখানেও তার নিস্তার নেই; ঢাকা মহানগরীতে সাততলা থেকে তালতলা সর্বত্র মশার অবাধ বিচরণ; তার অগম্য কোনো স্থান নেই। এখন ডেল্টার সঙ্গে ডেঙ্গু মিত্র হয়ে নগরবাসীকে নাকাল করে চলেছে। ডেঙ্গুর খপ্পরে পড়ে আমার এক আত্মীয়ের কিশোরী কন্যার ঈদ উদ্যাপন হয়েছে হাসপাতালে। প্রায়ই শুনি ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম ছাড়ে। সে জন্য আমার খুব অবাক লাগে, ঢাকার মতো এত নোংরা এবং দূষণযুক্ত নগরীতে এই খানদানি মশার এত দ্রুত বংশবিস্তার ঘটে কীভাবে? আমরা কি সবাই শৌখিন হয়ে গিয়ে বাসায় ফুলের বাগান করছি আর তাতে পানির ওভার ডোজ চালাচ্ছি?

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, এর আগেও নিয়েছে, সামনেও হয়তো-বা নেবে। এখন মনে হচ্ছে মহানগরের নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি নয়, মশা মারাই যেন তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মহানগরীর উন্নয়নের নামে নগরবাসীর কাছ থেকে যে উচ্চহারে কর আদায় করা হয়, তার একটা বড় অংশ এখন ব্যয় করা হয় এই কাজে। কিন্তু মশা কতটুকু নির্মূল হবে, বা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা কেবল সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারেন; আপাতত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অনেক নাগরিকের অভিযোগ তারা কর দিচ্ছেন, সেবা পাওয়ার আশায়; কিন্তু সেবা তো পাচ্ছেনই না, এখন উল্টো পাচ্ছেন দণ্ড। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?  

এবার সিটি করপোরেশন দুটি মশক নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানোর পাশাপাশি যে সব বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাচ্ছে, সে সব বাড়ির মালিকদের জরিমানা করা শুরু করেছে। খুবই যুগোপযোগী ও আধুনিক উদ্যোগ। ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশে কোনো নাগরিক দুষ্কৃতকারীর কবলে পড়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করলে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে না আসাকে নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। আর আমাদের দেশে নিজ বাসায় মশা বাসা বাঁধবে, অথচ মালিক দায়মুক্ত থাকবে, তা তো হতে পারে না। কথা ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মশা কি শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িতে জন্মায়, সিটি করপোরেশনের খানাখন্দ, নালা-নর্দমা, ভাগাড়-পুকুর, খাল-লেক, রাস্তা-ঘাট, দোকানপাট ও মার্কেটগুলোতে কি কোনো মশা জন্মায় না? অবশ্যই জন্মায়। তা না হলে তাদের লোকজন মাঝে মধ্যেই মশা মারতে কামান দাগাতে গিয়ে শব্দদূষণ ও পরিবেশ দূষণ করছে কেন? এ পরিস্থিতিতে নগর পিতারা নিজেদের জরিমানা করার আগে অন্য নাগরিকদের জরিমানা করার নৈতিক অধিকার রাখেন না। অনেকের অভিযোগ নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে এই বাক-পাসিং (buck passing) কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, এডিস মশার ৫০ শতাংশ জন্ম হয় নির্মাণাধীন উঁচু দালানের নানা পকেটে জমে থাকা পানিতে। কিন্তু আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি অফিস ও ভা-ারের, বিশেষ করে রেলওয়ে, পরিবহন পুল, বিআরটিসির ও বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জব্দ করা অকেজো গাড়ি ও কলকব্জারও অবদান নেহাত কম নয়। কিন্তু সরকারি কোনো অফিসে অভিযান চালানো হয়েছে বলে শুনিনি। যেটা শোনা যায়, সেটা হলো করপোরেশন যে কীটনাশক ব্যবহার করে, তাতে মশা মরে না। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কীটনাশক নিয়ে এরূপ একটি খবর দেখলাম। ঢাকার এক প্রাক্তন মেয়র কীটনাশকে মশা না মরায় নিজের অসহায়ত্ব জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু ভেজাল কীটনাশক কেনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, তা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।

পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে ঢাকায় মশার চরম উৎপাত শুরু হয়; অনেকটা ‘রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতায় আছি’র মতো। তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনীতিক ও ক্রীড়ামোদী মানুষ হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। ১৯৪৯ সালে মাহবুব জামাল জাহেদি ও ফজলে লোহানীর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাসিক ‘অগত্যা’ ছিল সাহিত্য ও ব্যঙ্গরসে সিক্ত সে সময়ের একটি বহুল প্রচারিত ও সুধীমহলে সমাদৃত পত্রিকা। সেই মাসিকে দেশের সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে কাল্পনিক এক বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার থাকত। এক সংখ্যায় ঢাকায় মশককুলের নিদারুণ জ্বালাতন নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। প্রতিবেদক সেই বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানতে চান, কবে নাগাদ ঢাকার মশককুলের তাণ্ডবনৃত্য শেষ হবে? সর্বজ্ঞের সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, ‘হামছে না পুছো, ..., পুছো বাহারছে’। সবাই জানেন সেই সময়ের জনপ্রিয় সিনেমা ‘কালী ঘাটা’য় লতাজির গাওয়া একটি গানের মুখরা, ‘হামছে না পুছো, হামছে না পুছো, কই পেয়ার ক্যা হে, পেয়ার ক্যা হে, পুছো বাহারছে, পুছো বাহারছে’ তখন ছিল সবার মুখে মুখে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিবেদকের তীর ছিল হাবিবুল্লাহ বাহারের দিকে। এই ব্যঙ্গোক্তিতেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, হাবিবুল্লাহ বাহার কিন্তু ড্রোন, কামান বা জরিমানা কোনো কিছুর আশ্রয় না নিয়েই ঢাকাকে মশকমুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন; আজও অনেকে তার এই সাফল্যগাথা স্মরণ করেন।

হাবিবুল্লাহ বাহার মুসলিম লিগার হলেও উদারনৈতিক এবং দক্ষ নেতা হিসেবে সবার কাছে ছিলেন গ্রহণযোগ্য। ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় পাস করা সত্ত্বেও বিপ্লবী সূর্য সেনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তার আর পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়া হয়নি। সেই মানুষটি মন্ত্রী হয়েও তার মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী এবং কর্মীদের নিয়ে নিজে হাঁটুপানিতে নেমে পর্যন্ত মশকের আবাসস্থল ধ্বংসে অংশ নিয়েছেন। তখন ঢাকা শহর ছোট হলেও এখনকার চেয়ে সম্পদ ও লোকবল ছিল অনেক কম। কাজেই তার সেই সাফল্যকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অঙ্গীকার, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দিয়ে তিনি তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। এই একই কৌশল প্রয়োগ করে বর্তমান মেয়রদ্বয়ও সাফল্য লাভ করতে পারেন।

বর্তমানে মহানগরীর দুই সিটি করপোরেশনে যে দুজন নগরপিতা আসীন আছেন, তাদের মধ্যে উত্তরের মেয়র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মানুষ। তার সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই; তবে মাঠে-ময়দানে তাকে বেশ তৎপর দেখা যায়। দক্ষিণের মেয়র সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তাকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তার কর্মদক্ষতা, অঙ্গীকার, আন্তরিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার ওপর আমার যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। মহানগরীর এই দুই অভিভাবক তাদের কাজের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে এই ক্ষুদ্র পতঙ্গটি নিধনের লক্ষ্য অর্জন সহজ করতে পারেন। তবে এর জন্য কিছু উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আমার মনে হয় মশক দমনে লার্ভার আধার এখন যেভাবে চিহ্নিত করে জরিমানা করা হচ্ছে, সেটা অব্যাহত রাখা জরুরি। তবে ব্যবস্থাটাকে অধিকতর কার্যকর করতে পারস্পরিক দায়বদ্ধতার রীতি প্রবর্তন করা দরকার। এ লক্ষ্যে  প্রতিটি মহানগর এলাকা ম্যাপ দেখে দেখে কতগুলো সুবিধাজনক ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক ভাগে ভাগ করে একেক জন কর্মকর্তাকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের জন্য এক একটি ভাগের দায়িত্ব দিতে হবে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সেই এলাকার বসতবাড়িতে বা বাড়ির বাহিরাঙ্গনে ও অন্যান্য স্থানসমূহে মশার কোনো প্রজনন স্থান ও লার্ভা পাওয়া গেলে বা এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা বা জরিমানা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালন, কীটনাশক সংগ্রহ ও প্রয়োগে বিলম্ব এবং মানের বিচ্যুতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কাজগুলো করতে পারলে একাধারে করদাতাদের অভিযোগ তিরোহিত হবে, কর্পোরেশনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সর্বোপরি নাগরিকদের দুর্ভোগ কমবে। আমাদের বিশ্বাস হুবহু এই কৌশল না হোক, আমাদের নগরপিতারা নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে অন্য যে কোনো কার্যকর পদ্ধতির মাধ্যমে নাগরিক জীবনের দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে সক্ষম হবেন; সে যোগ্যতা ও সদিচ্ছা তাদের রয়েছে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত