আমাদের নির্বাচন কমিশনাররা সাধারণত রসিক হয়ে থাকেন। রসিকরা রসিকতা করে লোক হাসান। তারা লোক হাসান নির্বাচন করে। এবং নানান নির্বাচনী বাণী দিয়ে।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এমন হানাহানি হয়েছিল যে নির্বাচনে কাটাকাটি পর্যন্ত গড়াবে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। নির্বাচন হলো অবিশ্বাস্য রকমের শান্তিপূর্ণ। সাংবাদিকরা সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাইদের মতামত চাইলেন এ বিষয়ে। তিনি ছোট্ট উত্তর দিলেন, ‘দুষ্টুরা সব পালিয়েছে।’
সন্ত্রাসী-অস্ত্রবাজদের ‘দুষ্টুর’ মতো আদুরে সম্বোধন এমন বিস্ময় জাগানো ছিল যে হজম করতে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু এখন ভেবে দেখি, এটা আমাদের নির্বাচন কমিশনের করা একমাত্র রসিকতা, যাতে হজমে সমস্যা হয়েছিল কিন্তু হাঁ হয়ে যেতে হয়নি। এরপর থেকে যা চলছে, যা বলাবলি হচ্ছে তাতে এই হাঁ আর ছোট হয় না। বড় হয়। হতে হতে এখন এখন এমন অবস্থা যে সেদিক দিয়ে একটা হাঙরও ঢুকে পড়তে পারে।
নির্বাচন কমিশনের নানান রসিকতা শোনার এবং বোঝার স্বার্থে একটা রসিকতা শোনা জরুরি। কে কত মিথ্যা বলতে পারে, মানে সোজা ভাষায় বললে চাপা মারতে পারে তার একটা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা চলছে। জয়ী নির্ধারণের জন্য বসানো হয়েছে চাপা মিটার নামের একটা জিনিস। অনেক লড়াই শেষে আমেরিকা-রাশিয়া এবং ইংল্যান্ডের তিন প্রতিযোগী ফাইনালে উঠেছেন। প্রথমে ইংল্যান্ডের প্রতিযোগী বললেন, ‘আমাদের রানী চিরজীবী হওয়ার একটা শরবত আবিষ্কার করেছেন। সেজন্যই তো দুনিয়া উল্টে যাচ্ছে, শিশুরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, তিনি দিব্যি টিকে আছেন। এদিকে প্রিন্স চার্লস অপেক্ষা করতে করতে এখন নিজেও সেই শরবত খাওয়ার তালে আছেন।’ চাপা মিটার দেখাল, একশতে ষাট। ফার্স্ট ডিভিশন নাম্বার।
এবার, রাশিয়ার মানুষটি উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘পুতিনকে পুরো দুনিয়া এত ভয় পায় কেন? কারণ তিনি ক্রেমলিনে বসে কাউকে একটা ঘুষি মারলে সে উড়ে গিয়ে পড়বে হোয়াইট হাউজে। তিনি যদি মস্কোতে বসে হাই তোলেন তাহলে টেক্সাসে টর্নেডো হয়ে যেতে পারে। সেজন্যই কেউ তাকে ঘাটায় না।’ চাপা মিটার দেখাল, একশতে আশি। লেটার মার্ক।
এবার মার্কিনির পালা। তিনি বললেন, ‘আমাদের দেশে একটা ভালো লোক ছিল।’
আর সঙ্গে সঙ্গেই চাপা মিটার একশর ঘর পেরিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
এর মানে কী! মার্কিন দেশে কোনো ভালো লোক নেই? বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। ওখানে অসাধারণ সব মানুষ আছেন। জনদরদি, বিজ্ঞ, কীর্তিমানের কোনো অভাব নেই। এটা স্রেফ রসিকতা মাত্র। এবং এই রসিকতা এখানে প্রাসঙ্গিক এজন্য যে ভাবমূর্তির কারণে সাধারণ কথাও সম্পূর্ণ অন্য মানে নিয়ে হাজির হয়।
আর এখানেই আমাদের নির্বাচন কমিশন। তারা যখন বলেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে তখন এই গল্পের মতো সবকিছু ফেটে যাওয়ার জোগাড় হয়।
২০১৪ নির্বাচনের পর যেমন রকিবউদ্দীন দাবি করলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। গত নির্বাচনের পর যেমন এ রকম কথা বলে পুরো জাতিকে যথেষ্ট বিনোদন দিয়েছেন মাত্রই বিদায় হওয়া কে এম নুরুল হুদা। এদের চেয়ে অবশ্য অনেক কাঠি সরেস ছিলেন, এম এ আজিজ। তিনি অবশ্য শুধু কথায় নয়। বয়ানের সঙ্গে তার ধরন-ধারণও ছিল চরম বিনোদনের। দুঃখের কথা, শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে নির্বাচনটা তিনি করতে পারেননি। জাতি বঞ্চিত হয়েছে। হলে সেটা এমন বিনোদন ভরপুর হতো যে এই দেশ কোনো দিন ভুলত না।
নির্বাচন কমিশনের কথা আর রসিকতা নিয়ে মেতে ওঠার কারণ অনুমেয়। নতুন নির্বাচন কমিশন এসেছেন এবং এসেই কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কথার মালা গাঁথতে শুরু করেছেন। সিইসি ‘মাঠে থাকতে হবে জেলনস্কির মতো’ বলে রাশিয়ান প্রতিবাদের শিকার হয়েছেন। মেঠো আবেগের সঙ্গে কথাটা খুব যায় কিন্তু সিইসির পদে থেকে এমন বক্তব্য চরম অকূটনৈতিক। এরপর ‘টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান’। এক নির্বাচন কমিশনার সিইসিকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ইভিএম মেশিনে যিনি ভুল ধরতে পারবেন তাকে নাকি সিইসি বলেছেন, টেন মিলিয়ন ডলার বা দশ লাখ ডলার বা দশ কোটি টাকা দেবেন। আশা করি, কোনো নির্বোধ সেই ভুল ধরতে আসবেন না। তাহলে ডলারের এই দুর্মূল্যের বাজারে সিইসির দশ লাখ ডলার জোগাড়ে বাজারে ডলার সংকট আরও বাড়বে।
আজিজ-রকিব-নুরুল হুদাদের মাঝে ছিলেন, এটিএম শামসুল হদা। ব্রিগেডিয়ার শাখাওয়াত এবং ছহুল হোসাইনকে নিয়ে যে নির্বাচনটা তিনি করেছেন সেটা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলে অগ্রহণযোগ্য মোটেও নয়। শামসুল হুদা আমাদের আলোচ্য বাকিদের মতো বাংলাদেশেরই মানুষ। আমলাই ছিলেন। তাহলে তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য কেন? খালি চোখে দেখলে, ক্ষমতায় থাকা সরকার। দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল এবং তারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলে তাদের কোনো পক্ষ নেওয়ার দরকার ছিল না। ক্ষমতার কাছে নতজানু ছিলেন না বলেই স্বাধীনভাবে নিজেদের দক্ষতা প্রয়োগ করতে পেরেছেন। যেমনটা পেরেছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের সময় বিচারপতি রউফ কিংবা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সময় আবু হেনা।
তাহলে সহজ সমীকরণ দাঁড়াচ্ছে ব্যক্তি কোনো বিষয় নয়, বিষয় হলো সরকার। সরকার করতে দিলে ব্যক্তি ব্যক্তিত্ববান হয়ে ওঠেন, না চাইলে ম্রিয়মান হয়ে থাকেন। খোলা চোখে তাই হয়তো সত্য কিন্তু যে ব্যক্তিরা নির্বাচন করতে গিয়ে নিজেদের জীবনের অর্জনের প্রায় সবই বর্জন করলেন এরা কেউ কি আসলে নিজেদের প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন? মানছি, দলীয় সরকার থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব না কিন্তু এমনও কখনো ঘটেনি যে কোনো একজন সিইসি নিজের স্বাধীনতার জন্য গর্জন করেছেন। বলেছেন, আমাকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অতএব...। এমন করলেই কাজ হতো নিশ্চিত নই কিন্তু তারা তাদের জায়গা থেকে তো লড়াইটা করতে পারতেন। উল্টো পদ পাওয়ার আনন্দে এবং ধরে রাখার স্বার্থে তাদের বেশির ভাগই এমন সরকারদলীয় হয়ে ওঠেন যে সরকারেরও মাঝেমধ্যে লজ্জা লাগার কথা। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে নিজেদের ঘনিষ্ঠ মহলে নাকি ফিসফিস করে বলেন, ‘এই চেয়ারে বসে এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই।’
সিস্টেম মানুষকে বাধ্য করে এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও তো ঠিক কোনো কোনো মানুষ সিস্টেম বদলান। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে তার চেনা জানাদের উচ্চ ধারণা আছে। পেশাগত জীবনের নানা ক্ষেত্রে নীতি আর দৃঢ়তার কথা বলেন কেউ কেউ। পরীক্ষা সামনে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করি আর সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ক দু-একটা গল্প শুনি।
এক বনে নির্বাচন হচ্ছে। সব দেখে শুনে, পক্ষ-বিপক্ষের অভিযোগের পর ফল ঘোষণা হচ্ছে। শেয়ালপণ্ডিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফল ঘোষণার ঠিক আগে এক গণ্ডার দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল, ‘সিইসি সাহেব আমাকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’
শেয়াল অবাক হয়ে বলল, ‘তোমাকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ তিন দিন পর কেন?’
গণ্ডার মাথা চুলকে বলল, ‘এটা আসলে আমি এই মাত্র বুঝলাম।’
কে জানে, আমাদের নির্বাচন কমিশনাররা অনেক অনেক দিন পর হয়তো বুঝবেন তাদের সময়ে নির্বাচন ঠিকমতো হয়নি। তখন আর লোক হাসানো কথা হবে না।
আচ্ছা, নির্বাচন কমিশন তো টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান খুঁজছেন। টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান আমরা দেখিনি, তবে সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান দেখা আছে আমাদের। ফ্যান্টাসি এই হিরো লাথির আঘাতে বিশাল দালান গুঁড়িয়ে দিতে পারে। পারে প্রায় যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করতে। ডলারের মূল্যের যে উচ্চলম্ফ তাতে সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যানের এখনকার বাজারমূল্য সিক্সটি মিলিয়ন ডলার হওয়ার কথা, কিন্তু নির্বাচন কমিশন খুঁজছে টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান। অতএব টেন মিলিয়ন ডলারে ইভিএমে ভুল বের করার মানুষ বোধ হয় মিলবে না।
এই ফ্যান্টাসি চরিত্রের কথা লিখতে লিখতে আরেকটা ফ্যান্টাসি মাথায় চেপে বসল। আচ্ছা এসব খোঁজাখুঁজি বাদ দিয়ে সিইসি বা তার কমিশনই তো টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান হয়ে যেতে পারেন। সেই টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান, যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
তার লাথি মেরে দালান চুরমার করতে হবে না, পাখা লাগিয়ে আকাশে উড়তেও হবে না। শুধু সোজা দাঁড়িয়ে থাকার কাজ। মেরুদণ্ডটা সোজা করে। ব্যস। হয়ে যাবে।
লেখক সাংবাদিক ও লেখক