শুক্রবার ছুটির দিনের মধ্যরাতে বজ্রপাতের আঘাত যেন এসে পড়ল জ্বালানির ডিপোগুলোতে; সব পেট্রল পাম্প জ্বালানিশূন্য। কোনো গ্রাহক পাচ্ছে না জ্বালানি, হোক সে ডিজেল, পেট্রল বা অকটেনের গ্রাহক। এ যেন তেল নিয়ে তেলেসমাতির এক চরম পরাকাষ্ঠা। কোনো রকম জানান না দিয়ে এক লাফে জ্বালানির দাম বেড়ে গেল ৪২.৫ থেকে ৫১.৬৮ শতাংশ। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নামে একটা জিনিসের অস্তিত্ব এদেশে আছে বলে জানি, যার কাজ গণশুনানি অন্তে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য পুনর্নির্ধারণ করার সুপারিশ করা। কিন্তু এত বড় লঙ্কাকাণ্ড ঘটল এই কমিশনের চৌহদ্দির মধ্যে, কিন্তু বেচারা কমিশনের কোনো সাড়াশব্দ শোনা গেল না। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য যা বলেছেন তার অর্থ এই যে, কমিশন তাদের কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে; আগামী মাসের মধ্যেই তারা সুপারিশ হাজির করতে পারবে। কাজেই দরকারি কাজে বসে থেকে সময় ক্ষেপণ করার তো কোনো মানে হয় না; আগে সুপারিশ বাস্তবায়ন করে ফেলা যায়, পরে তা নিয়মিতকরণ করা যাবে। মন্ত্রণালয়গুলো যখন এত দক্ষ ও করিৎকর্মা!
কয়েক দিন আগে ইউরিয়ার দাম বাড়ানো হয়েছে প্রতি কেজিতে ৬ টাকা; এখন তার দাম প্রতি কেজি ২২ টাকা। এবার ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি বাড়ানো হলো যথাক্রমে ৩৪, ৪৪ ও ৪৬ টাকা। এখন এই পণ্য তিনটি কিনতে হবে প্রতি লিটার যথাক্রমে ১১৪, ১৩০ ও ১৩৫ টাকা দরে। আগে জানতাম যে আওয়ামী লীগ আমজনতা ও কৃষকবান্ধব একটি রাজনৈতিক সংগঠন; দলটির নাম সে ইঙ্গিতই দেয়। এতদিন দলের আদর্শ ও কর্মকাণ্ড তাদের স্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত হতে দেখেছি; দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় এসে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে তারা যেভাবে সারে ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরবর্তী সময়ে সারের সরবরাহ নির্বিঘœ করে, তা ছিল তুলনাবিহীন। এর ফলে দেশে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু এখন কী দেখছি? সার যদি এত আক্রা হয়ে পড়ে, তবে মূল্যস্ফীতিতে নাকাল চাষি তার জোগান দেবে কীভাবে? সারের অভাবে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার ফলাফল হবে খুবই মারত্মক। কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ইউরিয়ার অপব্যবহার রোধ করতে দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে এত দিন কেন এই বোধোদয় হয়নি এবং ইউরিয়া আমদানি বন্ধ করা হয়নি? এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এলো জ্বালানির মূল্যে উল্লম্ফন।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঘোষণার আগে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইনিয়ে বিনিয়ে যে কথাটি বলার চেষ্টা করেছেন, তার মর্মার্থ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির যে দাম চলছে, তার সঙ্গে স্থানীয় মূল্যের সমন্বয় না করা হলে সরবরাহ টেকসই করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যে এইবারই এত বেড়েছে, তা নয়; ২০০৭-০৮ সালে জ্বালানির মূল্য আরও বেশি বেড়েছিল। ‘ইনডেক্সমান্ডি’(Indexmundi)-এর তথ্যভাণ্ডার থেকে দেখা যায় যে, ২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত ক্রুড অয়েলের ব্যারেলপ্রতি মাসিক গড় মূল্য ছিল ১০৮ মার্কিন ডলার, আর চলতি বছরে জুন পর্যন্ত তা ১০৩ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০০৮ সালের জুন ও জুলাই মাসে জ্বালানির গড় মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৩০ মার্কিন ডলারের ওপরে। তখন এদেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৪৬ টাকা; ভারতে ৩৫ রুপি। তখনো আন্তর্জাতিক বাজারে ফুড, ফুয়েল ও ফার্টিলাইজারের সরবরাহ ও মূল্য উদ্বায়ী হয়ে পড়ে। এবারের পরিস্থিতি তখনকার চেয়েও গুরুতর; কারণ, কভিড আক্রমণ চালিয়ে মানুষকে আগেই কাবু করে ফেলেছে, তারপর ঐ ৩টি অতি প্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য ভয়ংকর রূপ ধারণ করে তাদের তাড়িয়ে বেড়াতে শুরু করে।
জ্বালানির মূল্যে রয়েছে ‘ডমিনো’ (Domino) প্রভাব; এটার বৃদ্ধি অন্য সব পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেয়। পণ্যের উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রতিটি স্তরে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। একটি পণ্যের উৎপাদন থেকে বিপণন প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের প্রধান কৃষিপণ্য ধান উৎপাদনে সেচের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। পরিবহন খাতে ডিজেলের বহুল ব্যবহার কারও অজানা নয়। জ্বালানির বর্ধিত মূল্যের প্রভাবে সেচ, ধান কাটা, ছাঁটাই ও পলিশিং,পরিবহন প্রভৃতি কাজে বর্ধিত খরচ চালের মূল্য আরও বৃদ্ধি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ আরও অনেক খাতে এখন এই জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই এই প্রাথমিক জ্বালানির দাম বাড়ার অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। সারের দাম তো আগেই বাড়ানো হয়ে গেছে। মূল্যবৃদ্ধির এই ক্রমপুঞ্জিত প্রভাব চালের মতো প্রধান ভোগ্যপণ্যকে মহার্ঘ্য করে ফেলতে পারে। এতে শুধু যে পণ্যটির মূল্য বাড়বে, তাই না, অনেক প্রান্তিক চাষি পুঁজির অভাবে বাড়তি খরচের জোগান দিতে পারবে না। ফলে চালের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
স্বল্প মুদ্রাস্ফীতি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টনিকের মতো কাজ করে; ব্যবসায়ীদের লাভ হয়, তারা মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করেন, সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত হয়, পর্যাপ্ত কর্ম সৃজন হয়, উৎপাদন ও আয় বাড়ে এবং সর্বোপরি প্রায় সমমাত্রিক বণ্টন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার মাধ্যমে এ সময়ে আয় বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার কৌশল গ্রহণ করা যায়। অর্থমন্ত্রী সে বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ৫.৬ শতাংশ। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। কিন্তু বছরের প্রথম মাসেই বেয়ারা মূল্যস্ফীতি লাগামহীন দৌড়ে উঠে যায় ৭.৫৬ শতাংশে। এটা সরকারি হিসাব; বেসরকারি থিংক ট্যাঙ্কগুলোর হিসাব আরও বেশি। এখন ইউরিয়া ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির উল্লম্ফনে দেশের মুদ্রাস্ফীতি কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই দেখার বিষয়। লোকজন আশঙ্কা করছেন যে, ক্রমপুঞ্জিত প্রণোদনা পাওয়ার পর মুদ্রাস্ফীতির এই দানবকে এখন আর কোনো ক্রমেই এক অঙ্কের ঘরে আটকে রাখা যাবে না।
স্বল্প মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির জন্য উদ্দীপকের কাজ করলেও ধেড়ে মূল্যস্ফীতি সমাজ ও অর্থনীতির জন্য বিষফোঁড়া। বিগত শতাব্দীর সত্তর দশকের জ্বালানি-তেল-তাড়িত উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে দেখা গেছে যে, সেটা বিনিয়োগ বাড়ায়নি, প্রবৃদ্ধি বাড়ায়নি; বাড়িয়েছে শুধু বেকারত্ব ও আয় বৈষম্য। অর্থনীতিবিদরা তখন এই নতুন অবস্থার নামকরণ করেন স্থবিরস্ফীতি বা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (Stagflation)। এই সময় সমাজকে অস্থিরতা এবং অর্থনীতিকে নিশ্চলতা গ্রাস করে, সীমিত আয়ের মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খেয়ে জীবন রক্ষা করে, সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে যায়, প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে প্রদেয় সুদ হার বেড়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে ভাটা চলে আসে। এখন কি আমরা তবে সেই পথে হাঁটার পথ প্রশস্ত করছি?
আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ শাসনামলে এই জাতীয় জন-অসন্তোষ সৃজনকারী পদক্ষেপ আগে কখনো দেখা যায়নি। তাহলে এখন তারা এরকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কেন? বাজারে যেটা চাউর হয়েছে, তা হলো রিজার্ভ বাড়াতে শক্ত মুদ্রার (এখানে এসডিআর; special drawing rights) অন্বেষণে সরকার নাকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দ্বারস্থ হয়েছে। এখন তাদের চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী সর্বব্যাধি হরণকারী ছকবাঁধা দাওয়াইয়ের প্রয়োগ চলছে। সংস্থাটির বিশ্বাস এতে অর্থনীতির সুরক্ষা হবে ও প্রবৃদ্ধি উজ্জীবিত হবে; তবে তাতে সীমিত আয়ের মানুষের চামড়া পুড়ে গেলে যাক। এখন প্রশ্ন হলো সাধারণ মানুষই যদি না বাঁচে, তবে সে উন্নতি কার জন্য? অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ছাড়া অর্থনীতি কখনো টেকসই হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নতির পথ হবে বড়ই কণ্টকিত। নিজের কর্মজীবনেও দেখেছি সুদের হার কম হলেও এই সব ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশন ঋণগ্রহীতা দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কহীন অনেক উপকারী ও অপকারী শর্ত চাপিয়ে দেয়। ফলে অনেক সময়েই হিতে বিপরীত ফল লাভ হয়। দেশ এখন উন্নতির যে পর্যায়ে এসেছে, তাতে এই সব শর্তের তাৎপর্য বোঝার সক্ষমতা নিশ্চয়ই তার হয়েছে। কাজেই Caveat Actor!
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারদর অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রয়মূল্য সমন্বয়ের অভাবে দেশে প্রতিদিন শত-কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে মর্মে হা-হুতাশ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা এই জ্বালানির ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয়, পরিশোধন খরচ, বিপণন ব্যয়, অপচয় প্রভৃতি সম্পর্কে কিছুই জানি না। জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের একচেটিয়া কারবারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কতটা দক্ষতা ও নিষ্ঠা নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছে, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। অনেকেরই অভিমত এই যে, দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে সংস্থাটির তথাকথিত লোকসান অনেকাংশে কমে আসবে। এর জন্য জ্বালানি আমদানি, পরিবহন, বিপণন প্রভৃতি কাজ বেসরকারি খাতে পর্যায় ক্রমে ন্যস্ত করতে হবে। সেটা সম্ভব হলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে এবং দক্ষতা বাড়বে। বিগত শতাব্দীর নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত খাদ্য খাতে আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের একচেটিয়া কর্র্তৃত্ব বজায় ছিল। এরপর এই খাতে বেসরকারি পর্যায়ে উন্মুক্ত করায় সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আনতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বর্তমান ক্রান্তিকাল মোকাবিলায় ঘোষিত কৃচ্ছ্রসাধন নীতি আক্ষরিক অর্থে সর্ব ক্ষেত্রে পরিপালন করা হলে সংকট থেকে উত্তরণ অসম্ভব কিছু নয়। তবে তার জন্য জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দেশপ্রেম, দক্ষতা এবং আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। তাছাড়া অর্থনীতিতে এখনো অপেক্ষাকৃত কম উপযোগিতার অনেক ভর্তুকি চলমান রয়েছে যার অংশবিশেষ প্রত্যাহার করলে পরিস্থিতি মোলায়েম হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও নিম্নমুখী। এটাও একটা শুভ সংকেত। তাছাড়া সংকট উত্তরণে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে রেয়াতি সুদে ঋণ নেওয়াও খারাপ কিছু নয়; তবে তার জন্য আত্মঘাতী কোনো শর্ত কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের বিশ্বাস সরকারের বর্তমান নেতৃত্ব দেশ ও মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট