ওঠানামার চক্কর

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ১০:৩৩ পিএম

(পঞ্চম কিস্তির পর)

৬. সাড়ে ন’য়ের সকালে এজলাসে ওঠার এ-টাইমিংটা চালু হয় ১৯৯৭-এর জুনে, সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন হওয়ার দিন থেকে। দশটা-পাঁচটা অফিস টাইম, দেড় দিন ছুটি সপ্তাহে দিব্যি চলে আসছিল বাঙালির সে কোন আদিকাল থেকে। ১৯৯৭-এর জুনে এসে সেটা বদলে করা হলো ন’টা-পাঁচটা। দিনে কর্মঘণ্টা বাড়ল এক ঘণ্টা। পুষিয়ে দিতে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো হলো পুরো দুদিনে। তলে তলে যে একটা ঘণ্টা বেড়ে গেল সপ্তাহের কর্মঘণ্টা! সরকার ছিল তবে এই তালে! বাঙালিকে বোকা বানাতে পেরেছে কে কবে! ‘লেট লতিফ’-রা ছিল সেই দশটা-পাঁচটার শুরু থেকে। কালে কালে বেড়েছে তারা দলে দলে। ‘লেট লতিফ’ বাছতে যখন অফিস উজাড় তখন বললেই কি অফিস জমে উঠবে ন’য়ের সকালে! ওঠেনি যে তা কি আর দেখিয়ে দিতে হবে চোখে আঙুল দিয়ে (কারবারের ফিকিরে থাকা দোকানিও দোকান খোলে না বেলা এগারোটার আগে)! দুদিন ছুটির পুরোটা কাটায় মহা আরামে। সেই আরাম হারাম করে রবিবারে অফিস আসতে বেলা বারোটা বাজে। বৃহস্পতিবার দুপুরেই হুড়োহুড়ি শুরু আন্তঃজেলা বাসে-ট্রেনে, লঞ্চে-প্লেনে। হয়েছে কর্মের ঘণ্টা! সরকারি নতুন অফিস টাইমের খাপে খাপ মিলিয়ে কোর্টের টাইমও বাঁধা হলো ন’টা-পাঁচটায়, হাইকোর্টের সার্কুলারে। এজলাসে ওঠার ধরাবাঁধা টাইমটা সাড়ে দশটা থেকে নামিয়ে বাঁধা হলো সাড়ে ন’য়ে। সাড়ে দশের কালেই উকিল-মক্কেল-মোহরার হাজির পাওয়া ভার হতো এজলাসে, ওঠার ধরাবাঁধা টাইমটা যা হোক করে ঝুলে ছিল শুধু জেলা জজের কোর্টে। সাড়ে ন’য়ে এসে সেটাও পড়ল খসে। সিনিয়র-জুনিয়র নিমরাজিও নন কেউ সাড়ে ন’য়ের সকালে জেলা জজেরও এজলাসে হাজির থাকতে! কাজ হলো না টানাটানি করে। কোর্টের ওঠাউঠি যথারীতি রইল আগের সেই আবদারি টাইমেই। ধরাবাঁধা নতুন টাইমটা এবার জেলা জজেরও ঠেকল গিয়ে শুধু কেতাবে। কোর্টের ডায়েরিতে তার ওঠার টাইম সাড়ে নয় লিখতে হয় রোজ রোজ মিথ্যে করে। মিথ্যেটাকে একটুখানি সত্য করে দেখাতে জেলা জজরা প্রথম প্রথম চেষ্টা করেন সাড়ে ন’য়ের সকালে কোট-গাউনে সেজে জনশূন্য এজলাসেই মিছেমিছি উঠে বসে থাকতে। উকিল সাহেবরা বিপদ ভেবে বাদ সাধেন তাতেও। না পেরে শেষে তারা (দু-চারজন বাদ থাকলেও থাকতে পারেন) শুরু করেন সাড়ে ন’য়ের সকালে টুক করে (খোদাকে দেখাতে!) এজলাসে উঠেই অমনি ঝট করে (উকিল সাহেবরা দেখে ফেলার আগেই!) নেমে আসা! উকিল সাহেবরা হাজির হলে আবদারি টাইমে আবার ওঠেন বীরদর্পে! 

মিলেঝুলে এই করেই নিম্ন-আদালতের ওঠানামা চলতে থাকে শান্তিতে। ধীরে ধীরে দুবার ওঠা ছুটে গিয়ে থাকে শুধু আবদারি টাইমের একবারেই। নিম্ন-আদালত এমনই মহাশয়, উকিলে যা সওয়াবে তা না সয়ে তার উপায় নাই! সুপ্রিম কোর্টের তো আর তা নয় যে সইবে! প্রায় প্রায়ই রেজিস্ট্রারের (১৫ জুন ২০১৫ থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেল) দপ্তর থেকে সার্কুলার হাঁকায়, নিম্ন-আদালতের জজদের ওঠানামা করতে হবে ধরাবাঁধা টাইমেই। রেজিস্ট্রার হয়ে বসার আগে তো জেলা জজই ছিলেন! ধরাবাঁধা টাইমটা শুধু ডায়েরিতে তুলে কোন ঠেলাতে নিজেই যে ওঠানামা করে গেছেন আবদারি টাইমেই, সে-কথাটা বেমালুম চেপে গেলেন! ঠেলা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন দীর্ঘদিন জেলা জজগিরি করা এক জেলা জজ শুধু সার্কুলারি হুকুমমতো ওঠানামা করার কথা মুখে নিয়েই! ২০০৬ সালের দিকে বদলি হয়ে আসেন চট্টগ্রামে। এতদিন অন্যখানে মিলেঝুলে ওঠানামা দিব্যি চালিয়ে গেছেন আবদারি টাইমেই। বিভাগীয় সদরের এই বড় জেলায় পড়ে ধরল তাকে সার্কুলারি ভূতে! খেয়াল চাপল সার্কুলারি টাইমিং ধরে প্রথম দিন থেকেই ওঠানামা করতে। প্রথম কর্মদিবসের প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতে তাই উকিল সাহেবদের মুখের ওপর সার্কুলার তুলে ধরে ধরাবাঁধা সাড়ে ন’য়ের সকালে ওঠার ইচ্ছেটা শুধু ব্যক্ত করেন। সাপ্তাহিক ছুটির সুখে দুদিন কাটিয়ে রবিবার সকালে কোর্টে এসে দেখেন তার কোর্টই বয়কট হয়ে বসে আছে।  উল্টো ফল হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সার্কুলার দেখিয়ে! ধরাবাঁধার সাড়ে ন’য়ে উঠতে চাওয়া জেলা জজের কোর্টেই যাবে না কোনো উকিলে। বদলি করে উঠিয়ে নিতে হবে সার্কুলার দেখানো এই জেলা জজকেই। আবদার জুড়ে থাকলেন তারা লাগাতার বয়কটে। বয়কটের রেজ্যুলেশন গেল সুপ্রিম কোর্টে, আইন মন্ত্রণালয়ে। বিচারকাজে কোর্টকে সহযোগিতা করাই কাজ তাই তাদেরও কোর্ট-অফিসার বলে। বয়কটে বসে থাকা কোর্টের কাজে সরাসরি বাধা। পড়ার কথা তো আদালত অবমাননায়! তা যেমনটি হওয়ার কথা তেমনটি তো হয় না এদেশে! উল্টোটাই ঘটে! মাস দেড়েকেই উঠে গেল বয়কট অতি সহজে! কারণ, সুপ্রিম কোর্টের সার্কুলারে বাঁধা টাইমে উঠতে চাওয়া সেই জেলা জজকে বদলি করে উঠিয়ে নেওয়া হলো সুপ্রিম কোর্টেরই সম্মতিতে! আবদারটাই রক্ষা হলো! বলিটা হলো কে! আইন-ব্যবসা বাঁচাতে হবে! নিজের মর্জিতে নয়, সুপ্রিম কোর্টের সার্কুলারে বাঁধা টাইমে উঠতে চেয়ে উঠতেই পারলেন না আর সেখানকার কোর্টে। আর কারও কি সাধ হবে সার্কুলারি টাইমিং ধরে ওঠার কথা ভাবতে! সার্কুলার কিন্তু বারেবারে আসে ধরাবাঁধা টাইমে ওঠানামার তাগিদ দিয়ে। নির্দেশ তো দূরের কথা অনুরোধ করে কপিও দেওয়া হয় না উকিল বারে। নিজের মর্জিতে তো নয়ই, হাইকোর্টের সার্কুলারে বাঁধা ঘড়ি-ঘণ্টাতেও নয়, নিম্ন-আদালতের ওঠানামা চলে ভাগিদারদের আবদারি ঘণ্টাতেই!

১৯৯১ সালের শেষদিকে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষে সুপ্রিম কোর্টে ফিরেই বিচারপতিদের এজলাসেই রায়-আদেশ ডিকটেশন দেওয়ার নিয়ম জারি করেন (বঙ্গভবনে কি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন!)। আধা ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা দেড়টায় নেমে বেলা দুটোয় আবার ওঠা, বেলা সাড়ে চারটায় একেবারে নেমে আসা টাইম বাঁধা সুপ্রিম কোর্টের সার্কুলারে। দুপুরের পরে শুনানিতে বাঁধা থাকতে তো উকিল রাজি নয় নিম্ন-আদালতে! শোনা কথা, হাইকোর্টের ইন্সপেকশন চলছিল বলে এক সাবজজ নাকি দুপুরের পরে উকিলবিহীন এজলাসে উঠে বসে ছিলেন! দেখে ফেলেন বিচারপতি। জিজ্ঞেস করেন:

এভাবে বসে বসে কী করেন?

রায় ডিকটেশন দিচ্ছি স্যার।

এজলাসে কেন?

হাইকোর্টে তো তাই দেয় স্যার।

আপনি কি হাইকোর্ট?

নিরুত্তর না হয়ে এবারে উপায় আছে বেচারা সাবজজের! এজলাসে কেবল বিচারকার্যই (জুডিশিয়াল ওয়ার্ক) চলবে নিম্ন-আদালতের। রায়-আদেশ লেখাটা কিন্তু তার বিচারকার্য নয় ‘সিআরও’-র বিধানমতে (বিধি ২)!

রায়-আদেশ লিখনকর্ম নিম্ন-আদালতের প্রশাসনিক কাজও তো নয়, এটা তবে কী বটে? এটা হলো তার একখানা ‘অন্যান্য কাজ’! সারতে হবে ওঠানামার আগে পরের আধা ঘণ্টা করে থাকা ওই সময়টুকুর ভেতরে! কী করে সম্ভব তাতে! সম্ভব নয় তো নথি বাসায় নিয়ে ঘাঁটো সবে! এক জেলা জজ তো দুদিন ছুটি নিয়ে খাসকামরায় বসে রায় ডিকটেশন দিতেন! দিন পাওয়া মক্কেল কোর্টে এসে ঘুরে যায় যাক! খালি ওঠানামা করলেই হবে! রায়ও তো নামাতে হবে! খোদাতায়ালা তাকে হাইকোর্টের বিচারপতিতে উঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রায় নামাতে ওঠানামা থেকে ছুটি নিতেন কি না জানি না। সুপ্রিম কোর্টে ‘রায় নামেনি’ কথাটা চলছে কিন্তু বহুদিন থেকেই। রায়ের সারাংশ শুধু উঠে থাকে খবরের কাগজে! মাস পেরিয়ে বছর গড়ায় একে একে, রায় নামে না সেকশনে! নকল না পেয়ে ফল মেলে না জিতেও। আপিলে তামাদিদোষ কাটাবে কী দিয়ে সেই সংশয়ে দিন কাটে পরাজিতের। নামার তারিখ রায়ে থাকে না আলাদাভাবে।  রায়ের আবার নামারও ব্যাপার আছে! জানা ছিল না জুডিশিয়াল সেপারেশনকারী যুগান্তকারী সেই মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আগে। ১৯৯৯-এর ডিসেম্বর থেকে রায় নামে না, রায় নামে না করে নামল শেষে তখনকার প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার মাসে ছয়েক পরে। রায়টা তিনিই লেখেন। কালে কালে রায় না নামাটাই প্র্যাকটিসে নেমেছে, রায়ের দিনেই রায় নেমেছে শুনলে বরং হেঁচকি উঠবে! প্র্যাকটিসটা নিম্ন-আদালতেও নেমেছে (শুধু কি পানিই নিচে নামবে!)। ২০১৩-১৪ সালের দিকে এক স্কুল-সহপাঠী মামলায় জিতেও রায়ের নকল না পেয়ে মোবাইল-কলে ধরে আমাকে। সাবজজ ভদ্রমহিলা নাকি রায় ঘোষণা করে বসে আছেন, লিখছেন না বছর খানেক ধরে! কাজ হলো না মাস কয়েক ঠেলেঠুলে। শেষে অতিরিক্ত জেলা জজ পদে উঠে যাওয়ার আগ-কালে রায়টা লিখে যান নিজেই দয়া করে। আমার এক দুঃসাহসী ব্যাচমেট ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে রায় ঘোষণাও চালিয়ে গেছেন দেদার। কিন্তু, তার বদলি হয়ে যায় রায় নামানোর (লেখার) আগে। ধরা পড়ে রায় লিখতে তো হয়ই, পড়ে থাকতে হয় সাবজজ পদেই। উঠতে পারেননি তার ওপরে। ২০১৭-১৮ সালের দিকে দুদকে দেখি, ঢাকার এক স্পেশাল জজ সাজার রায় লিখেছেন পাক্কা একটা বছর পরে! পড়ে দেখি, আসামি পলাতক ছিল! কী দারুণ বুদ্ধি! কপালও বটে! রায় লেখার আগে তিনিও ধরা পড়েননি, তার আসামিও ধরা পড়েনি! ওঠানামার চক্করের মধ্যে ফাঁক পেলে রায় লেখে কারণ, ইহা ‘অন্যান্য কাজ’ যে! (সমাপ্ত)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত