(প্রথম কিস্তির পর)
পরের তারিখ ২৪ জুলাই ১৯৯৫, বাদী জ্ঞান বাবু হাজির হলেন কাগজপত্র নিয়ে সাক্ষ্য দিতে। তার পক্ষে সাক্ষী তিনি একাই, সব কাগজই সরকারি। খাড়া সরকারি কৌঁসুলিও (সংক্ষিপ্তরূপ ‘জিপি’ পরিচিত বেশি, আদতে ‘গভর্নমেন্ট প্লিডার’; সোজা বাংলায়: জেলায় সরকারের প্রধান দেওয়ানি উকিল) তিন বিবাদীর পক্ষে। বাদীপক্ষের একমাত্র সাক্ষী পিডব্লিউ-১ (প্লেইন্টিফস উইটনেস-১) জ্ঞান বাবুর জবানবন্দি নেওয়া হলো। বিস্তর কাগজপত্র প্রমাণচিহ্নিত করা হলো তার। মামলায় কাজগপত্র দাখিল থাকলেই আদালতের আমলে (বিবেচনার) যায় না সংগোপনে। আমলে নেওয়াতে চাইতে হয় দাখিলকারী পক্ষকে প্রকাশ্যে প্রমাণ দেখিয়ে। সাক্ষীর জবানবন্দিতে বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে পেশ করতে হয় সমর্থনের কাগজপত্র অপরপক্ষের চোখের সামনে; যেন জেরায় তারা বাজিয়ে দেখতে পারে সেটার সিলছাপ্পর, প্রতিটা অক্ষর; আসল কি নকল, কাজের কি অকাজের। আন্ধা কানুনকে না আবার যা-তা দেখিয়ে ধান্দা সারে। সর্বসমক্ষে পেশ হলে প্রমাণের চিহ্ন দেওয়া হয় বাদীপক্ষেরটায় সংখ্যা দিয়ে, বিবাদীপক্ষেরটায় হরফে। তারপরে আদালত আমলে নিয়ে বাজিয়ে দেখবে রায়ে।
জিপি সাহেব বাজালেন আচ্ছা করে বাদী-সাক্ষী জ্ঞান বাবুকে আর তার কাগজপত্র। দিনটাই গেল এক সাক্ষীর জেরা-জবানবন্দিতে। এক সাক্ষীতেই সাক্ষী শেষ বাদীপক্ষের। এবার পালা বিবাদীপক্ষের। জিপি সাহেব জানালেন তার সাক্ষী আর কাগজপত্র সবই আছে আইন মন্ত্রণালয়ে, টাইম লাগবে। ঠিক আছে, আনেন পরের তারিখে। বললেন, আনাতে সমন লাগবে আদালতের। বললাম, তবে তো দরখাস্তও লাগবে আপনার, কোন কোন কাগজ আর কাকে তলব করাবেন (দেওয়ানি কার্যবিধির ১৬ আদেশের ১ বিধি)। তলবের দরখাস্ত দিলেন শাখার কর্মকর্তা দিয়ে বাদীর ছাঁটাইয়ের নথি পাঠাবার জন্য। সমন দেওয়া হলো আইন মন্ত্রণালয়ে। মাস দেড়েকের টাইম হলো (সমন পাওয়ার পর সাক্ষীর প্রস্তুত হয়ে হাজির হওয়ার মতো ‘রিজন্যাবল টাইম’ দেওয়ার কথা দেওয়ানি কার্যবিধির ১৬ আদেশের ৯ বিধিতে বলা আছে)। পরের সেই তারিখে আইন মন্ত্রণালয়ের সাক্ষীও এলো না, নথিও না। জিপি সাহেব এলেন টাইম পিটিশন হাতে। দেওয়া হলো আবারও টাইম মাস দেড়েকের। নভেম্বরের তারিখটাতেও একই হাল, জিপি সাহেবের টাইম পিটিশন। ডিসেম্বর ‘সিভিল কোর্ট ভ্যাকেশন’-এর মাস। তারিখ গেল ১৯৯৬-এর জানুয়ারিতে।
আগে থেকেই চলছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন স্রেফ জনগণের ভোটাধিকারের প্রদর্শনী করে সেই দলের সরকার চালাবার মেয়াদ নবায়ন! সরকারে দল পাল্টানোর লাগসই তন্ত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উদ্ভাবনটা হয়েছিল নড়াইলেরই পাশে মাগুরা-২ আসনে ১৯৯৪-এর ২০ মার্চের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থেকে। তোলা মাত্রই দাবি মানা হলে সরকারের ইজ্জত যায়! শুরু হলো মিছিল, মিটিং, হরতাল। সরকারের মন গলাতে না পেরে ১৯৯৪-এর ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী ১৪৭ জন সদস্য একযোগে পদত্যাগ করে থাকলেন সংসদ বয়কটে। শুধু সরকারি সদস্য নিয়ে ৯০ দিন পার করে ১৯৯৫-এর জুনে প্রশ্ন উঠল পদত্যাগপত্রগুলোর ও তাদের আসনগুলোর কী হবে! আসন শূন্য হয়নি বলে স্পিকারের রুলিং সরকারি সদস্যদেরই নাপছন্দ। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে চাওয়া হলো আপিল বিভাগের মতামত। পদত্যাগীদের আসন শূন্য বলে পাওয়া গেল মতামত। প্রথমে সেপ্টেম্বরে, পরে ডিসেম্বরে উপনির্বাচনের তারিখ ফেলেও হরতাল আর অবরোধে গেল ভেস্তে। ২৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদই ভেঙে দেওয়া হলো। ১৯৯৬-এর ১৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন রেখে ৩ ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা হলো।
ডিসেম্বরের শুরুতে সিভিল কোর্ট ভ্যাকেশনে গেছি বাড়ি (রাজশাহী)। ৪/৫ তারিখে টিভি (কেবল টিভি নয়, বাড়িতে ছিল কেবল বিটিভি) স্ক্রলে আর সংবাদে দেখা গেল ইলেক্টরাল ইনকোয়ারি কমিটিকে যার যার কর্মস্থলে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগ দিতে বলা হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটি করা হয় প্রতি জেলায় একজন সাব-জজ ও একজন সিনিয়র সহকারী জজ দিয়ে, আদালতের অভিভাবক সুপ্রিম কোর্টের সায় নিয়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও ছিলেন বিচারপতি। নড়াইলের কমিটিতে আমি পড়েছিলাম সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে। নির্বাচনের পরে হার-জিতের বিবাদভঞ্জ হিসেবে ইলেকশন ট্রাইব্যুনাল জজ ছিল বরাবরই। নির্বাচনের আগেই জজকে কোর্টের বাইরে নির্বাচনের মাঠে দারোগাগিরিতে নামানোর তন্ত্রটা আবিষ্কার হয়েছিল সেবারই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার রাজনীতির চালে। জিওল শিংঘিকে কি ঢাকা যায় বোঁটা ছেঁড়া শাকপাতায়! দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনাকে নিরপেক্ষতার লেবাস পরাতে বলি দেওয়া হয় বিচারকদের। জনস্বার্থ ভারি!
ভ্যাকেশন ফেলে পড়িমরি করে ছুটে এলাম নড়াইল। দেখি, কাকপক্ষীও নেই কোর্টে; সুনসান একেবারে। ম্যাজিস্ট্রেসি তো তখন কালেক্টরিতে। এক ভ্যাকেশন জজ দু-তিন দিন আসেন দু-তিন বারে। আমার কমিটির সিনিয়র সদস্য সাব-জজ সাহেবের পাত্তা নেই মোটে। একা একা কত দিন আর বাসায় বসে বসে থাকা যায়! বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নামবে না নির্বাচনে। নির্বাচনই হয় কি না দুনোমনো তখন রাজনীতির মাঠ। নির্বাচনের বাতাসই ওঠেনি। ১৫ ডিসেম্বরে নির্বাচনের তারিখ পাল্টিয়ে করা হলো ১৯৯৬-এর ৭ ফেব্রুয়ারি। অনিশ্চয়তা ঘোরতর। ধেত্তিরিকা! ফিরে গেলাম বাড়ি।
১৯৯৬-এর ৮ জানুয়ারি আবার নির্বাচনের তারিখ পাল্টিয়ে করা হলো ১৫ ফেব্রুয়ারি। পড়ল বাড়ি ঢাকে, সারা দেশে লেগে গেল জোরদার হরতাল, অবরোধ, প্রতিরোধ, খুনোখুনি। কষ্ট হলেও কোর্টে আসতেই হয় বিচারকদের, চাকরির স্বার্থে। আইনজীবীরাও আসেন বটে স্বভাব রক্ষার্থে। তবে, মামলা করেন না সমিতির (আইনজীবী সমিতির) সিদ্ধান্তের সম্মানার্থে। মক্কেল, সাক্ষী (বিচারকও) কষ্ট করে হাজির হয়ে বেকার ঘুরেন কোর্টে কোর্টে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে নেওয়া সিদ্ধান্ত (আইনজীবী সমিতির) গণতন্ত্রের নয়া জমানায়ও দিব্যি খাটে! জ্ঞান বাবুর মামলার বিবাদীপক্ষের সাক্ষী আসবে কী করে ঢাকা থেকে! জানুয়ারির তারিখটাও মার গেল, টাইম হলো, তাগিদপত্র গেল আইন মন্ত্রণালয়ে। হরতাল, অবরোধ, প্রতিরোধ, বয়কটেও রোজার দিনে নির্বাচন হয়ে গেল ১৫ ফেব্রুয়ারি। ইলেক্টরাল ইনকোয়ারি কমিটিতে কোনো অভিযোগ আসেনি। ঈদের পরে মার্চে শুরু হলো লাগাতার অসহযোগ। গাড়িঘোড়া, দোকানপাট, রাস্তাঘাট বন্ধ সবই। এক সকালে আইনজীবীরা দল বেঁধে আমাদের চেম্বারে চেম্বারে এসে বলে গেলেন কোর্ট বন্ধ বিজয় না হওয়া পর্যন্ত। তালা লাগালেন প্রধান ফটকে। সবাই গেলাম জেলা জজের কাছে। দেখি, অসহায় তিনি নিজেও। আইন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট কোনো দিশা দিতে পারেনি তাকে। পুরো মার্চ মাসটা নিজ নিজ বাসায় কাটল আমাদের। ডায়েরিতে মামলা আছে প্রতিদিন, সেগুলোর কী হবে! প্রতিদিনের মামলাগুলোর পরবর্তী তারিখ তো দিতে হবে প্রতিদিন! সেরেস্তাদার, পেশকাররা নথি, আর ডাইরি-কজলিস্ট লিখে রাখত সময় সুযোগ বুঝে। ৩/৪ দিন পর পর আমরা হেঁটে হেঁটে কোর্টে গিয়ে সই করতাম ‘দেশব্যাপী লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের কারণে আইনজীবীরা আদালতের কাজে বিরত থাকায়’ পরবর্তী তারিখ দিয়ে। ‘জনতার মঞ্চ’ বসল ঢাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে। ফেইসবুক, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মাথাতেই আসেনি তখনো ১১ বছরের নাবালক মার্ক জাকারবার্গ (১৯৮৪), ১৬ বছরের নাবালক জাওয়াদ করিম (১৯৭৯), ১৭ বছরের নাবালক স্টিভ চেন (১৯৭৮) বা ১৮ বছরের সদ্য সাবালক চাদ হারলি (১৯৭৭) কারও। ডিশ-লাইন সবে শুরু হলেও বেসরকারি টেলিভিশন আসেনি তখন দেশে। বিটিভির খবর সবই সরকারি। সরকারের রাস ঢিলা হলে খবর ছড়ায় বাতাসে, বেরোয় কিছু পত্রিকার পাতাতেও।
দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে সরকার গঠন হলো, সংসদ বসল, পাস হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল (সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী)। ৩০ মার্চ সংসদ ভেঙে দেওয়া হলো, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ হলো, সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হলেন। শান্ত হলো দেশ। চালু হলো সব কিছুর সঙ্গে কোর্টও। নির্বাচনের ১২ জুন অনেক বাকি। জ্ঞান বাবুর মামলায় ১১ মে তারিখ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে তাগিদ দেওয়া হলো। এবার এলেন সেই শাখার এক কর্মকর্তা জ্ঞান বাবুর ছাঁটাইয়ের সেই নথি নিয়ে। ডিডব্লিউ-১ (ডিফেনডেন্টস উইটনেস-১) হিসেবে তার জবানবন্দির সঙ্গে সঙ্গে নথির কাগজপত্র উপস্থাপন হলো। সেগুলো কপি করানো হলো। আসলের সঙ্গে মিলিয়ে কপিতে প্রমাণচিহ্ন দিয়ে আসলে নোট লিখে নথি ফেরত দিলাম হাতে হাতে (দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩ আদেশের ৫ বিধি, সিআরও-এর ১১৬ বিধি অনুসরণে)। এক সাক্ষীতে বিবাদীরও সাক্ষী শেষ। যুক্তিতর্কের দিন পড়ল ১৮ মে। শোনা হলো যুক্তিতর্ক। জ্ঞান বাবুর মামলার শুনানি শেষ। রায়ের তারিখ গেল ২৭ মে ১৯৯৬। রায়টা এবার লিখতে হবে।
(পরবর্তী অংশ আগামী কিস্তিতে)
লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক