চোখটা ঢাকুন ঘরে থাকুন

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ১০:৪৯ পিএম

১. মন্ডলবাড়ির গৃহকর্মী হোসনা হঠাৎ লজ্জায় মুখ ঢাকল। বলল, দাদি আমি দাদার ঘরে যাইতে পারব না। আর তেনারে পায়জামা পরতে দিয়েন। বেফাঁস হয়ে থাকে। আমারে দেখলে বুড়ার আরও শয়তানি চাপে। আপনি তারে ডাক দিয়ে দিয়েন। নাইলে আমি কি করি! জানি না।

এই গল্পটা এইটুকুই বলার মতো শোভন পর্যায়ে রয়েছে। বাকি গল্প নিশ্চয়ই সবাই আন্দাজ করতে পারছেন। এটা নব্বই দশকের কথা। দাদার বয়স ৬১। সদ্য  অবসরে গেছেন। এখন ভোরে নামাজ পড়ে আরেকবার ঘুমান। ঘুম থেকে ওঠাতে হোসনে আরার ডাক ভালোই লাগে। তো হোসনে আরা দাদির অনুরোধে ডাকতে যায়। ঘরে ঢুকতেই জোরে জোরে কথা বলে, ‘দাদা উঠেন। লুঙ্গিটা সামলান।’ দাদা এইটুকুতেই মহাতৃপ্তি অনুভব করেন। তিনি ভালো মানুষ এবং চরিত্রবান হিসেবে পরিচিত। অবশ্য এই ছোটখাটো রসটুকু ছাড়া হোসনে আরার প্রতি তার আর কোনো গল্প নেই।

২. নবম শ্রেণি পড়ুয়া রুপতি। মগবাজারে তিনতলায় থাকে। পাশে লাগোয়া আরেকটা বাসার বারান্দা। একচিলতে বাসা, মাঝে মাঝে বারান্দায় যাবে, তার কোনো উপায় নেই। পাশের বাড়ির এক ছেলে হাফপ্যান্ট, কখনো স্যান্ডো গেঞ্জি আবার কখনো খালি গায়ে ওই বারান্দায় এসে নানা অঙ্গভঙ্গি করে। যখন দেখে ছেলেটা নেই তখনই বারান্দায় যায় রুপতি। এক পর্যায়ে ছেলেটি বারান্দা থেকে তারচেয়ে ২০ বছরের ছোট মেয়েটিকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। সাড়া না পেয়ে নানা ধরনের টোন। সহ্য করতে না পেরে মাকে বলে রুপতি।

ছেলের মাকে বলে রুপতির মা। ফল সম্পূর্ণ উল্টো হয়। ১৪ বছরের মেয়ের ওপর ওই ছেলেকে প্রভোক করার অভিযোগ আসে। মেয়ের পোশাক-আশাক নিয়ে নানা কথা। এরপর তো পরিস্থিতি এমন হয়, রুপতিদের বাসা ছেড়ে দিতে হয়। ছেলে তো হাফপ্যান্ট পরবেই। ওকি বোরকা পরবে। মেয়ের চোখ সেদিকে যায় কেন? মনে হতেই পারে এই গল্প কেন। এটা তো অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। ঊনবিংশ যায়, বিংশ যায়, এখন একবিংশ শতাব্দীর দাপট। সভ্যতা কতটা এগিয়েছে। আর আমরা সেই কিশোরীকেও ছাড়তে পারছি না। আফগানের তালেবান ভূত আমাদের রাস্তাঘাট দখল করতে চায়। সবকিছুতেই মেয়েদের ওপর দোষ চাপানো। না জানি কবে স্বপ্নদোষের দায়ও মেয়েদের ওপর আসবে।

আসলে কেমন হওয়া উচিত : উচিত হলো যাদের চোখ এতটা স্পর্শকাতর তারা কি বাইরে বের হবে নাকি ঘরে বসে থাকবে। নাকি তারা রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করবে। সাইবার দুনিয়া পৃথিবীর সব আধুনিতাকে এক করেছে। নারী-পুরুষ এক হয়ে কাজ করছে। এই দেশের ছেলেরা বহুত আগেই লুঙ্গি, ধুতি, কোর্তা ছেড়ে সাহেবি পোশাক ধরেছে। জুতো, স্যুট-টাই, টাইট গেঞ্জি, মাসল উঁচু করে কেউ কেউ মাস্তানি করছে। নারী, কিশোরী তরুণীদের টার্গেট করছে। আর সবকিছুই হচ্ছে কন্যার জন্মের কারণে।

যদি ভুল না হয়, তবে এটা তো সত্যি উনিশ শতকের আশির দশকে এই কিশোরী তরুণীরাই পোশাক শিল্পে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এই মেয়েরাই বাংলাদেশ কি না করতে পারে সেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সফল হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন যখন খবর আসে সেই দেশের কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুণী এবং বিভিন্ন বয়সের নারীরা ধর্ষণ, হত্যা এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে সাইবার বুলিং। আর অল্প জানা ধর্মপ-িতদের সাইবার উসকানি যখন নিপীড়নের ক্ষেত্র হয়েছে তখন দেশের ভাবমূর্তি কোথায় যাবে। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ইউটিউব ভরে যাচ্ছে দেশের সস্তা ও অরুচিকর পোস্টে।

দেড় মাস আগে লতা সমাদ্দারের টিপ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড়ের পরপরই আবার নরসিংদীতে একজন নারীর পোশাক নিয়ে যা ঘটেছে তাতে নারী কেনÑ মানুষ যেন বোবা হয়ে গেছে। এখানে পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তারা এক অপরাধীকে ধরতে পেরেছেন, যদিও এখানে প্রধান ভূমিকা সংবাদ মাধ্যমের।

এই ঘটনার পর আমার সহকর্মীর এক ছেলেশিশু তার বাবাকে প্রশ্ন করেছে, ‘আচ্ছা বাবা মানুষ যখন জন্মায় তখন তাদের গায়ে কি পোশাক থাকে। মেয়েদের কি জামা-প্যান্ট পরা থাকে। নাকি সালোয়ার-কামিজ। আমাদের কী পোশাক। শুধুই জাঙ্গিয়া নাকি জামাও থাকে। আচ্ছা মেয়েদের সব কিছু ঢেকে রাখতে হয় কেন?’

মধ্যম আয়ের দেশের দিকে আগুয়ান এই দেশের শিশুকিশোর যাদের ওপর ২০৪১ সালের দায়িত্ব উঠবে তারা এখনো যদি নারী-পুরুষের পোশাকের তীব্র দুর্গন্ধ নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা কী করবে? উঠে এসেছে রাষ্ট্রের কথা, আইনের কথা। এই রাষ্ট্রের গোড়ার ইতিহাসে ছেলে-মেয়ের প্রেমের ইতিহাস আছে। সেখানে ধর্ষকের নাম পাই আমরা পাকি পাঠানের চরিত্রে। আমাদের মগজের ভেতর থেকে পোশাকের অন্ধকারাচ্ছন্ন ধারণা যদি বের করতে না পারি তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। বিদেশে গিয়ে স্লিভলেস জামা আর শর্ট প্যান্ট পরা মেয়ে দেখলে হঠাৎ অভ্যাস বসে শিট বলে উঠবে বা এমনভাবে তাকিয়ে থাকবে তাতে দেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

প্রায় তিরিশ বছর পর এসে আমার হোসনে আরার কথাই মনে পড়ছে। নারী-পুরুষের পোশাকের স্বাধীনতা থাকবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের প্রজন্মের অগ্রযাত্রায় যত বাধা আছে সবকিছু প্রতিরোধ করা আজ জরুরি। সবিশেষ বলতে চাই, তারপরও যাদের খুব সমস্যা হয়, তাদের হোসনে আরার মতো বলতে চাইÑ আপনারটা সামাল দেন। না হয় একটা কালো চশমা পরুন। আর আরও বেশি সমস্যা হলে ঘরে থাকুন।

লেখক : সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত