রবীন্দ্রনাথের চেয়েও এক বছর বেশি আয়ু পেয়েছে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং সেন্টারের বাংলা বিভাগ। ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ বাংলাভাষায় সর্বশেষ সম্প্রচার করে আবার আগামীকাল ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে চিরদিনের মতো ইথারে মিলিয়ে গেল বিবিসি বাংলা।
১৯৭১। বিবিসি লন্ডন, এখন শুনবেন বিশ্ব-সংবাদ : বিবিসির সিরাজুর রহমান কিংবা শ্যামল লোধের কণ্ঠ এখনো কানে বাজার কথা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম বিবিসি [ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন]।
প্রায় তিন দশক আগে একাধিকবার আমি বুশ হাউজে অবস্থিত বিবিসিতে গিয়েছি, বেজমেন্টের কাঁফেতে কফিতে চুমুক দিয়েছি, কখনো বিবিসি বাংলার জন্য একটি দুটি ভাষান্তরও করেছি। বাঙালির ১৯৭১ কেটেছে লড়াই করে এবং বিবিসিতে নিজেদের সাফল্যের সংবাদ শুনে।
১৯৯০-র ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ, দেশ আন্দোলনে উত্তাল। কর্মসূত্রে আমি ময়মনসিংহ থাকছি, মেডিকেল কলেজের কাছে রুমা কনফেকশনারি ঘেঁষা ব্রাহ্মপল্লী রোডে চারতলা একটি বাড়ির তিনতলায় ভাড়া থকি। বাড়িটি তখনকার স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীর একজন আত্মীয়ের। শামসুল হুদা চৌধুরীর চেয়ে আমার বেশি আগ্রহ তার স্ত্রী আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানুর প্রতি। কখনো হয়তো সাক্ষাতের সুযোগ পাব এমন প্রতীক্ষায় আছি। ভাগ্য এতই প্রসন্ন কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলে তাকেই দেখি, ভূমিকা ছাড়াই তিনি বললেন, টিভির কোনো খবর আমার বিশ্বাস হয় না। যদি রেডিও থাকে বিবিসির খবরের সময় আমাকে ডেকো, আমি ওপরতলায় থাকছি, আমার নাম... বাকিটা তাকে বলতে দিইনি।
আমি বললাম, টু-ইন-ওয়ান আছে, টেপ রেকর্ডারই বাজানো হয়, আপনি এটা নিয়ে নিন, যে কদিন থাকেন বিবিসি শুনবেন। স্পিকার সাহেব থাকছেন সার্কিট হাউজে। তার সরকারের পতন ঘটতে যাচ্ছে। ৭ ডিসেম্বর আমার যন্ত্রটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, সত্যটা বিবিসিই বলেছে।
১১ অক্টোবর ১৯৪১ বিবিসি বাংলার যাত্রা শুরু। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের উদ্বোধন হয় ১৯ ডিসেম্বর ১৯৩২। এ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড সার্ভিস বহু ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে, খরচ সামাল দিতে না পারায় আবার বন্ধ করেও দিয়েছে। এমনকি বাংলাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অনেক আগেই। আরভিং টি বুশের ভবন লন্ডনের ‘বুশ হাউজ’-এর নির্মাণকাজ যখন ১৯২৯ সালে শেষ হয়, এটাই ছিল তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ভবন। ১৯৩২-এ এখানেই শুরু হয় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস সম্প্রচার। এক সময় বিবিসি আর বুশ হাউজ একাকার হয়ে যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বোমাবর্ষণে বুশ হাউজ আংশিক বিধ্বস্ত হয়। ১২ জুলাই ২০১২ বুশ হাউজ থেকে শেষবারের মতো বিবিসি সংবাদ সম্প্রচারিত হয়, বিবিসি পোর্টল্যান্ডের ব্রডকাস্টিং হাউজে স্থানান্তরিত হয়।
এদেশের মানুষের সঙ্গে বিবিসি বাংলা বিভাগের একটি আবেগময় সম্পৃক্ততা রয়েছে। ১৯৭১ সালে কেমন ছিল বাংলাদেশ, কোন দিকে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি, সব কিছুর জীবন্ত ইতিহাস উঠে এসেছে বিবিসির সংবাদ ও ভাষ্যে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সকাল-সন্ধ্যায় বিবিসি শোনা মানেই ছিল বিজয়কে আর একটু এগিয়ে নেওয়া। একাত্তরে কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিনই মার্ক টালিকে পাওয়া যাচ্ছে : পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে ভাষ্য মার্ক টালি, ঢাকা থেকে মার্ক টালি, ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ে রিপোর্ট সম্পাদনায় মার্ক টালি। সে সময় মার্ক টালি, উইলিয়াম ক্রলি, ইভান চার্লটন, রোনাল্ড রবসন, জন ওজম্যান, ডেভিড সেলস, নিকোলস ক্যারল, অ্যান্ড্রু ওয়াকার, ব্যাসিল ক্লার্ক প্রমুখের সঙ্গে বিবিসির ইথার তরঙ্গে উচ্চারিত হতো নিজামুদ্দিন আহমেদের নাম। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য প্রেরিত তাদের প্রতিবেদন ও পর্যালোচনা বিবিসি বাংলাতে পরিবেশিত হতো। এমন কিছু প্রতিবেদন ভাষান্তর করে উপস্থাপন করা হচ্ছে: ২৬ মার্চ ১৯৭১ বিবিসি লন্ডন : পূর্ব পাকিস্তান থেকে খবর পাওয়া গেছে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে তার সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করায় সেখানে ব্যাপক লড়াই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ভারত থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান প্রদেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। পূর্বাঞ্চলের রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কনসাল জেনারেল জানিয়েছেন, বিরোধীদের দমন করতে সেখানে কামানও ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারত থেকে পাওয়া আগের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বত্র তীব্র লড়াই চলার খবর পূর্ব পাকিস্তানের একটি গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যেই পূর্ববাংলার সেনা ইউনিটগুলো এবং পুলিশ সশস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা ইউনিটগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরাসরি কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কঠোর ভাষায় শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি তার নিজস্ব কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট সব রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং প্রেসের ওপর পুরোপুরি সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন।
২৭ মার্চ ১৯৭১ (প্রথম সংবাদ) : সেনাবাহিনী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, গোলযোগ দমনের জন্য ট্যাংক ব্যবহার করা হয়েছে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। সরকারি বেতার মাধ্যম রেডিও পাকিস্তান জানিয়েছে, শহরে বলবৎ সান্ধ্য আইন আজ (শনিবার) নয় ঘণ্টার জন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। রবিবারও একইভাবে একই সময়ের জন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। রেডিও থেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, যারা রাস্তাঘাট অবরোধ করবে এবং ব্যারিকেড বসাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেনাবাহিনী শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের একটি গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদের কয়েকটি দাবি যে, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসারীরা চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সামরিক আইন প্রশাসক (জেনারেল টিক্কা খান) জখম হয়েছেন। রেডিও পাকিস্তান তা নাকচ করে দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করার কারণে সেখানে কী ঘটছে তার কোনো নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
২৭ মার্চ ১৯৭১ (দ্বিতীয় সংবাদ) : তিন দিন আগে সেনা মোতায়েনের একজন চাক্ষুষ সাক্ষী বিবিসি প্রতিনিধি নিজেই : তাকে ঢাকা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ঢাকা শহরের লোকদের সন্ত্রস্ত করার জন্য সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত নিষ্ঠুর একটি অপারেশন চালিয়েছে। আমাদের সংবাদদাতা আরও বলেছেন, যদিও ছাত্রদের হাতে কিছু অস্ত্র ছিল ট্যাংক ও আর্মার্ড ট্রাকভর্তি সৈন্য খুব কমই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। চারদিকে গুলির শব্দ এবং ভবনগুলোতে লেলিহান অগ্নিশিখা। আমাদের প্রতিনিধি ও তার সঙ্গী ফিল্ম ক্রুকে তিনবার ব্যাপকভাবে তল্লাশি করা হয়েছে। দেশের বাইরে প্রেরণের আগেই তাদের সংবাদ ও কাগজপত্র জব্দ করে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সামরিক সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে যাতে সেন্সরবিহীন সংবাদ দেশের বাইরে যেতে না পারে। প্রতিনিধি আরও জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদটি সম্ভবত সত্য।
২ এপ্রিল ১৯৭১ : পূর্ব পাকিস্তান থেকে একটার পর একটা সহিংসতা ও হত্যাকা-ের খবর আসছে। লন্ডন টাইমসের বিদেশ সংবাদদাতার চাক্ষুষ বিবরণ থেকে যশোরের অবস্থা জানা যায়। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান সরকারের বাহিনী মিলিটারি ক্যাম্প এলাকা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে। ফলে শহরটি এখন পূর্ব পাকিস্তানি বাহিনী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থক ও অনুসারীদের দখলে। তিনি বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের অনিয়মিত আধা-সামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানে জন্ম এমন সব মানুষকে ঘিরে, হাঁটিয়ে বাজারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেভাবে গুলি করে বাঙালিদের হত্যা করেছে তারই প্রতিশোধ হিসেবে একই নির্মমতায় তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। পশ্চিম পাকিস্তান রেডিও একটানা বলে যাচ্ছে, পূর্বাঞ্চলীর প্রদেশের সবগুলো প্রধান শহর এখন শান্ত। পাকিস্তান সেনাবাহিনী উড়োজাহাজ, ট্যাঙ্ক ও রকেটের সাহায্যে ভয়াবহ প্রত্যাঘাত করছে বলে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কাছে নালিশ জানিয়েছে।
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ : সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি করে পূর্ব পাকিস্তানিদের একটি দল, তাদের ভাষায়, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর একটি গ্রামের (বৈদ্যনাথতলা) আম্রকাননে প্রায় পাঁচ হাজার লোকের সামনে নজরুল ইসলাম ঘোষণা পাঠ করেন। তিনি বলেন, তার সরকার পৃথিবীর সব দেশের কাছে বাংলাদেশের জনগণের সহায়তায় এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং কে এম আহমদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে তিনি একটি মন্ত্রিসভার ঘোষণা দিয়েছেন। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারত থেকে একদল সংবাদদাতাও এসেছিলেন।
২৪ সেপ্টেম্বর : পূর্ব পাকিস্তানের একজন সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, মাইন বিস্ফোরণে আরও একটি জাহাজ ধ্বংস হয়েছে। এবারের জাহাজটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত। গাঙ্গেয় উপত্যকা চালনা’য় ঘটে-যাওয়া এই বিস্ফোরণের জন্য তিনি ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের দোষারোপ করেছেন। জাহাজটি খাদ্যশস্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাচ্ছিল। এর মধ্যে চালনা’য় মাইন বিস্ফোরণে আরও একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীরা ঘটনার দায়িত্ব স্বীকার করেছেন।
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ : ভারত পূর্ব পাকিস্তানের গভীরে একচেটিয়া সাফল্যের দাবি জানিয়েছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ভারতীয় সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী পনেরোটি অবস্থান থেকে চাপ প্রয়োগ করে চলেছে। পশ্চিম রণাঙ্গনেও তারা বিজয় দাবি করেছেন। অবশ্য পাকিস্তান উভয় রণাঙ্গনেই তাদের বিশেষ করে বিমানবাহিনীর সাফল্যের কথা বলেছে। আরও জানিয়েছে, তাদের বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ভারত বলেছে, বিভিন্ন রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই চলছে এবং সৈন্যরা ঢাকার দিকে এগোচ্ছে। একজন সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ঢাকা ও যশোরের মধ্যকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বোমাবাহী উড়োজাহাজ ঢাকায় সৈন্যঘন অঞ্চলগুলোতে আক্রমণ করে যাচ্ছে। ঢাকার বিমানঘাঁটিও অচল করার দাবি তিনি জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও চালনা বন্দরের স্থাপনাও আক্রান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ : ভারতীয় সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনী ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে কুমিল্লা বিমানঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। তারা কুমিল্লা শহরসহ অন্যান্য দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ঢাকা রেডিও পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশে তীব্র লড়াইয়ের কথা স্বীকার করেছে। রেডিও বলেছে, প্রচণ্ড ভারতীয় চাপ সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী লাকসাম ধরে রেখেছে, রংপুর ও দিনাজপুরে ভারতীয় বাহিনীর অগ্রগতির প্রচেষ্টা অবিরাম ঠেকিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা রেডিও বলেছে, সিলেটে হেলিকপ্টারবাহিত ছত্রীসেনাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। অল ইন্ডিয়া রেডিও বলেছে, পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতীয়রা চারশো পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা করেছে এবং আঠারশো পাকিস্তানি সৈন্য কারারুদ্ধ করেছে।
১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ : ভারত জানিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার আশপাশে ভারতীয় প্যারাট্রুপার নামানো হয়েছে, পদাতিক বাহিনী চারদিক থেকে শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার মেজর জেনারেল জ্যাকব জানিয়েছেন, গতকাল পরিচালিত বিমান আক্রমণ সফল হয়েছে। এর বেশি কিছু তিনি বলতে সম্মত হননি। তবে ভারতীয় কমান্ডার বলেছেন, তার বাহিনী মেঘনা নদী অতিক্রম করেছে এবং এখন শহরের ২০ মাইল (৩২ কিলোমিটার) এলাকার মধ্যে পৌঁছে গেছে। তবে তাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভারতীয় বাহিনী জানাচ্ছে, কুমিল্লার সব নদী ও শাখানদী এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ইউনিট ঢাকায় খুবই সক্রিয়। শহরের ভেতর লড়াই চলছে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ : পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে। রেডিও পাকিস্তান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং ভারতীয় বাহিনী রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, স্থানীয় ভারতীয় ও পাকিস্তানি কমান্ডারদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী সংসদে বলেছেন, দুপক্ষের প্রতিনিধি ঢাকায় আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষে এই চুক্তি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। তিনি বলেন, ভারত আশা করে, পূর্ব পাকিস্তানিদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তানে আটক রয়েছেন, নিজ দেশের মানুষের মধ্যে তার আসন গ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশকে শান্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মিসেস গান্ধী বলেন, ভারতীয় বাহিনী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় সেখানে অবস্থান করবে না। তিনি আরও বলেন, লাখ লাখ শরণার্থী ইতিমধ্যেই দেশের পথে পা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে বিবিসি বাংলা। বিবিসি বাংলার কাছে আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা।
(সূত্র: বিদেশির চোখে ১৯৭১, একাত্তরের দলিল)
