ভঙ্গুর ও অমানবিক সভ্যতা

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ১০:৪২ পিএম

করোনা বিশ্বজনীন সমস্যা। ছোট বড় কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। সবাইকে মনে হয় সমান করে দেবে। কিন্তু পারেনি। তারা টিকে গেছে যাদের ক্ষমতা আছে। টিকবার। বয়স্কদের বিপদ হয়েছে বেশি, তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আবার যাদের বিত্ত আছে তারা যতটা চিকিৎসা পেয়েছে বিত্তহীনরা ততটা পায়নি। আমরা বৈষম্যের কথা বলি, বলতেই থাকি, বলাটা দরকারও বটে। করোনা বৈষম্য বাড়িয়ে দেবে। পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক দুঃখ দেখা দেবে। এর মধ্যে দরিদ্র দেশ এবং দরিদ্র মানুষ এদের বিপদটা হচ্ছে এবং হবে বেশি। তারা আরও কাহিল হবে।

মানুষের সভ্যতা উন্নতির চরম শিখরে উঠছে। এই উন্নতির ধরনটা পুঁজিবাদী। এ উন্নতি খাড়া ওপরের দিকে উঠতে থাকে, নিচে চাপা পড়ে তারা উন্নতির জন্য যারা শ্রমের জোগান দেয়, যাদের শ্রম ছাড়া এই উন্নতি অসম্ভব ছিল। এই উন্নতির চতুষ্পার্শ্বে নিঃশব্দ আর্তনাদ মেহনতি মানুষের। কিন্তু দুঃখ কেবল সেখানেই নয়, উন্নতির ভেতরেই রয়েছে যে নিরাপত্তাহীনতা করোনাভাইরাস তো সেই বাস্তবতাটাকেই নির্মমভাবে উন্মোচিত করে দিল। পুঁজিবাদী উন্নতির প্রবল প্রবাহে উন্নতির সুবিধাভোগীরা দুই দু’টি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়েছে। ঝগড়াটা ছিল সম্পদ ও সুযোগের ভাগাভাগি নিয়ে। রাজায় রাজায় যুদ্ধে প্রাণ গেছে নিরীহ মানুষের। করোনার আক্রমণটাও যুদ্ধের মতোই, যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নিঃশব্দ কিন্তু ভীষণ ধ্বংসাত্মক। এতে কেবল যে মানুষ ও মানুষের সম্পদই ধ্বংস হয়েছে তা নয় প্রচ- আঘাত পেয়েছে মানুষের মনুষ্যত্বও। মানুষকে বলেছে অসামাজিক হও, নিজেকে বাঁচাও, অন্যকে শত্রু জ্ঞান করো, কারণ সে হয়তো বহন করছে মৃত্যুর জীবাণু।

এই যুদ্ধে কে কাকে আক্রমণ করল? উন্নতিই আক্রমণ করেছে উন্নতিকে। উন্নতির ভেতরকার কৃত্রিমতা ও অমানবিকতা আক্রমণ করেছে তার অর্জনগুলোকে। সামাজিকভাবে হলেও মানুষকে ঠেলে দিয়েছে আদিম দশায়। তাকে গুহাবাসী করে ছেড়েছে। পুঁজিবাদী উন্নতি যতই আওয়াজ দিক, অগ্রগতির, আবরণে ও বিজ্ঞাপনে ঘোষণা দিক প্রাচুর্যের, সে যে ধ্বংস করেছে প্রকৃতিকে, আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগলিপ্সু করছে মানুষকে এবং মানুষের প্রাথমিক চাহিদা যে স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার সেটাও দিতে পারছে না, করোনাভাইরাস এসে কুৎসিত সত্যটাকেই উন্মোচিত করে দিল।

উন্মোচিত এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ এখন কী করবে? অগ্রসর বলে পরিচিত মানুষরা যারা জগতের পরামর্শদাতা তারা বলবে? বলবে কি যে এই উন্নতিতে কুলাবে না সংস্কার চাই। হ্যাঁ, সেটা বলবে। আগেও শোনা গেছে এই ধ্বনি, এখন সেটা বাড়বে। বলা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাই। কাউকে বাদ দিলে চলবে না। বলবে বৈষম্য বাড়ছে, সেই বৃদ্ধিকে রুখতে হবে। কিন্তু বলতে চাইবে না যে আসল রোগটা রয়ে গেছে উন্নতির চরিত্রের ভেতরেই। রোগটার নাম পুঁজিবাদ। ওকথা যারা বলবে তাদের কথা শোনা যাবে না। উন্নতির ধারা তাদের কণ্ঠ রোধ করতে চাইবে। উন্নতির অনুগত ও সুবিধাভোগী মিডিয়া পুঁজিবাদবিরোধী কথাবার্তাকে চাপা দিয়ে রাখবে। কিন্তু পুঁজিবাদকে হটাতে না পারলে তো মানুষের সভ্যতার মুক্তি পরের কথা, অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। সম্পদ ও সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার জায়গাতে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে করোনাভাইরাসের এই আক্রমণের চেয়েও ভয়ংকর আক্রমণ অনিবার্য। বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দুই সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। একটি উন্নতির বর্তমান ধারাকে অব্যাহত রাখার, অপরটি একে বদলে উন্নতিকে মানবিক ধারাতে নিয়ে আসার। মানবিক ধারাটা সমাজতান্ত্রিক। এই দু’য়ের মাঝামাঝি কোনো পথ নেই। মানবিক ধারাতে এগুতে হলে লড়তে হবে বিদ্যমান ব্যবস্থাটার বিরুদ্ধেই। লড়াইটা একই সঙ্গে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক; এর মূল চরিত্র রাজনৈতিক, কিন্তু এর জন্য সাংস্কৃতিক তৎপরতা অত্যাবশ্যকীয়। উন্নতি অল্প কয়েকজনের হাতে বন্দি থাকবে না, চলে আসবে সবার কাছে।

সব মৃত্যুই দুঃখজনক ও শোকাবহ। কিন্তু আমরা বিশিষ্টজনদের মৃত্যুর খবরই শুধু জানতে পারি। মেহনতিদের প্রাণত্যাগের খবর কে রাখে? তারা মারা যাচ্ছে হাজারে হাজারে। যারা বাঁচছে তারাও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছে। কিন্তু তারা তো পরিসংখ্যানের অকিঞ্চিৎকর সংখ্যা মাত্র; সম্পদ বলতে আছে শুধু একটা প্রাণ, আক্রান্ত হয়ে ওটি ত্যাগ করেই কোনোমতে যন্ত্রণামুক্ত হচ্ছে।

বলা হচ্ছে করোনাভাইরাস প্রকৃতির সৃষ্টি, মানুষের নয়। এক অর্থে দাবিটি মিথ্যা নয়, যদিও পুঁজিবাদী বিশ্বেরই একাংশ বলে বেড়াচ্ছে যে চীনের মনুষ্যবিনাশী জীবাণু তৈরির এক গবেষণাগার থেকেই ফাঁকফোকরে কোনো একটি জীবাণু বেরিয়ে গিয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এ নিয়ে আবার তদন্তও হবে বলে শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু চীনের অরাজিতে হয়নি। আমরা মেনে নিলাম যে রোগটি এসেছে

প্রকৃতি থেকেই। কিন্তু প্রকৃতির কেন হঠাৎ এমন দুর্বুদ্ধি হলো যে সে বেরিয়ে পড়ল মানুষ মারবার মিশন নিয়ে? প্রকৃতির তো এটা স্বাভাবিক কাজ নয়। তার জন্য স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে নিজে বেঁচে থাকা। তাহলে? আসলে প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক কাজের জন্য প্রকৃতি নিজে দায়ী নয়, দায়ী মানুষই। সব মানুষ নয়, পুঁজিবাদী মানুষ, প্রকৃতিকে যারা পণ্যে পরিণত করেছে এবং উত্ত্যক্ত করেছে সর্বক্ষণ। প্রকৃতি তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। জানানোটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতিরও তো প্রাণ আছে; প্রাণ বাঁচাবার দায় আছে। প্রাণের ওপর আঘাত করলে প্রত্যাঘাত তো সে করবেই।

ধরে নিতে পারি যে জীবাণুটা ছড়িয়েছে বাদুড়ের দেহ থেকেই। বাদুড়ের দেহে ওই জীবাণু তৈরি হওয়াটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়; কিন্তু সেটা কেন মানুষের দেহে চলে আসবে? এসেছে এই কারণে যে বাদুড়কে টেনে আনা হয়েছে বাজারে। বন্যপ্রাণীর বাজার বসে চীনের উহান শহরে, যেমন হামেশাই বসে থাকে। সেখান থেকেই সংক্রমণ। তা বাদুড় তো থাকবে বাদুড়ের জায়গাতেই, তাকে বাজারে নিয়ে আসাটা কেন ঘটল? কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদী ভোগলিপ্সা। চীনে এক সময়ে বাদুড় খাওয়ার প্রচলন ছিল। চীন তখন দরিদ্র ছিল; দরিদ্র মানুষ অনেক কিছুই খায়, খেতে বাধ্য হয়; বাছবিচার করতে পারে না। কিন্তু এখন তো চীন আর দরিদ্র নেই। তাহলে? তাহলে বাদুড়কে কেন খাঁচায় পুরে বাজারে নিয়ে আসা? কারণ হচ্ছে খাঁচা থেকে বাদুড় যাবে খাবার টেবিলে। বাদুড় এখন আর গরিব মানুষের খাদ্য নয়; খায় ধনীরা। বাদুড়েরা তাই ধরা পড়েছে, পশু বিক্রির বাজারে চলে এসেছে, বিক্রি হয়েছে এবং নিজেদের গাত্রে উৎপন্ন জীবাণু মানুষের দেহে ছড়িয়ে দিয়েছে। সবটাই ঘটল একদিকে ভোগবিলাসিতা, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসহ মানুষের নিরাপত্তার দিকে যথোপযুক্ত মনোযোগ না-দেওয়া এই দুই কারণে।

কভিড-১৯ নাম-দেওয়া এই রোগটি একেবারেই আনকোরা। বলা হচ্ছে যে এর কোনো ইতিহাস নেই। সেটা ঠিক। কিন্তু এর উৎপত্তি যে-ব্যবস্থা থেকে তার তো লম্বা ইতিহাস রয়েছে। বাদুড়ের গায়ে জীবাণু জন্মে থাকলে তার ওপর পুঁজিবাদী মানুষের অত্যাচারের কারণেই ঘটেছে। একশ’ বছর আগে, সেই ১৯১৮ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষকালে স্প্যানিশ ফ্লু নামে ভয়ংকর এক রোগ দেখা দিয়েছিল। ধারণা করা হয় যে তার আক্রমণে পাঁচ কোটি লোক মারা গেছে। যুদ্ধের ভেতর মানুষের গা-ঘেঁষাঘেঁষি যাতায়াত, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, পুষ্টির অভাব, অমানুষিক পরিশ্রম, এসব অস্বাভাবিকতার দরুন রোগটা দেখা দেয় এবং অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের সময়ে মৃত্যু, ধ্বংসলীলা ও উন্মত্ততার ভেতর রোগে মৃত্যুর খবরটি কিছুটা চাপাই পড়ে থাকে। একশ’ বছর পরে এবার এলো আরেক ফ্লু। এখন যুদ্ধ নেই, পৃথিবীময় কথিত শান্তি বিরাজ করছে; জ্ঞানে-বিজ্ঞানে চিকিৎসায়-প্রযুক্তিতে মানুষ কত কত এগিয়ে গেছে, অবিশ্বাস্য সব উন্নতি; তখন আবার কেন এই উদ্ভবটি ঘটল? ঘটল কিন্তু ওই একই কারণে। যুদ্ধের কারণেই। করোনার আক্রমণটা যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম দু’টি বিশ্বযুদ্ধ ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে দখলদারিত্বের বিবাদ নিয়ে। এবারের এই যুদ্ধটাতে গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষের সভ্যতার ওপর।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পুঁজিবাদের উল্লসিত মুখপাত্ররা বলেছিল ইতিহাস তার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ বিশ্বময় পুঁজিবাদ একচ্ছত্র হয়েছে, আর কোনো বিপদ নেই। মস্ত বড় বিপদটা যে ওই প্রসারিত হওয়ার একেবারে বুকের ভেতরেই কায়দা করে বসে ছিল সেটা  নানাভাবে বোঝা গেছে। মানুষ-মারার অস্ত্র উদ্ভাবন ও বিক্রির প্রতিযোগিতা, মাদক ও পর্নোগ্রাফির ব্যবসা, স্থানীয় আকারে যুদ্ধ লাগিয়ে রাখা, ধরিত্রীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, নারী নির্যাতন, ভিন্নমত নিষ্পেষণ, এসব উৎপাতের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের অগ্রগতির যে ধ্বংসাত্মক চরিত্র সেটা ধরা পড়ছিল। অতিআশ্চর্য সব উন্নতির অন্তরালে মানুষের সমস্ত অর্জনকে নষ্ট করে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। দু’টি বিশেষ দিক ধরে ধ্বংস-প্রস্তুতির ওই অগ্রগতি। এর একটি ভোগবিলাস, অপরটি নিরাপত্তাহীনতা। ভোগবিলাসের তো কোনো সীমা পরিসীমাই দেখা যায়নি, এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে এই বিলাসিতা কতিপয়ের মাত্র, এর উল্টোপিঠে লেখা রয়েছে অধিকাংশ মানুষের বঞ্চনা। অধিকাংশকে বঞ্চিত করেই কতিপয়ের এই ফুলে-ফেঁপে ওঠা। বঞ্চিতদেরও কিন্তু আবার দীক্ষিত করা হয়েছে ভোগবিলাসের নিষ্ঠুর মন্ত্রেই। যে জন্য অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে সঙ্গে ভোগবিলাসের বঞ্চনার বোধও বঞ্চিতদের পীড়িত করছে।

ভোগবিলাসের অতৃপ্তি নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করেছে। শুধু তাই নয় নিরাপত্তাহীনতার বৃদ্ধিও ঘটিয়েছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপদের ঝুঁকি বেড়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর যে ঘটনা তা হলো গণমানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার প্রতি ভয়াবহ অমনোযোগ। সামরিকীকরণ যে পরিমাণে বেড়েছে ঠিক সেই পরিমাণেই উপেক্ষিত হয়েছে মানুষের ওই প্রাথমিক নিরাপত্তা, যার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাও সংশ্লিষ্ট। মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে সমাজতান্ত্রিক যে ব্যবস্থাটা এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পুঁজিপন্থিদের তৎপরতায় সেটাও ভেঙে পড়েছে।

মোট কথা, বিশ্বব্যাপী উন্নতির মহা হৈ চৈ চলছে কিন্তু মানুষের মৌলিক যে চাহিদা সেগুলোর দিকে মোটেই নজর দেওয়া হয়নি। ফলে মানুষের জীবনে অনেক রকমের দুর্ভোগ ঘটেছে, তারই একটি, এবং আপাতত সবচেয়ে মারাত্মকটি হচ্ছে এই করোনাভাইরাস। অতর্কিতে হানা দিয়েছে, এবং জানিয়ে দিয়েছে যে উন্নতির গৌরবগাথাগুলো কেমন অন্তঃসারশূন্য, সভ্যতা নিজেই কেমন ভঙ্গুর ও অমানবিক।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত