গণতন্ত্রের বিকাশে গণমাধ্যম

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫৭ পিএম

একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কী নেই এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা আছে কী নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা যায়। গণতন্ত্রকে বলা হয় মানবসভ্যতার উৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা, যা হাজার হাজার বছর ধরে পরীক্ষিত হয়ে আজকের অবস্থানে উত্তীর্ণ হয়েছে। শত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্রই পৃথিবীর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা।

গণতন্ত্র শব্দটি বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘জনগণের ব্যবস্থা’। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের একটি জনপ্রিয় সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘জনগণের মধ্যমে জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’। আর গণমাধ্যমের কাজ হলো জনগণের বার্তা বা মেসেজ নিরপেক্ষ ও নির্ভুলভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরা। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে উল্লিখিত রাষ্ট্রপরিচালনার যে চারটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছে তাদের একটি হলো গণতন্ত্র। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই প্রধান বা ক্ষমতার উৎস। জনসাধারণের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করে দেশটি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এক কথায় গণতন্ত্র হলো জনসাধারণের শাসনব্যবস্থা। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করাই গণতন্ত্র। ফলে গণতন্ত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও স্বাধীনতা থাকে। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও অপরিহার্য।

প্লেটো বলেন, ‘সম্মিলিত মেধা-মননে একজন দার্শনিক রাজার চেয়ে অনেক শ্রেয়’। সেজন্যই হয়তো একজন বেনেভোলেনট ডিকটেটর বা মহৎ একনায়ক জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কোনো সরকার দাবি করে যে, গণতন্ত্রের স্বাদ তারা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। তারা সফল ও সার্থক। তাহলে সেই সরকারের সাফল্যের গল্প বলার উপায়টির নামই গণমাধ্যম। অন্যদিকে তার ব্যর্থতার ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যমও এই গণমাধ্যম! কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, তবে সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতেই হবে। যে গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করবে, সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আবার সেই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণের কথাই উঠে আসে গণমাধ্যমে। তাই এই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। গণমাধ্যম মানুষের জন্য তথ্যের বৃহত্তর প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। সরকারের সমালোচনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, এতে গণমাধ্যমের ভূমিকাই সর্বাধিক।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গেল ৫০ বছরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাদেশের শুধু ক্রমাবনতি ঘটেছে। ২০২২ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) যে সূচক প্রকাশ করেছে, সেখানে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম (স্কোর ৫০ দশমিক ২৯)। এর মানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১০ ধাপ পিছিয়েছে। কিন্তু কেন? অনেকেরই ধারণা, গুটিকয়েক আইনি বিধিনিষেধ এজন্য দায়ী। অথচ স্বাধীন দেশের সংবিধানে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। আর তা আমাদের সংবিধানেই বিধান আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারার ৩৯(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে এবং ৩৯(২) সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। আলোচনা, মতপ্রকাশ, ঐক্য হলো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সোপান। যেখানে গণমাধ্যম যত বেশি শক্তিশালী, সেখানে গণতন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী। অন্যের প্রতি এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনী ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স : ১৯৯৬-২০১২’ বইটিতে লিখেছেন, “কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র তিনটি ডি-এর ওপর নির্ভরশীল : ডিবেট (বিতর্ক), ডিসেন্ট (বিরোধিতা) ও ডিসকাশন (আলোচনা)। কিন্তু এরই মধ্যে এই ব্যবস্থায় চতুর্থ ডি-এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে আর তা হলো ডিজরাপশন বা বাধাগ্রস্ত করা। প্রথম তিন ‘ডি’ দেশ শাসনের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। আর চতুর্থ ‘ডি’ এলে সরকারের চেয়ে বিরোধী পক্ষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” তাই স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা এলে গণতন্ত্রই বাধাগ্রস্ত হয়। গণমাধ্যমের সঠিকচর্চা যেমন গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে, তেমনি প্রকৃত গণতন্ত্র পারে গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে। স্বাধীন গণমাধ্যম যেকোনো সরকারের সেরা বন্ধু। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে ধরা হয়।

গণমাধ্যমকে বলা হয় সরকারের পাহারাদার। কোথায় কী ভুল বা অসংগতি হচ্ছে তা সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই গণমাধ্যম। তাই তো গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ বা ‘ফোর্থ স্টেট’। গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের এই সাহসী ভূমিকার কারণে পৃথিবীর অনেক দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ্যে আসে। যেমন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি, পেন্টাগন পেপার্স, বফোর্স কেলেঙ্কারি ইত্যাদি বড় বড় অপরাধের হদিস এই সাংবাদিকরাই দেন। কোটি কোটি টাকা লোপাটকারীদের ধরিয়ে দেন সাংবাদিকরাই। দুর্নীতির ইতি টানতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার যেখানে স্বীকৃত, সেখানে তার অপব্যবহার হতেও পারে। তবু সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেন, ‘জনগণের ইচ্ছাই যেকোনো সরকারের একমাত্র বৈধ ভিত্তি; আর আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।’

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়ানোর জন্য আমেরিকা মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে জার্মানবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা চালায়। যার ফলে সে দেশের জনগণের মধ্যে জার্মান ঠেকাও উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। সৈন্যদের মধ্যে স্বদেশ রক্ষার উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়। মূলত এখানে জার্মানি শাসকদের চেয়ে প্রত্যেক জার্মানিকেই হত্যা করার লাইসেন্স আদায় করা হয়। যেন হত্যার অপরাধ গায়ে না লাগে। তেমনিভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ ভিয়েতনামীদের রক্ষা করার জন্য আমেরিকার হামলা করা দরকার, এ বিষয়ে আমেরিকার জনগণের মনে আবেগ সৃষ্টি করা হয়।

চীনের কর্র্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা ও আমেরিকার গণমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে চীনা সংবাদমাধ্যম ও চীনপন্থি দেশগুলোর গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনের দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়। ২০১৮ সালে রাশিয়া ও তুরস্কের জাতীয় নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। রাশিয়া ও তুরস্কের সংবাদমাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে পশ্চিমা ও আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিল নেই।

তবে পরিশেষে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ। এই স্তম্ভকে যত মজবুত করা যাবে দেশ পরিচালনা ততই স্বচ্ছ হবে। গণতন্ত্র আর সে ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। এর ফলে গণমাধ্যমের সমন্বয়হীনতা রোধ করা জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

শিমন পেরেজের একটি মজার উক্তি দিয়ে এই লেখাটা শেষ করা যাক : ‘অনেকভাবে, মিডিয়া স্বৈরতন্ত্রকে অসম্ভব করে তোলে, আবার একই সঙ্গে গণতন্ত্রকেও অসহনীয় করে তোলে।’

তথ্যসূত্র : গণতন্ত্র, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর; গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ ও বাংলাদেশ, বদরুল আলম খান; দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স : ১৯৯৬-২০১২, প্রণব মুখার্জি; ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট : পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য মাস মিডিয়া, নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যান।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত