চব্বিশে চ্যানেল আই

গঠনমূলক পরিবর্তনে সরব সঙ্গী

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০৬ এএম

আমি তখন জাপানে বাণিজ্যদূতের দায়িত্বে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার চ্যানেল আইসহ তিনটি স্যাটেলাইট চ্যানেলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। সে বছরই ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ, নাতি-পুতি সবাইকে নিয়ে মমতাময়ী মা সৃজনশীল লেখিকা রাবেয়া খাতুন (১৯৩৫-২০২১) জাপান বেড়াতে আসেন। ওই সময় চ্যানেল আই ছিল শুধু ইমপ্রেস পরিবারের ধারণামাত্র। তো, তখন টিভি স্টেশনের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, অনুষ্ঠানাদি বিনিময়ের সম্ভাবনা, শর্তসাবুদ ইত্যাদিসহ খুঁটি-নাটি অনেক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়। সেই থেকে তো বটেই, চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে বেশিমাত্রায় নিয়মিত হয়ে পড়ি এনবিআরের চেয়ারম্যান থাকার সময় থেকে দেশের উন্নয়ন, ব্যবসা বিনিয়োগ ও রাজস্ব অর্থনীতির বিষয়ে চ্যানেল আই পর্যালোচনা পর্ব শুরু করলে। 

১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর চ্যানেল আইয়ের জন্মদিন। এবারে ২৪-এ তার পা পড়বে। বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাইভেট স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল চ্যানেল আইকে অভিনন্দন। চ্যানেলটির নামে দুটি অর্থ হয়। আই মানে আমি, আবার আই মানে চোখ। আমার ও আমাদের হৃদয়ে বরাবরই বাংলাদেশ। চোখ দিয়ে দেখি যে বাংলাদেশকে। চিন্তা-চেতনায়, মননে ভাব-ভাবনা প্রকাশে চ্যানেল আই এই দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে তার ক্যামেরার চোখে, প্রক্ষেপণে, বাক-প্রতিমায় তা প্রতিবিম্বিত প্রতিফলিত ও প্রকাশ করে চলেছে। তিনটি শব্দে চ্যানেল আইয়ের আদর্শ চিত্রায়িত করেছে : সাহসী, সন্ধানী ও সমকালীন। শতভাগ পেশাদারিত্ব, নতুনত্ব, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের জয়গান গেয়েই চ্যানেল আইয়ের অভিযাত্রা। চ্যানেল আই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিকাশ, খাদ্য নিরাপত্তায় শতভাগ স্বনির্ভরতা অর্জন তথা বাংলাদেশের গঠনমূলক পরিবর্তনের সরব সঙ্গী। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও আকাশ সংস্কৃতির নতুন নতুন অগ্রযাত্রার ভেতর চ্যানেল আইয়ের পথচলা নতুন সব উদ্ভাবনের ভেতর দিয়ে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক সব শাখাকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সব শ্রেণির বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে আরও বেশি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারার গৌরব করতে পারে চ্যানেল আই।

বাংলা ভাষার প্রথম ডিজিটাল টিভিমাধ্যম বাংলাদেশের চ্যানেল আই। তারুণ্যকে ছাপিয়ে মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে পৃথিবীব্যাপী দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চ্যানেলটি। চব্বিশ বছরে সে হয়ে উঠেছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের আয়না। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ধারণা চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে থাকলেই দেশমাতৃকাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়, সময়কে ধারণ করে নির্বিঘেœ পথ চলা যায়, রক্ষা করা যায় আধুনিক দুনিয়ার সঙ্গেও সহজে যোগসূত্র। চ্যানেল আই-ই বাংলাদেশের একমাত্র টিভি চ্যানেল যেখানে চব্বিশ বছর ধরে শুধু বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়েছে। চ্যানেলটির প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেশ ও মাতৃভাষাকে গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। এনবিআরে এক দিন নিয়মিত প্রেসব্রিফিংয়ে বললাম, ‘আমরা কর-ফাঁকিবাজদের চেইজ করব’। সন্ধ্যায় চ্যানেল আইয়ের স্ক্রলে দেখলাম ‘কর-ফাঁকিবাজদের ধাওয়া করা হবে’। চেইজ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ধাওয়া করা হয়তো ঠিক আছে কিন্তু কর-ফাঁকিবাজদের ধাওয়া করাটা প্রণালি পদ্ধতি অনুযায়ী মানানসই হয় না। ফোন করলাম বার্তা সম্পাদক শাইখ সিরাজ সাহেবকে। তিনি তাৎক্ষণিক শব্দটিকে শোভনীয় আকারে পরিবর্তন করে দিলেন। চ্যানেল আইতে দিন শুরু হয় ‘গানে গানে সকাল’ দিয়ে মঞ্চের পেছনে গ্রামবাংলার অপরূপ দৃশ্য। নবীন-প্রবীণ শিল্পীর কণ্ঠে মায়ায় জড়ানো সুমধুর বাংলা গান। অপূর্ব আয়োজন। এই নান্দনিক আয়োজন দেখে দেশের অধিকাংশ অগ্রসরমাণ পরিবারে সকাল শুরু হয়। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা নানামুখী দর্শক-নন্দিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে চ্যানেল আই।

চ্যানেল আইয়ের সংবাদ দর্শকের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। বিভিন্ন রিয়েলিটি শো, বিনোদনমূলক নানা অনুষ্ঠান, সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম প্রচারের ক্ষেত্রেও চ্যানেল আই স্বতন্ত্র। চ্যানেল আই যেকোনো অনুষ্ঠান প্রচারের আগে দেশের কথা ভাবে। কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ, কৃষি শুধু একটি কাজই নয় বরং এটা জীবন ধারণের একটি পথ। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার কৃতিত্বের দাবি চ্যানেল আই করতেই পারে। তারা কৃষকদের মুখপত্র হয়ে উঠেছে। মিডিয়ায় দেশের কৃষি ও কৃষক জাগরণের মূল রূপকার শাইখ সিরাজ। তিনি একসময় বিটিভিতে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে যে জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে চ্যানেল আইতে শুরু করেন ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ নামে নতুন অনুষ্ঠান। চ্যানেল আইয়ের হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের প্রভাবে দেশের কৃষি ও কৃষকপর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। কৃষি বাজেট প্রণয়নে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকও এখন তার ন্যায্য দাবির কথা সহজেই বলতে পারছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা দপ্তরে! ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া, কৃষকের জীবন মানের উন্নয়নসহ কৃষি ক্ষেত্রে নানামুখী পরিবর্তন শুরু হয়েছে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের প্রভাবে। প্রতি ঈদে কৃষকের ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার হয় চ্যানেল আইয়ে।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চ্যানেল আইয়ে ‘প্রকৃতি ও জীবন’ অনুষ্ঠানটি সব বয়সী মানুষের অনেক পছন্দ। অনুষ্ঠানের আওতায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতি বছর প্রকৃতি মেলার আয়োজন ও গুণিজনের হাতে প্রকৃতি পদক তুলে দেওয়া হয়। দেশের স্কুল ও কলেজপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাতে অনুষ্ঠানের সিডি পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচিও অব্যাহত রেখেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। দেশের মানুষ প্রকৃতি রক্ষায় সচেতন হচ্ছে। ‘স্বর্ণকিশোরী’ দেশের কিশোরীদের মধ্যে শুধু প্রজনন স্বাস্থ্য নয়, তাদের অধিকার রক্ষায় সচেতনতার মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছে। ‘আজকের সংবাদপত্র’, ‘সংবাদপত্রে বাংলাদেশ’, তৃতীয় মাত্রা’ জনপ্রিয় টকশো। জিল্লুর রহমান ‘তৃতীয় মাত্রা’র জন্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রচার ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার অতিথি হয়ে আসেন সব দল মতের মানুষ। বিশিষ্টজনের খোলামেলা আলোচনা-সমালোচনায় মূর্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। বিষয়-বৈচিত্র্যে দেশ, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির সমকালীন ভাবনারা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে তৃতীয় মাত্রার ক্যানভাসে। প্রতি ঈদে, জাতীয় দিবসে বিশেষ আলোচনা আয়োজন করেন তিনি, যেমন রাজনীতিবিদদের নিয়ে ‘ভালোবাসার বাংলাদেশ’ নামে একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন। এটিও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করে।

চ্যানেল আই-ই নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন বিশেষ করে নাটক, সিনেমা ও সংগীতের অঙ্গনে এখন যারা মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন তাদের অধিকাংশই চ্যানেল আইয়ের বিভিন্ন রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা তারকা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে রবীন্দ্র মেলা, জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিনে নজরুল মেলা, বাঙালির নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণসহ নানা ধরনের আয়োজন করে চ্যানেল আই প্রতিনিয়ত দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রাখছে। চ্যানেল আই নিয়মিত দেশের গুণিজনদের জন্মদিন পালন করে থাকে। চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার, চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ, ক্ষুদে গানরাজ, লাক্স চ্যানেল আই সুপার স্টার, আবৃত্তি ছন্দে আনন্দে, চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ে অনুষ্ঠানগুলো স্বনামেই খ্যাত হয়ে উঠেছে। প্রতি বছরই চ্যানেল আইয়ের কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বের করে আনা হচ্ছে গুণী মুখ। চ্যানেল আই এ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহুসংখ্যক গুণী শিল্পীকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতাও অব্যাহত রেখেছে। চ্যানেল আই দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা দুস্থ শিল্পীকেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশে ইমপ্রেস ও চ্যানেল আইয়ের অবদান অনেক। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক সিনেমা নির্মাণ করেছে। চলচ্চিত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কার অর্জনের ক্ষেত্রে ইমপ্রেসই আছে এগিয়ে।

টেলিভিশন মানে শুধু বিনোদন নয়। টেলিভিশন মানে জনকল্যাণ, টেলিভিশন মানে মানবসেবা, টেলিভিশন মানে জাতির উন্নয়ন ও ক্রমবিকাশের অনন্য বাহন। একটি টেলিভিশন চ্যানেল হতে পারে সমাজের অনেক ভালো ও শুভ ঘটনার নেপথ্য শক্তি। টেলিভিশন চ্যানেল মানুষকে আরও সক্রিয় করতে পারে দেশের পথে। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে এই বিশ্বাস থেকে চ্যানেল আই কাজ করে যাচ্ছে।

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত