দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল কল্পনাতীত; ৫০ থেকে ৫৫ মিলিয়ন বেসামরিক এবং ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন সামরিক লোক প্রাণ হারায়, ৪০ থেকে ৬০ মিলিয়ন আদম সন্তান হয়ে পড়ে বাস্তুচ্যুত, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের পর্বতপ্রমাণ সম্পদের বিনাশ ঘটে, আর অনাহার-অপুষ্টি-অচিকিৎসা হয় জীবিতদের নিত্যসঙ্গী। এই মনুষ্যসৃষ্ট দানব বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে যাতে আর ফিরে না আসে, মানুষ যাতে শান্তিতে বাস করতে পারে, পায় তার মৌলিক মানবিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত রসদ, রাষ্ট্রগুলো পায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিবাদ মেটানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের অহিংস প্লাটফর্ম, স্বল্পোন্নত দেশগুলো পায় তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার সহযোগিতামূলক ফোরাম, তার জন্য যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে ৫১টি দেশের অংশগ্রহণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে জাতিসংঘ।
অনেক অসফলতা ও সমালোচনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা অসামান্য। প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মাথায় এই প্রতিষ্ঠান সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) সদস্য দেশসমূহের সামনে হাজির করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের যে অধিবেশন এই ঘোষণা চূড়ান্ত করে তাতে প্রথম চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এক অসামান্য মানবতাবাদী নেত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি আন্না এলিনর রুজভেল্ট। অনেক বিরোধিতা সত্ত্বেও তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই ঘোষণায় বেশ কিছু সামাজিক ও মানবিক অধিকার স্থান লাভ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে অবদানের জন্য প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান তাকে ‘ফার্স্টলেডি অফ দি ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে ভূষিত করেন। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরক্ষায় মার্কিন নেতারা শুধু জাতিসংঘের ওপর নির্ভর করতে চাননি; তারা Rudyard kipling Gi White Man’s Burden এর মর্মার্থ আত্মস্থ করে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ক্লায়েন্ট দেশগুলোতে পরিস্থিতি উন্নয়নে তাদের দেওয়া সাহায্যের সঙ্গে মানবাধিকার সুরক্ষার শর্ত জুড়ে দেন। একাজে আইনগত বৈধতা দেওয়ার জন্য তারা প্রণয়ন করেন Foreign Assistance Act, 1961। এই আইনের ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যে সব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সরল রৈখিক প্যাটার্ন চালু হয়ে যাবে, সে সব দেশে কোনো সাহায্য দেওয়া যাবে না। আবার অনুচ্ছেদ ৫০২ (বি)-তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো সব দেশ কর্র্তৃক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার পরিপালনের উন্নয়ন সাধন। এই আইন বলেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কংগ্রেসে উপস্থাপন করে। আর আমরা সেটা নিয়ে হইচই করি।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় যে ৩০টি অধিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তার মধ্যে ২৫ ও ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত অধিকার এই মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমোক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজের ও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবাসহ একটা জীবনমানের অধিকারী। শেষোক্ত অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সবাই একটা সুশৃঙ্খল সামাজিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশে বসবাসের অধিকারী যাতে স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে বড় পরিসরে যুদ্ধবিগ্রহ না থাকায় জাতিসংঘ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কোন্নয়ন ও নিরাপত্তার চেয়ে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার নিয়ে বেশি মনোযোগী ছিল; সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্ট এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট তার বড় দৃষ্টান্ত। এই সেক্টরে বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানটি এতদিন ভালোই কাজ করে যাচ্ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সবকিছু পাল্টে ফেলেছে। মনে হচ্ছে সবাই যেন জাতিসংঘ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে গেছে। জাতিসংঘ এই যুদ্ধ প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। এখনো যে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তার সক্ষমতা বা আলামত কিছুই লক্ষ করা যাচ্ছে না। তবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার স্বার্থে সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোতে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতি ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে যুদ্ধের যে সব নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেগুলোর ধারা বিবরণী দিয়ে যাচ্ছে; আমাদের দেশে যেমন বকাউল্লাহ বলে যায়, আর শোনাউল্লাহ শুনে যায়।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ^জুড়ে ফুড, ফুয়েল, ফিন্যান্স ও ফার্টিলাইজারের বাজার ঘিরে যে দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে, তার কোনো না কোনো ডাইমেনশন থেকে কোনো রাষ্ট্রই এখন আর মুক্ত না। জাতিসংঘের মহাসচিবের ভাষ্যে বিশ্বের ৯৪টি দেশের অন্তত ১.৬ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো একটি ডাইমেনশনে নাকাল হচ্ছে; আর ১.২ বিলিয়ন মানুষ এই সবগুলো ডাইমেনশনের ঘূর্ণিচক্রে আবর্তিত হচ্ছে। ৬০ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের আয় অতিমারী-পূর্ব অবস্থা থেকে কমে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্ধেকেরও বেশি দেশ এখন ঋণ-উৎপীড়নে বা তার উচ্চ ঝুঁকিতে আছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক প্রাক্কলনে দেখানো হয়েছে যে, অতিমারীতে বিশ্বে খাদ্য-অনিরাপদ মানুষের সংখ্যা দুই বছরে বেড়ে ২৭৬ মিলিয়ন হয়ে গেছে; আর যুদ্ধের লহরী প্রভাবে এদের সংখ্যা এ বছর শেষে ৩২৩ মিলিয়নে পৌঁছে যাবে। জাতিসংঘের মহাসচিব স্বয়ং বলেছেন যে, “This years crisis is about lack of access, the next years could be lack of food.” অর্থাৎ এ বছরের সংকট হলো খাদ্য কেনা নিয়ে, আর পরের বছরের সংকট হবে খাদ্য পাওয়া নিয়ে। ইউক্রেনে উৎপাদন কমতি, রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে সরবরাহ সংকট, উপকরণের উচ্চমূল্যে দরিদ্র দেশগুলোর কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সক্ষমতায় ধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের খামখেয়ালিপনায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের লভ্যতা কমার আশঙ্কা অমূলক নয়।
যুদ্ধের ফলে ইউক্রেন থেকে ৬.৮ মিলিয়ন মানুষ দেশত্যাগ করেছে, ৭.৭ মিলিয়ন দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অথচ ইউক্রেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্ধেকের মতো সূর্যমুখী তেল, ১৫ শতাংশ ভুট্টা এবং ১০ শতাংশ গম সরবরাহ করত। রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জ্বালানি তেল সরবরাহকারী এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ কয়লা রপ্তানিকারক দেশ। এই দুই দেশের যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত বাণিজ্য ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার অর্থ বিশ্ব সাধারণভাবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন।
জ্বালানির মূল্য অন্য সব পণ্যের মূল্যকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাবে বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি এখন উচ্চকিত; ইউরোজনে মুদ্রাস্ফীতি ৮.১ শতাংশ, মার্কিন মুলুকে ৮.৬ শতাংশ, বাংলাদেশে মে মাসে পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে তা ৫.৯৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রাক্কলন অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াবে ৮.৭ শতাংশ। এটা ফললে তা সবার জন্য অবশ্যই শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দেখা দেবে।
কভিডের থাবার পর ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমানে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ফেলে চলেছে। অনেক মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক দেশে সমাজ হয়ে উঠছে অশান্ত। কিন্তু এটা তো প্রকৃতি-সৃষ্ট কোনো দৈব-দুর্বিপাক থেকে উৎসারিত নয়; এটা মানবসৃষ্ট একটি দুর্যোগ এবং এই মানবেরা জাতিসংঘ নামক বহুজাতিক সংস্থার প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্রের কর্ণধার। কাজেই তাদের এই কাজ জাতিসংঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের স্থূল লঙ্ঘন।
আজকের এই যে বিবাদ যেভাবে শুরু হয়েছে তার এক দিকের নেতৃত্বে রয়েছেন বৈশ্বিক মানবাধিকারের ধ্বজাধারী আংকেল শ্যাম নিজে। শীতল যুদ্ধের এক কালের প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করতে তিনি মাঠে না নেমে যেভাবে দূর থেকে ত্রিশূল মহাস্ত্র ব্যবহার করে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাতে কোথায় কত উলুখাগড়ার প্রাণ ওষ্ঠাগত হলো, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। মানবাধিকারের কট্টর প্রবক্তার পক্ষে মানবাধিকারের এহেন নগ্ন লঙ্ঘন হ্যামলেটের সেই বিখ্যাত উক্তিকেই স্মরণ করিয়ে দেয় “I must be cruel to be kind.”
শীতল যুদ্ধ অবসানের পর ন্যাটোর মহারথীরা যখন তার অস্তিত্বের কারণে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তখন সেটা সম্প্রসারণের জন্য বিশ্বের এক বড় জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘন তাদের কাছে যেন ‘সামান্য ক্ষতি’। এই ক্ষতি কমানোর যেন কেউ নেই! রাশিয়া অবশ্যই চাইবে এই যুদ্ধ শীতকাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে, যাতে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের চাল-চুলার উভয় প্রান্তে শীতের কামড় অনুভূত হয়। রাশিয়ার এই কৌশল যদি সত্যিই থাবা হানে তা হলে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশের চুলা জ্বালাতে সংকট দেখা দিতে পারে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফলকে সঠিকভাবে চিত্রায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, সব দেশের সাধারণ মানুষ এবং স্বল্পোন্নত দেশের প্রায় সব মানুষ এই যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারকে যেভাবে পঙ্গু করে ফেলেছে এবং মানুষের জীবনকে যেভাবে নিরাপত্তাহীন করে তুলছে, তাতে এই অবস্থাকে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার এই মূল্যায়ন যথার্থ; সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র আর উদ্ভূত পরিস্থিতি পাশাপাশি দাঁড় করালে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সাহসী বক্তব্য রেখেছেন তা যথার্থ হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে তো এখনই বৈশি^ক পরিম-লে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।
এই পটভূমিতে প্রয়োজন ছিল এলিনর রুজভেল্টের মতো এক মানবতাবাদী ফার্স্টলেডির; জিল বাইডেন কি পারবেন ঐ রকম একজন ফার্স্টলেডির ভূমিকা নিতে? অধিকাংশের ধারণা এ কাজ তার পক্ষে আদৌ সম্ভব না। কারণ, এলিনরের মতো ব্যক্তিত্বও এরকম কাজ করতে পেরেছিলেন স্বামীর মৃত্যুর ৩ বছর পর। আর জো বাইডেন তো এখনো জীবিত। তাই নাটকের কুশীলবদের শুভবুদ্ধি উদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর আছে বলে মনে হয় না।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, কলামিস্ট