পুঁজিবাজারের দুরবস্থার কারণ ফ্লোর প্রাইস

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:২৯ পিএম

আগে মনে করা হতো যে পৃথিবীতে সম্পদ-অর্জন প্রচেষ্টা হলো একটা জিরো-সাম-গেম; অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ নির্ধারিত, একজনের কিছু সম্পদ অর্জনের অর্থ হলো আরেক জনের সমপরিমাণ সম্পদের বিয়োজন। সেজন্য তখন সম্পদ জবরদখল ও লুটপাটের ওপর বেশি গুরুত্ব ছিল। কিন্তু ব্যাংকব্যবস্থা প্রবর্তনের পর দেখা গেল যে, বিনিয়োগের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়; কেকের সাইজ বড় হয়ে যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট সবাই সেটার বড় অংশের ভাগীদার হতে পারেন। আরও পরে দেখা গেল যে, ব্যাংকঋণের চেয়েও আরেকটি ভালো বিনিয়োগ মাধ্যম রয়েছে, যার সুবিধা অনেক বেশি। পুঁজিবাজার হলো সেই মোক্ষম হাতিয়ার। বিনিয়োগ, কর্ম-সৃজন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। সে কারণে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারকে একটা দেশের অর্থনীতির ব্যারোমিটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পুঁজিবাজারের সুবিধা হলো এই যে, এখান থেকে কোনো কোম্পানি সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহ করতে পারে। ফলে কোম্পানির আর্থিক দায় ও চাপ কম থাকে। তাছাড়া, ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি আমানত গ্রহণ করায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রকল্পে তার পক্ষে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ানো সম্ভব হয় না। মন্দ ঋণের পাহাড় গড়ে ওঠায় আমাদের দেশে ব্যাংকের সক্ষমতা আরও কম। কিন্তু পুঁজিবাজারের এই সীমাবদ্ধতা নেই; অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ বিনিয়োগকারী আমানতের সুদের চেয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে অধিক লভ্যাংশ ও মূলধনী মুনাফার প্রত্যাশায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ফলে বিনিয়োগের জন্য সম্পদ সংস্থান সহজ হয়। সাধারণ মানুষের করপোরেট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মধ্যে মালিকানার স্বত্ববোধ জাগ্রত হয় এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্র অবারিত হয়। এ বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তারল্য; যে কোনো সময় যে কোনো পরিমাণ ইকুইটি বিক্রি করে যেমন ক্যাশ করা যায়, তেমনি যে কোনো পরিমাণ ক্যাশ যে কোনো সময় বিনিয়োগ করে মালিকানার অংশীজন হওয়া যায়; বিনিয়োগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও করা যায় বহুমুখী। এই সব সুবিধার পটভূমি নিয়ে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্র্তৃক ১৬০২ সালে আমস্টারডামে প্রথম স্টক একচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও আমাদের পুঁজিবাজার শৈশব অবস্থায়ই রয়ে গেছে।   

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৫৪ সালে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশ এখন স্নাতক হতে চলেছে, কিন্তু পুঁজিবাজার এই সুদীর্ঘ সময়েও তার শৈশবকাল অতিক্রম করতে পারেনি; সেটা কারিগরি দক্ষতার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি জিডিপির অংশ, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও। এখন তো বাজার এমন এক অবস্থানে চলে গেছে, যাকে ‘আইসিইউ’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সংকটাপন্ন রোগীকে সেখানে ঢোকানো হয় বাঁচিয়ে রাখার জন্য; নানা কৃত্রিম সমর্থনে রোগী সেখানে কিছুদিন বেঁচে থাকেন বটে, কিন্তু তার অবস্থা দাঁড়ায় জীবন-মৃতের মতো; চলৎশক্তিহীন। সেখান থেকে বের করা হলে অধিকাংশই চলে যান স্রষ্টার কাছে। কিন্তু তার জন্য যে কঠিন আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্য পরিশোধ করতে হয়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারেন। তখন এই মানবিক কাজেও এ জাতীয় উচ্চমূল্য সেবার সমর্থনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর্থিক ক্ষেত্রে এ জাতীয় কাজের প্রবণতাকে ংঁহশ-পড়ংঃ ভধষষধপু ড়ৎ পড়হপড়ৎফব ভধষষধপু বলা হয়, যার মানে হলো কোনো অলাভজনক প্রকল্পে বেশি বিনিয়োগ হয়ে গেলে সেখান থেকে সরে এসে অন্য লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যৌক্তিক হলেও অধিকাংশ মানুষের প্রবণতা হলো মন্দ-বিনিয়োগকে লাভজনক করার ভ্রান্তি-বিলাসে সেখানে আরও বিনিয়োগ করা। আমরা কি এখন এই ভ্রান্তির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি?     

ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৩৪৮টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর প্রায় ৮২ শতাংশের শেয়ার মূল্য ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসায় সেগুলোর কেনাবেচা নেই বললেই চলে। ফলে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনে এক গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়ে আছেন। এখন দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে ৩ শত কোটি টাকার নিচে। অথচ প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকার কম লেনদেন হলে ডিএসই ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করতে পারে না; অর্থাৎ লোকসান করে। শুধু তাই না, লেনদেন থেকে প্রাপ্য সরকারের রাজস্বও কমে যায়; বিগত ৫ মাসে সরকারের রাজস্ব গড়ে ২৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি টাকা (ঞযব ঋরহধহপরধষ ঊীঢ়ৎবংং, ৯ উবপবসনবৎ, ২০২২)। তবে এর চেয়েও সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা হলো তারল্য প্রবাহ ও আস্থার সংকট।

পুঁজিবাজারের বড় সৌন্দর্য হলো এর তারল্য। অপেক্ষাকৃত অধিক ঝুঁকিযুক্ত ও মুনাফাদায়ী এ বাজারে নিজের বিচার-বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে মানুষ লাভবান হতে চান। এর জন্য প্রয়োজন বুঝেশুনে বিনিয়োগ এবং পুনর্মূল্যায়ন অন্তে সময় সময় পোর্টফোলিও সংশোধন। একমাত্র বাজারের তারল্য ও গতিশীলতাই এ-কাজে সহায়তা করতে পারে; মূল্য কমে গেলে কারও লোকসান যেমন হয়, আবার ক্রয়ের ফলে তাতে আরেক জনের তেমন লাভও হয়। এভাবে বাজার ও পোর্টফোলিও-তে ভারসাম্য আসে, বাজার ফিরে পায় তার স্পন্দন, বিনিয়োগকারী হন আস্থাশীল এবং বিনিয়োগে উৎসাহী। কিন্তু বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে সে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে। এই ফ্লোর প্রাইসের কল্যাণে পুঁজিবাজার এখন হয়ে পড়েছে মন্দা বাজারের এক দীর্ঘমেয়াদি কোল্ড স্টোরেজ, যেখানে ঢোকা যায়, কিন্তু লোকসান দিয়েও বের হওয়ার উপায় নেই। এই অচলায়তনে বিনিয়োগ করতে কে অর্থকড়ি নিয়ে এগিয়ে আসবে?    

বিএসইসি ২৮ জুলাই ২০২২ তারিখ থেকে বাজারের পতন ঠেকাতে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়। তারা বলছেন যে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা করতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেই এ বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে। এটা দারুণ এক আশঙ্কার কথা। দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তাতে আগামী এক বছরের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বাজার যে ঊর্ধ্বমুখী হবে, তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিএসইসির প্রধান কাজ পুঁজিবাজারের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে ভূমিকা রাখা। এজন্য প্রয়োজন বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগের পরিধি বৃদ্ধি ও পরিবেশের উন্নয়ন সাধন। শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে পুরো বাজার স্থবির করে ফেলা তাদের কাজ হতে পারে না;  সেটা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার সমান। তাছাড়া, যে কারসাজি করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটার প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য বিএসইসির হাতে যে সুনির্দিষ্ট কলকব্জা রয়েছে, সেগুলোর সদ্ব্যবহার করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়; এই আত্মঘাতী ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। বাজারকে চলতে দিতে হবে তার নিজস্ব শক্তির ভিত্তিতে; সুশাসন ও স্বচ্ছতা দিয়ে, মার্জিন লোন বা ব্যাংকের তহবিল দিয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়। সেটা না করে কৃত্রিম ব্যবস্থায় তা চালানোর চেষ্টা করলে অবস্থা কী হয়, তার বড়  দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিককালে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার; ১০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে ছাড়ার পরও মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে টাকার বিনিময় হারে ২০ শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন ঘটে। এখন ফ্লোর প্রাইস তুলে নিলে হয়তো আটকে পড়া বিনিয়োগকারীদের ঐ রকম বড় একটা লোকসান হবে, কিন্তু এর বিকল্প কি আছে? আটকে পড়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অবস্থাই বেশি খারাপ। তারা না পারছেন লোকসান এড়াতে, না পারছেন তাদের ইকুইটি ক্যাশ করতে। অথচ বর্তমান উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সময়ে তাদেরই ক্যাশের প্রয়োজনীয়তা বেশি। আবার যারা মার্জিন লোন নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, সুদাসল পরিশোধে তাদের অধিকাংশেরই দেউলিয়া হওয়ার অবস্থা। বাজার-বন্ধ্যত্বের সময় যত বাড়বে, ততই তাদের অবস্থা সঙ্গীন হবে। আবার বাজারে গতি আনতে ১০ শতাংশ কমে ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনার যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাতেও বড়দের সুবিধা দেওয়া হয়েছে; কারণ, সেখানকার নিম্ন ক্রয়সীমা ৫ লাখ টাকা। 

গ্রিক পুরাণে ঊষার দেবী ইয়োস মর্তের ট্রোজান প্রিন্স টিথোনাসের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। কিন্তু মানব সন্তান তো মরণশীল। তাকে স্বর্গে নিয়ে গিয়ে কত দিনই বা তার কাছ থেকে সুখ নিতে সক্ষম হবেন? তাই সুখ চিরস্থায়ী করতে ইয়োস দেবরাজ জিউসের কাছে গিয়ে টিথোনাসের জন্য অমরত্বের বর চাইলেন। সতত ঈর্ষাপরায়ণ জিউস মুচকি হেসে বললেন‘তথাস্তু’। টিথোনাস অমরত্ব পেলেন ঠিকই, কিন্তু অমর যৌবন পেলেন না। কারণ, ইয়োস টিথোনাসের অমর যৌবন চাইতে ভুলে গিয়েছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় টিথোনাসের শরীরে মানবীয় অবক্ষয় শুরু হয়ে গেল; তিনি হয়ে পড়লেন জরাগ্রস্ত। তখন আর তিনি প্রেয়সীকে সুখ দিতে পারেন না, বরং বকবক করে বিরক্তি উৎপাদন করেন। অমর হয়ে যাওয়ায় তার মৃত্যুও হচ্ছে না। অগত্যা প্রেয়সী তাকে ঘাস ফড়িং বানিয়ে রাখেন। অমরত্ব কার না কাম্য, কিন্তু যৌবনহীন অমরত্ব অভিশাপ। বিগত যৌবন টিথোনাস তাই অমরত্বের বোঝামুক্ত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করছেন।

দেশের যৌবনহীন পুঁজিবাজার আজ যেন গ্রিক পুরাণের জরাগ্রস্ত টিথোনাসের মতো স্বগতোক্তি করে চলেছে। আর এ অবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ ফ্লোর প্রাইস প্রবর্তন।  ফ্লোর প্রাইস দিয়ে কৃত্রিমভাবে সূচক ঊর্ধ্বগগনে ধরে রাখলেই তা পুঁজিবাজারের গভীরতা বা শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটাবে না; কমিশনেরও কৃতিত্ব জাহির করবে না। তা বরং উল্টো পুঁজিবাজার, অর্থনীতি ও দেশের ক্ষতি করবে। আমরা আশা করব পুঁজিবাজারের যৌবন ফেরাতে কমিশনে দ্রুত শুভবুদ্ধির উদয় ঘটবে।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত