শাহরুখ খান এবং গণমাধ্যমের দায়িত্ব

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:২০ এএম

বলিউড বাদশাহখ্যাত শাহরুখ খান সংবাদমাধ্যমের খবর হন নিয়মিতই; গণমাধ্যমে তাই তার নিয়মিত জায়গা করে নেওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত তো বটেই, বাংলাদেশসহ বিশ্ব গণমাধ্যমে শাহরুখের উপস্থিতি ঠিক প্রত্যাশিত নয়। কারণ! কোনো নতুন চলচ্চিত্র বা অভিনয়ের সংবাদ দিয়ে নয়, বরং সন্তান আরিয়ানের কারণেই বলিউড বাদশাহর খবর হয়ে ওঠা।

আরিয়ান সম্প্রতি এক ক্রুজ পার্টিতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মাদক গ্রহণের দায়ে এনসিবি (নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো)-র হাতে আটক হয়ে বর্তমানে জেলে রয়েছেন। আর এ খবরে তটস্থ শাহরুখ সব কাজ ফেলে ব্যস্ত এখন এর পেছনে, যদিও সর্বশক্তি লাগিয়েও মুক্ত করতে পারছেন না প্রিয় সন্তানকে। জেলে সন্তানের সঙ্গেও ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছেন না তারা। নামিদামি আইনজীবী নিয়োগ করে বারবার চেষ্টা করেও ছেলের মুক্তি মিলছে না। এ নিয়ে চলছে মাতামাতি, নানা মতের ছুটোছুটি।

প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমগুলো এ সংক্রান্ত সংবাদ ও বিতর্ক নিয়ে মুখরোচক সংবাদ তুলে ধরছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবরগুলো শেয়ারের পাশাপাশি নানারকম নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে তারকার পরিবার এবং সন্তানদের। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না অভিনয় জগতের তারকা হলেও তারা আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। সাধারণ মানুষদের মতো তাদেরও সন্তান প্রতিপালনে ঘাটতি থাকতে পারে। এজন্য সন্তানের বিতর্কিত কর্মকান্ডের দরুণ বাবা হিসেবে শাহরুখকে, মা হিসেবে গৌরীকে ব্যর্থ ঘোষণা করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর কোনো মানে নেই।

এ বিষয়টিতে বরং আবারও প্রমাণিত হলো, আমাদের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে অর্থ-বিত্ত আপাত সুখ এনে দিলেও মানসিক সুখই মূল।

বলিউডের মতো প্রতিযোগিতার বাজারে বিত্তহীন পরিবার থেকে উঠে আসা শাহরুখ অনেক পরিশ্রম করে আজকের এই খ্যাতি ও অর্থ উপার্জন করেছেন। তাই হয়তো তার মতো কষ্ট যাতে সন্তানদের না হয় সেজন্য সদা তৎপর ছিলেন। কিন্তু কতটা সময় তিনি বাবা হিসেবে সন্তানদের দিয়েছেন? নাকি ব্যবসা-চলচ্চিত্র সব মিলিয়ে নিজের সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আটকের পরে জিজ্ঞাসাবাদে আরিয়ান বলেছেন, বাবা তাকে সময় দিতেন না। কিন্তু এটাও ভাবনার যে, বিত্তশালী পিতার সন্তান হিসেবে তেইশ বছরের আরিয়ান শাহরুখের তৈরি করা খ্যাতি, বিত্তকে এ যাবৎ কীভাবে ব্যবহার করেছেন! জীবনে কিছু হওয়ার চেষ্টা করেছেন নাকি মা-বাবার উপার্জিত অর্থ-বিত্ত আর জৌলুশের মধ্যেই হাবুডুবু খাচ্ছেন। বিষয়টা অবশ্যই ভাবনার।

অন্যান্য পেশার মতো বলিউডেরও খুব সাধারণ ব্যাপার হলো স্বজনপ্রীতি। তাই খ্যাতনামা অভিনেতা বা তারকার সন্তানরা একই পেশায় থাকবে সেটাই ধরে নেওয়া হয়। যোগ্যতা, গুণাবলি থাকুক না থাকুক। তাই নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়লেও মহৎ গুণাবলি, নিষ্ঠা, বোধ তাদের মধ্যে কমই তৈরি হয়। পারিবারিক, সামাজিক ইতিবাচক পরিবেশের সংকট এতে মূলত দায়ী। তবে এক্ষেত্রে দাগি অপরাধীর মতো মাদক বহন ও সেবনের দায়ে অপরাধী হিসেবে জামিন না দিয়ে জেলে রেখে তাকে কি আরও ভয়ংকর অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না?

ইতিমধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার এবং এর পূর্বাপর নিয়ে নানা ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। তবে প্রশ্ন ওঠে, গণমাধ্যমে তাকে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটা কি মুখরোচক খবরের তাগিদে নাকি মাদক নিয়ে সোচ্চার হওয়ার কারণে? এর ফলাফল কী হতে পারে, তারকা সন্তান হওয়ার কারণে যেটা আমরা দেখেছি সঞ্জয় দত্তের ক্ষেত্রে। মাদক, অস্ত্র মামলা সবকিছু নিয়ে তালগোল পাকিয়ে জীবনকে সিনেমার চেয়েও বেশি কিছু করে ফেলেছিলেন এ সুনীল দত্তপুত্র। তাই আশা করি আরও একটা সঞ্জু আমরা পেতে যাচ্ছি না!

একইসঙ্গে, সন্তানের অপরাধে বাবা-মাকে অপরাধী বানিয়ে বিচারের মুখে ফেলে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? প্রায়ই এই বিষয়টির সরল সমাধান করা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি চীনে সন্তানের অপরাধের কারণে মা-বাবাকে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে পরিবার ব্যক্তির প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা শিক্ষার মাধ্যম। এর পরেই বন্ধুবান্ধব, শিক্ষালয়, ব্যক্তির মানসিক গড়ন, চারপাশের পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়গুলোও মুখ্য। পরিবার ছাড়া বাকি মাধ্যমগুলোকে অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। যেখানে প্রত্যেকটিই তার মনন-চিন্তনে নানা আঙ্গিকে প্রভাব ফেলে। তাই এককভাবে ব্যক্তিকে দোষারোপ করতে মা-বাবাকে টেনে আনা আদৌ কতটা অর্থপূর্ণ ও যৌক্তিক?

এছাড়া পুরো ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা শুরু থেকেই বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা, একই সময়ে যেখানে মাদক গ্রহণের দায়ে শাহরুখপুত্র আটক ও হাজতে। সেখানে উত্তর প্রদেশে কৃষক আন্দোলনে কৃষকদের ওপরে গাড়ি চালিয়ে চারজনকে হত্যার অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ছেলে আশিস মিশ্রা এখনো বহাল তবিয়তেই আছেন। শাহরুখপুত্রের বিষয় নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমের নানা মুখরোচক সংবাদের জেরে সেই ঘটনাটি চাপা পড়ে যাওয়ার জোগাড়। মারাত্মক অপরাধ করেও রাজনৈতিক নেতার পুত্র বলে তিনি যেন পার পেয়ে না যান সেই বিষয়টি নিশ্চিত করাও গণমাধ্যমেরই দায়িত্ব। তাই দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সংবাদ করা এবং মুখরোচক সংবাদ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমাদের চারপাশেও এমন ঘটনা অহরহই ঘটে যেখানে মা-বাবার কর্মব্যস্ততার সুযোগে পারিবারিক পরিবেশের ঘাটতিতে সন্তান বখে যায়। তাই যতই তারকা হন না কেন, তাদের এই দুর্বলতার সুযোগে মিডিয়া যেভাবে বিচারকের কাজ শুরু করে দিয়েছে তা কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না। আর তারকা বলে শাহরুখের ছেলে গণমাধ্যমে স্থান পাবে আর তার কারণে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিকে চাপা দিয়ে দেওয়া হবে এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। বরং নিরপেক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে নিয়ে আসাই গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব। যদিও ইতিমধ্যেই এই বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মত দাঁড়িয়ে গেছে যার প্রকাশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে।

এ বছরের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘তথ্য জনগণের পণ্য’। তাই তথ্য যাতে গণমানুষের কল্যাণে কাজ করে সেই লক্ষ্য নিয়েই গণমাধ্যমগুলোর কাজ করা উচিত।

লেখক শিক্ষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত