রাজনীতির ছদ্মবেশ

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৪৫ পিএম

ছোটবেলায় চমৎকার একটা বই পড়েছিলাম। হাইনস লাইপম্যানের, বাংলা অনুবাদ। যত দূর মনে পড়ছে নাম ছিল, অগ্নিগর্ভ। চমৎকার বলছি বটে আসলে পড়তে পড়তে শরীরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল তা ভাবলে এত বছর বাদেও ভয় লাগে।

জার্মানিতে তখন ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় আসছে। একটু একটু করে অন্ধকার গভীর হচ্ছে। কিন্তু ওপর-ওপর কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। আপাতদৃষ্টিতে সব ঠিক আছে। সব স্বাভাবিক। সিনেমা হলে দীর্ঘ লাইন, পার্কের ভেতর বাচ্চা নিয়ে মা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকা ইত্যাদি। এই বর্ণনা নতুন করে পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। কি আশ্চর্য! আজকের ভারতের সঙ্গে কি অদ্ভুত মিল সেদিনের জার্মানির। ওপর-ওপর সব ঠিক আছে। প্রধানমন্ত্রী ঘটা করে অহিংসার পূজারি বলে জন্মদিনে গান্ধীর গলায় মালা দিচ্ছেন, অর্থনীতি নিয়ে গালভরা বক্তৃতা দিচ্ছেন। বিজেপি নেতারা সবাইকে শান্তির ভার্চুয়াল পাঠ দিচ্ছেন। এদিকে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে দেশজুড়ে। উত্তর প্রদেশের লখিমপুর খেড়িতে জনৈক মন্ত্রীপুত্র গাড়িচাপা দিয়ে বেশ কয়েকজন কৃষককে মেরে ফেলেছেন। এটা যেমন একটা ঘটনা, তেমনি আসামের দরং জেলায় তথাকথিত উন্নয়নের নামে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, নিরীহ কৃষকদের ওপরও নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে রাষ্ট্রীয় শান্তিরক্ষকরা।

কোনটা ছেড়ে কোনটা নিয়ে আলোচনা করবেন! তাও দুটি ‘বড় ঘটনা’ বলে মিডিয়া একটু-আধটু হইচই করেছে। এ রকম কত ঘটনা রোজ হচ্ছে। দলিত হত্যা, জয়শ্রীরাম বলতে বৃদ্ধ মুসলমানকে বাধ্য করা এসব নিত্যনতুন অত্যাচার এ দেশের দলিত আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর গা সওয়া হয়ে গেছে। একুশ শতকের ভারতের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব নিঃসন্দেহে ব্রাহ্মণ্যবদ বনাম অব্রাহ্মণ জাত গোষ্ঠীর সংঘর্ষ। এ যেন সেই বৌদ্ধ যুগের সূচনাকালের আগের এক জনপদ। আপনি ফোন করছেন তা আড়ি পেতে রাষ্ট্র শুনছে। কী লিখছেন না লিখছেন রাষ্ট্র নজর রাখছে। আপনি একা একা কোথাও যাচ্ছেন, জানেন না হয়তো কেউ নীরবে আপনাকে অনুসরণ করছে। আসলে রাষ্ট্র নয়, সরকার এই ভয়ের পরিবেশ আপনার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ দেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিপুল বাগাড়ম্বরের মধ্যে নিঃশব্দে অর্থনীতি তলানিতে এসে ঠেকেছে । স্বাধীনতার পর জিডিপি এমন খারাপ অবস্থায় কখনো যায়নি। রাজনীতিতে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের জায়গা নিচ্ছে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। সব থেকে কঠিন পরিস্থিতি আমাদের সামাজিক কাঠামোর। দেশ ক্রমশ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নির্দেশিত মনু বাদী পথে চলতে চলতে হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে বড় দ্রুত এগোচ্ছে। ফলে আসামের দরং-এ নিরীহ গ্রামবাসী খুন বা হরিয়ানা ও লখিমপুর খেড়িতে নির্মমভাবে কৃষক মারা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সবটাই হচ্ছে আতঙ্কিত করে মানুষকে বার্তা দেওয়া কথা না শুনলে এই পরিণাম অনিবার্য।

আরএসএস কতটা ভয়ংকর সে সম্পর্কে খুব কম লোকের ধারণা আছে। ফলে আমরা অধিকাংশই বিজেপি, বিজেপি বলে চেঁচামেচি করি। বিজেপির ভোটে হারা-জেতা নিয়ে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লিখি। বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রকাশ্য মুখ মাত্র। কে ভোটে জিতল না জিতল তা নিয়ে সংঘ পরিবারের কোনোকালেই কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আজও নেই। তার ঘোষিত এজেন্ডা হিন্দুরাষ্ট্র কত দ্রুত বাস্তব হবে সেটাই একমাত্র লক্ষ্য। কত নামে-বেনামে যে আরএসএসের শাখা আছে তা, কল্পনা করাও কঠিন। যেটুকু যা খবর তাতে এক লাখের অনেক বেশি শাখা বহু নামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা দেশে। শুধু বিজেপির মধ্যে আরএসএস খুঁজলে আপনি ভুল করবেন। সব দলের মধ্যেই আপনি কমবেশি ছদ্ম আরএসএস পেতে পারেন। খেয়াল করলে নিজেই বুঝতে পারবেন যে, এরই মধ্যে সংঘ পরিবার এমন একটা আবহ তৈরি করে ফেলেছে, যাতে ভোটযুদ্ধে জিততে সব দলকেই সফট হিন্দুত্বের পায়ে মাথা নোয়াতে হয়। কংগ্রেস, আপ, ডিএমকে থেকে তৃণমূল সবাইকেই কোনো না কোনোভাবে সংখ্যা গুরু তাস না খেললে ভোট বৈতরণি পার হওয়া মুশকিল। অন্তত আমাদের স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলো তাই ভাবেন। ফলে যে তৃণমূল নিজেদের মুসলিম দরদি ইমেজ নির্মাণ করেন ভোটের স্বার্থে, তাদেরও অজানা কোনো বাধ্যবাধকতায় বাবুল সুপ্রিয় ও শিলচরের ঘোষিত মুসলিমবিদ্বেষী সুস্মিতা দেবকেও দলে নিতে হয়। আসামের দরং-এ যেভাবে বেআইনি জমি উদ্ধারের নামে অসহায় মানুষকে পুলিশ মেরেছে তা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জা ও যন্ত্রণার। মৃত্যুর সংখ্যা সরকারিভাবে দুজন। তার মধ্যে একজন নিতান্তই কিশোর। সরকার যাবতীয় দায় অস্বীকার করে যথারীতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই সরকারি জমিতে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাস করছিলেন। তাদের বারবার নোটিস দেওয়া সত্ত্বেও জমি ছাড়তে না চাওয়ায় সরকার পুলিশ পাঠিয়ে তা বন্ধ করতে গেলে মারমুখী জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালালে দুজন দুষ্কৃতির মৃত্যু হয়। এই ‘দুষ্কৃতি’র একজনের বয়স বারো। তার পকেটে আবার সরকার স্বীকৃত আধার কার্ড পাওয়া গেছে। সম্ভবত সে জেরক্স করাতে যাচ্ছিল। গোলমালে পড়ে প্রাণ গেছে। অন্যজনের ঘটনা টিভি চ্যানেলে দেখে দুনিয়া শিউরে উঠেছে। উচ্ছেদের জন্য আসা বিরাট সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে ঘরের সামনে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে সামান্য এক বাঁশ হাতে এগোতেই ওই বিরাট বাহিনী কালবিলম্ব না করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে এক পুলিশ ফটোগ্রাফার মুহুর্মুহু আঘাত হানতে থাকে অসহায় মানুষটির শরীরে।

আসলে ভারতের নানা জায়গায় এখন টুপি-দাড়ি আর বাংলাদেশি সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। পাশাপাশি মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী এ রকম একটা নির্মাণ সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর থেকেই। যুক্তির খাতিরে যদি মেনেও নিই যে, ওই গ্রামের বাসিন্দা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এ দেশে বেআইনি অনুপ্রবেশ করেছে। তাহলেও কি নির্মমভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র কাউকে মেরে ফেলা যায়? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং প্রকাশ্যে সভায় যখন বলেন পোশাক দেখলেই বোঝা যায় সন্ত্রাসী কারা, তখন ইঙ্গিত কোন সম্প্রদায়ের ওপর তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। আর অন্য নেতা, মন্ত্রীরা তো ঘুষপেটিয়া বলে যখন-তখন নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের প্রতি জনমনে ঘৃণার জন্ম দেন। ফলে আজ আসামে হচ্ছে, কাল অন্য রাজ্যে হবে।

আসামে ঘটনা নতুন নয়। এর সঙ্গে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৮৩৩ সালে অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে অখণ্ড বাংলার নানা এলাকা থেকে ব্রিটিশ সরকার মহা-সমাদরে চাষের জন্য কৃষকদের নিয়ে গিয়েছিল মূলত দুটি কারণে। এক. শস্য উৎপাদন বাড়াতে। অসমিয়া মানুষজন চাষ ভালো জানতেন না। শস্য না বাড়লে রাজস্ব আদায় মুশকিল। এদিকে ব্রিটিশ পুঁজি তখন আসামের চা বাগানে প্রচুর লগ্নি হয়েছে। শ্রমিকদের খাবার জোগানোর জন্যও ফসল উৎপাদন জরুরি। রাজস্ব ও খাবার জোগান এই দুটি কারণে বাংলার চাষিদের নিয়ে আসা হয়েছিল। ঘটনাচক্রে অধিকাংশ চাষের ছিলেন মুসলমান ও নিম্নবর্গের হিন্দু। কাজ মিটে গেলে সেই তাদের বিরুদ্ধে একদা যে নব্য উত্থিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নখ-দাঁত বের করেছিল, স্বাধীনতার পর থেকে সেই উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিই আরও হিংস্র চেহারা নিয়ে নানা সময়ে নানা অজুহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মূলত চর এলাকার ওই মুসলমান কৃষকদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার আগেই তারা ব্রিটিশ সহযোগিতায় লাইন সিস্টেম চালু করে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল চাষিদের। তার বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে ছিলেন মওলানা ভাসানী। দেশভাগ সব লড়াই থামিয়ে দিল। ভাসানীহীন আসাম হয়ে উঠল হিন্দু জাতীয়তাবাদের নতুন এক পরীক্ষাগার। যেখানে একের পর এক নেলি, চাউলখোয়া, বরপেটা গণহত্যা ঘটেছে। আর আমরা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ভদ্রলোকরা একটু-আধটু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রাখতে বিবৃতি দিয়ে আর মিছিল-মিটিং করে চুপচাপ হয়ে গেছি।

আরএসএস ধীরে ধীরে নিজেদের অনুকূলে জমি সুদৃঢ় করেছে। প্রগতিশীল শিবির এক-একটা ঘটনার পরপরই যেটুকু নড়েচড়ে বসেছে। তারপর ঘরে ঢুকে গেছে। আর এখন তো আক্ষরিক অর্থেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতি বিপুল বিক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। আসামের নির্বাচনের পর আজ পর্যন্ত করিমগঞ্জ, নগাঁও, মরিগাঁও, শোণিতপুর, দরং সর্বত্র প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসবে কলির সন্ধ্যা। রাত কতটা গভীর হয় কে বলতে পারে!

লেখক : ভারতীয় তথ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত