গ্রামীণ নারীর গন্তব্য কোথায়

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১১:৪৩ পিএম

করোনা মহামারীকালে সহস্র ছবি ও ঘটনা আমাদের শরীর ও মনে দাগ রেখে গেছে। মনে আছে যখন গ্রাম থেকে গার্মেন্টস খোলার কথা বলে শ্রমিকদের টেনে আনা হলো, আবার ঠেলেঠুলে বাড়িতে পাঠানো হলো। তারপর থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ল দেশময়। মনে আছে সেই পরিশ্রান্ত, আশাহীন নিরানন্দ শ্রমিকের দলে কারা ছিল? পুরুষও ছিলেন, তবে বেশিরভাগ ছিলেন নারী। যারা প্রত্যেকেই দারুণসব সাজানো সংসার আর স্মৃতিময় গ্রাম পেছনে ফেলে গত তিরিশ বছর ধরে এমন একটা টালমাটাল লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এই কিশোরী, যুব বা মধ্যবয়সী নারীদের মা-নানি-দাদিরা কিন্তু বহুকাল এমন কোনো দমবন্ধ লাইনে দাঁড়াননি। তাদেরও অভাব ছিল, হাহাকার ছিল। কিন্তু তারা সামলেছেন, সিনা টান করে বাঁচার একটা লড়াই করেছেন। নিদেনপক্ষে হাঁস-মুরগির ডিম বেচে মেয়ের সেন্ডেল, মাচার কুমড়া বা পাগাড়ের কচু বেঁচে সংসারের নানা খরচ মিটিয়েছেন এই অসাধারণ নারীরাই। অভাব, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় কি সামাজিক বঞ্চনা সয়ে এই গ্রামীণ নারীরাই গড়ে তুলেছেন বাংলার মায়াময় ভূগোল।

অতিসাধারণভাবে অনেকেই নারীর কাজ বলতে কৃষিকাজ, গৃহস্থালি কাজ আর কিছু হস্তশিল্প বোঝায়। কিন্তু চিকিৎসা, স্থাপত্য, প্রকৌশল, উদ্ভাবন, সৃজনশীল নির্মাণ, সংরক্ষণ, যোগাযোগ সবক্ষেত্রেই আছে গ্রামীণ নারীর অবিস্মরণীয় ছাপ ও ছন্দ। আমাদের সামনে সবসময় একটা দগদগে পুরুষালি বর্ণবাদী আয়না থাকে বলে আমরা ভুলে যাই গ্রামীণ নারীর কর্মপরিসর, অবদান এবং মহিমা। আমরা তাই স্বীকৃতি কিংবা সম্মানের ময়দান উন্মুক্ত করিনি, বরং জাদরেল কায়দায় রুদ্ধ করেছি। আজ পরিস্থিতি পাল্টেছে, গ্রামীণ নারী আর আগের সেই পরিধি ও পরিস্থিতিতে নেই। নয়াউদারবাদী করপোরেট দুনিয়ার বিশ্বায়িত বাজারে দাঁড়াতে হয়েছে গ্রামীণ নারীকে আজ। গ্রামীণ কৃষি উৎপাদন থেকে সম্পূর্ণত উদ্বাস্তু ও বিচ্ছিন্ন হয়ে আজকের গ্রামীণ নারীদের গার্মেন্টস কিংবা করপোরেট কারখানার নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেছে নিতে হচ্ছে। কিংবা শহরে এসে নাম-পরিচয় হারিয়ে হতে হচ্ছে ‘কাজের বুয়া’।

বুঝলাম এতে উন্নয়ন ঘটছে, জিডিপি বাড়ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে গ্রামীণ নারী গ্রাম ছাড়ছে প্রতিদিন, তাতে আমরা কী হারাচ্ছি তার কি কোনো খতিয়ান আছে? নারী সর্বোপরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে খাদ্যব্যবস্থা থেকে। স্মরণ রাখা জরুরি নিয়ানডার্থালদের যুগ থেকে আজকের হোমো স্যাপিয়েন্স সব মানুষই যুদ্ধ করে খাদ্যের জন্য। খাদ্যের জন্যই লড়াই, দরবার, যুদ্ধ, সংঘাত, সংহতি। আর আজ গ্রামীণ নারীকে কী নিদারুণ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে তার নিজের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন থেকে। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ নারীর মাধ্যমেই বিকশিত ও রূপান্তরিত হয়েছে।  ‘বস্ত্রবালিকা’ নামে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে তানভীর মোকাম্মেলের একটি প্রামাণ্যচিত্র আছে। ছবিটির মূলচরিত্র নূরজাহান গ্রামের এক কিশোরী যার নিদারুণ গন্তব্য হয়েছিল গার্মেন্টস। ছবিটিতে নূরজাহানের বাবা ও তানভীর মোকাম্মেলের কিছু আলাপ আছে। যেখানে তানভীর মোকাম্মেল নূরজাহানের বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, গ্রামে একটা মেয়ে কি কোনো আয় করতে পারে? এর উত্তরে বাবা জবাব দেন, গ্রামে মেয়েরা কী আয় করবো? ছবিতে এরপরের ধারাভাষ্যটি খুবই গুরুত্ববহ ও রাজনৈতিক। ধারাভাষ্যে বলা হয়...‘যেসব নারীর অবধারিত পরিণতি ছিল স্বল্প বেতনে গৃহপরিচারিকা হওয়া আজ তারা গার্মেন্টসে কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প দরিদ্র মেয়েদের জন্য নিয়ে এসেছে এক বিরাট সুযোগ। এ ছিল এক অনাবিষ্কৃত শ্রমশক্তি। অথচ আগে এই শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্য ছিল না।’

আদতেই কি গ্রামে একটি মেয়ের আয়-রোজগারের কোনো ব্যবস্থা নেই? নাকি গার্মেন্টসের মতো নয়া করপোরেট খাতে সস্তাশ্রমে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণকে পোক্ত করতে এই ধারাভাষ্য তৈরি হয়েছে? এর মাধ্যমে গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থা এবং গ্রামীণ রূপান্তরে নারীর ভূমিকা ও অবদানকে কৌশলে আড়াল করে ফেলা হয়েছে। নারীর ওপর নিপীড়ন আর আড়ালীকরণের এমনতর বৈধতাই গ্রামীণ নারীর অবদানকে ‘অনৈতিহাসিক’ করে রাখছে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের গ্রামীণ গরিব কৃষক পরিবারের ১৫-৪৫ বছরের বাঙালি মুসলিম নারীদের গ্রাম থেকে সর্বাধিক অভিবাসন ঘটেছে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে। এই উপার্জনকারী নারীরা আজ মিনিপ্যাক শ্যাম্পু ব্যবহার করেন, নিজে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন, বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে যান, মোবাইলে বাড়িতে টাকা পাঠান। পাশাপাশি এই নারীরা তাজরীন কি রানাপ্লাজায় অঙ্গার হয়ে বা থেঁতলে মরে গিয়ে কেবলই একটি ‘মৃত সংখ্যা’ হয়ে যান। 

গ্রামীণ নারীর কী আছে? আছে পরিচয়, অস্তিত্ব, ইতিহাস, লড়াই, মেধা আর সৃজনশীলতা। বাংলাদেশের ২৩০টি নদী অববাহিকায় যত ধরনের মাটির চুলা আছে তার হিসাব কি করেছে রাষ্ট্র? এইসব মাটির চুলার নির্মাণ ও কারিগরি নিয়ে কি বিস্তর কোনো গবেষণা ও জাতীয় বাজেট বরাদ্দ হয়েছে। গ্রামে গ্রামে নারীদের গড়ে তোলা বসতবাড়ি বাগানগুলোর বিন্যাস ও সজ্জা নিয়ে আমরা কতটুকু ভেবেছি? কিংবা প্রতিনিয়ত কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে গ্রামীণ নানা উপকরণ আবিষ্কার ও ব্যবহারকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিয়েছি? গ্রামীণ নারীর এই মেধা, কারিগরি ও উৎপাদনশীলতাকে মূলধারার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা সম্ভব ছিল। তাতে গ্রামীণ নারীর আয়ক্ষেত্র বাড়ত, উপার্জন বাড়ত, স্থানীয় সম্পদের সৃজনশীল ব্যবহার হতো, ভোক্তা হিসেবে আমরা পরিবেশবান্ধব সাংস্কৃতিক উপকরণ ও উপাদান পেতাম। এই গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের জল-মাটির গন্ধ থাকত।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গরিব মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদই হচ্ছে কেন্দ্রীয় ভিত্তি, যার প্রাথমিক সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে গৃহস্থালি পরিবেশে এর ব্যবহার পর্যন্ত সব কাজই করতে হয় নারীদের। গ্রামীণ নারীরাই প্রাকৃতিক বায়োমাসের সংরক্ষক এবং ব্যবস্থাপক। গ্রামীণ নারীরা প্রাকৃতিক সম্পদের বৈশিষ্ট্যময় রক্ষক এবং ব্যবস্থাপক। প্রাণসম্পদের এক্স-সিট্যু জিনব্যাংকের ব্যবস্থাপকও নারীরা। প্রাণবৈচিত্র্যের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের পথপ্রদর্শক এই নারীরাই লোকায়ত জ্ঞানের মাধমে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মুখ্য ভূমিকা পালনকারী জ্ঞান-আধার। গ্রামীণ নারীরাই প্রাণসম্পদের সুশৃঙ্খল ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন ঐতিহ্যগত এক অনন্য সম্বন্ধ। যেখান থেকে নারীকে উচ্ছেদ করা মানে প্রাণসম্পদের ধারাবাহিক বিরাজমানতাকেও উল্টেপাল্টে দেওয়া। কেবলমাত্র আবাদি কৃষি ও জুম প্রাণসম্পদ নয়, যাপিত জীবনের ধারাবাহিকতায় নারীর অপরিসীম ধৈর্য ও বিজ্ঞান কলার ভেতর দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে এমন সব প্রাণসম্পদ যার বৈচিত্র্যময় ব্যবহারই এখনো টিকিয়ে রেখেছে আমাদের অস্তিত্ব বা যদি আমরা আয়তন অর্থে অনেক বড় করে বলি তবে বলতে হয় প্রতিবেশের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা।

কুড়িয়ে পাওয়া শাকসবজি-ফলমূল ও নানান খাবার উপকরণ যেমন সংগ্রহ করেন নারী, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবার একই কায়দায় চিকিৎসা কি জীবনযাপনের নানান কিছুই নারীর মাধ্যমে চিহ্নিত, আবিষ্কৃত এবং ব্যবহৃত হয় এই প্রাণসম্পদের অসীম ভান্ডার থেকেই। নারীর ঐতিহাসিক সংরক্ষণ বিজ্ঞান ঠিক একই কায়দায় ব্যবহৃত হয় এবং ব্যবহৃত হয় না সব প্রাণসম্পদের সুস্থিত উপস্থিতিকেই সমর্থন করে। যা অবিবেচিত থাকলে আমরা আর চলতি সময়ের জলবায়ুজনিত পরিবর্তনশীলতা, পরিবেশগত বিপর্যয় বা ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি কোনোটাই মোকাবিলা করতে পারব না। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রাকৃতিক সম্পদের ঐতিহাসিক ব্যবস্থাপক নারীকে বারবার তার আপন সম্পর্ক থেকে উচ্ছেদে তৎপর, দখলে মাতোয়ারা। প্রাণসম্পদ যখনই দখল বা নিয়ন্ত্রিত হয় যখন এর সঙ্গে কোনো ঐতিহাসিক স্থানিক সম্পর্ক থাকে না তখনই এই প্রক্রিয়া প্রাণসম্পদের জন্য এবং প্রাণসম্পদ নির্ভর জীবনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র এখনো গ্রামীণ নারীর প্রাণসম্পদ রক্ষার পাটাতন থেকে এই ঝুঁকিকে বিবেচনা করেনি বা আমলে নেয়নি।

পাহাড় থেকে সমতল, দেশ থেকে দুনিয়া কোথাও গ্রামীণ নারীর স্বীকৃতি ও মর্যাদা নেই। তারপরও গ্রামীণ নারীর জন্য একটি আন্তর্জাতিক দিবস আছে। ১৯৯৫ সালেই গ্রামীণ নারীদের খাদ্য উৎপাদনসহ বহুমুখী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের স্বীকৃতির জন্য বেইজিং সম্মেলনেই প্রতি বছরের ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের’ ১১ এবং ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ/ধারায় গ্রামীণ নারীর প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়েছে। বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় যে ধরনের কাজ নারীর জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত, গর্ভকালে তাদের সে ধরনের কাজ থেকে বিশেষভাবে রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে (ধারা-১১/২ঘ)। কৃষিঋণ ও অন্যান্য ঋণ, বাজারজাতকরণ সুবিধা ও উপযুক্ত প্রযুক্তি লাভের সুযোগ পাওয়া এবং ভূমি ও কৃষি সংস্কার ও সেই সঙ্গে ভূমি পুনর্বণ্টন স্কিমের ক্ষেত্রে সমান অধিকার লাভ করা (ধারা-১৪/২ছ)। কিন্তু আমরা কী দেখি? গ্রামীণ নারীরা বিপজ্জনক সিনথেটিক সার ও রাসায়নিক বিষভর্তি গ্রামের ভেতর গর্ভকাল পাড়ি দেন। গ্রামীণ নারীর খাদ্যে মিশে আছে বিষ। এই বিষ থেকে কি গ্রামীণ নারী বাঁচবেন কিংবা এই বিষের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের প্রস্তুতি কেমন হতে পারে?

প্রতি বছর গ্রামীণ নারী দিবসের একটি প্রতিপাদ্য থাকে। করোনাকালে এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো, গ্রামীণ নারী ও কিশোরীদের সঙ্গে দৃঢ় সক্ষমতার বন্ধন। এই বন্ধন দৃঢ় হতে হলে দরকার গ্রামীণ নারীর অবদানের স্বীকৃতি ও মর্যাদার সংস্কৃতিকে জাগাতে হবে সব প্রাণের মধ্যে।

লেখক গবেষক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত