কন্যাশিশু বোঝা নয়

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১১:২৪ পিএম

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীর নাম ‘মানুষ’। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-নির্বিশেষে এতে কোনো বিতর্ক নেই। অথচ শুধু লিঙ্গবৈষম্যের কারণেই এর বিতর্ক চলে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পরে যুগ। এমনকি শতাব্দী পেরিয়ে নতুন শতাব্দীতেও। একমাত্র মানুষ জাতির ক্ষেত্রেই এই বিভেদ চলমান। মূলত ক্ষমতার লড়াই আর পেশিশক্তির দম্ভকে পুঁজি করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এ লড়াই কালক্রমে বেগবান হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং পুরো বিশ্বই এই লিঙ্গবৈষম্যের রোষানলে পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় জীবনের অকালমৃত্যু ঘটে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে। নির্বাক শ্রোতা-দর্শক কেবল সাক্ষী থাকে আবহমানকাল ধরে।

আদিমকাল থেকে ‘মানুষ’ জাতির নানা দিক থেকে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতি’তে আমূল পরিবর্তন হয়েছে বৈকি! মানুষ যেন দৃঢ়ভাবেই ‘সভ্যজাতি’র তকমা গায়ে লাগাতে পেরেছে সেই কয়েক শতাব্দী আগেই। পক্ষান্তরে কতিপয় মানুষের মধ্যে যখন মানবিকতার লেশমাত্র চোখে পড়ে না বরং শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে পুঁজি করে অমানবিক, পাশবিক কাজের নেতৃত্ব দেয়, তখন মানুষ জাতিকে বেজায় লজ্জা পেতে হয়। আজকাল অনুন্নত-উন্নয়নশীল এমনকি উন্নত দেশেও লিঙ্গবৈষম্যের ব্যাপকতা ছড়াচ্ছে নতুন কায়দায়! আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এই উপমহাদেশে রাজা রামমোহন রায়ের বদৌলতে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী ৩০০ বছরে নারীর প্রতি সুবিচার বা ন্যায্য অধিকার সেই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ আনুপাতিক হারে সার্বিক উন্নয়ন যতটা ঘটেছে, মানসিকতার পরিবর্তন, এমনকি মানবিকতার উন্নয়ন ততটা ঘটেনি!

প্রতি বছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে ‘কন্যাশিশু’ দিবস পালন করা হয় । অনেকটা ঘটা করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বর্ণাঢ্য স্ট্যাটাস দিয়েই পালন করে থাকেন অনেকে। অনেকের মতো, আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, এত এত দিবসের ভিড়ে কেন আবার নতুন করে যুক্ত করা হলো এই আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস? বিশ্বব্যাপী এই বিশেষ দিবসটি পালন করার গুরুত্ব আসলে কী? শুধুই কি সারা বিশ্বের কন্যাশিশুর জন্য কেবল একটি দিন উৎসর্গ করা মাত্র? বাস্তবতার নিরিখে এই দিবসের গুরুত্ব কতখানি ব্যাপক, তা আমরা কম বেশি সকলেই জানি। সারা বিশ্বেই অনেকগুলো কারণে কন্যাশিশুরা আজ অবহেলিত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা, ভালোবাসা প্রায় বলতে গেলে সব দিক থেকেই বঞ্চিত তারা। শুধু যে আমাদের দেশের চিত্র এমন তা কিন্তু নয়। সারা বিশ্বেই কোনো না কোনো জায়গায় প্রতি মুহূর্তে অবহেলার শিকার হচ্ছে আমাদের কোমলমতি কন্যাশিশুরা। পরিবার ছাড়াও সামাজিকভাবেও তারা হচ্ছে নানাভাবে নির্যাতিত। মূলত মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে এ দিবসের সূচনা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম এ দিবসটি পালন করা হয়। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি বছর এ দিবসটি পালন করে থাকে।

বিশ্বব্যাপী কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার সঠিক চিত্র বলা বড়ই দুরূহ ব্যাপার। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কন্যাশিশু নানা ধরনের অবহেলার শিকার হয়। সুন্দর শিক্ষাজীবনকে গলা টিপে হত্যা করে গ্রামগঞ্জে নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য করার শেষ পরিণাম হলো বর্ণনাতীত পারিবারিক সহিংসতা। নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকরা ওই কোমলমতি কন্যাশিশুকে ‘মা’ হতে বাধ্য করা হয়! এটি নিশ্চয়ই একটি ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন। পত্রিকা খুললেই আধুনিক কায়দায় নারীকে কেন্দ্র করে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করার চিত্র চোখে পড়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরুষশাসিত এই সমাজব্যবস্থায় নারী তথা কন্যাশিশুকে মাদকাসক্তি, মাদকের ব্যবসা, এমনি যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়। এ যেন অলিখিত এক বৈধ শাসনব্যবস্থা!

উপরিউক্ত নেতিবাচক ঘটনার নেপথ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে অনেকেই একমত পোষণ করবেন। যেমন : গণসচেতনতার অভাব, দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরূপ প্রভাব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, সর্বোপরি, নারীকে ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার নোংরা মানসিকতা, এমনকি প্রকৃত শিক্ষা ও বাস্তবায়নের অভাব ইত্যাদি। অতীতের তুলনায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এ ছাড়া, তথ্যপ্রযুক্তিতেও মোটামুটি ঈর্ষা জাগানিয়া অবস্থায় রয়েছে আমাদের দেশ। এখন প্রয়োজন, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন ও তার বাস্তবায়ন। সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই এর বীজ বপন করতে হবে। পর্যায়ক্রমে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্র্তৃক শিক্ষাদানের পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। সামাজিক কুপ্রথাকে অচিরেই নিপাট করে একটি সুস্থ-সুন্দর আবাসভূমি গড়তে সবার ঐকান্তিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। জাতীয়ভাবে এই দিবসকে উদ্যাপন করতে গিয়ে সরকারের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আপামর জনতার প্রতি এই হোক আহ্বান : “আর যেন একটি কন্যাশিশু নতুন করে বৈষম্যের শিকার না হয়, নির্যাতনের শিকার না হয়, সারা বিশ্বের সব নারী জাতিকে আমরা যাতে ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিই; অন্তর থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।” এমনি করেই প্রতি বছর এই দিবস ফিরে আসবে, আর নারীরা জেগে উঠবে নব-উদ্যমে, দুর্বার গতিতে। তবেই তো জাতীয় উন্নয়নের অগ্রণী পথিক হয়ে নারী তথা কন্যাশিশু সমান তালে এগিয়ে যাবে, মানুষ হয়ে পুরুষের পাশাপাশি। আর তাই, কন্যাশিশু বোঝা নয় বরং সম্পদ।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত