সেন্টমার্টিনে দখল উৎসব!

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৩, ১২:২৮ এএম

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ- সেন্টমার্টিন। আয়তনে প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার। নাফ নদীর মোহনায় যার অবস্থান। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে অনেকে এটার নাম করেছে- ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’। তবু এই দ্বীপ ঘিরেই শুরু হয়েছে, দখল উৎসব। ১৩ পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে, প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম ক্ষুদ্র দ্বীপ। যদিও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এটিকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করেছে। সংরক্ষিত এলাকায় কীভাবে দখল উৎসব চলে? উত্তর জানা না থাকলেও বোঝা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অনেক রাঘব-বোয়াল। যারা নিয়মিতভাবে, অর্থগন্ধ পেয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় মানুষজন অসহায় হলেও, কিছুই বলার নেই। কারণ, সেই ১৩ পরিবার! তারাই, সেন্টমার্টিনের ভালো-মন্দের গডফাদার!

গত ৭ মার্চ, দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতায় প্রকাশিত - ‘১৩ পরিবারের দখলে সেন্টমার্টিন’ শিরোনামের সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়- কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন সেন্টমার্টিন নিয়ন্ত্রণ করছে ১৩ পরিবার। জমি বিক্রি, রিসোর্ট তৈরি কিংবা সেখানে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করতে গেলে লাগবে তাদের সুদৃষ্টি। পরিবারগুলো খুশি থাকলে যে কেউ প্রাসাদও তৈরি করতে পারেন সেখানে। ৫০ বছর ধরে তারা বলতে  গেলে এলাকাটি শাসন করছেন। তাদের পেছনে আছেন উপজেলার প্রভাবশালীরা।

এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট ছোট দোকানপাটের মধ্যে বেশির ভাগেরই মালিক ওই ১৩ পরিবারের সদস্যরা। এক চেটিয়াত্বের কারণে যে যার মতো পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। পর্যটকরা কারও কাছে প্রতিকার চাইতে পারছেন না।

সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়েছে স্থানীয়দের কাছে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত এ দ্বীপে প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক আসেন। এখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের প্রভাবশালীদেরও হোটেল ও রিসোর্ট আছে।

সেন্টমার্টিনে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেন্টমার্টিন কারা নিয়ন্ত্রণ করেন। পর্যটন খাতসমৃদ্ধ হলেও যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তাসহ মৌলিক অনেক সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ। জরুরি কাজে টেকনাফ ও জেলা সদর কক্সবাজার আসা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে বেশ কটি জাহাজে পর্যটকরা দ্বীপে আসা-যাওয়া করেন। টেকনাফ থেকে স্পিডবোট থাকলেও শুষ্ক মৌসুম ছাড়া চলাচল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি স্পিডবোটচালক জানান, প্রতি মাসে স্থানীয় নেতাদের চাঁদা দিতে হয়। ১৩ পরিবারের কেউ না কেউ চাঁদা তোলেন। তারা নিজেদের শ্রমিক লীগ নেতাকর্মী দাবি করেন। তবে চাঁদার বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয় না। চাঁদা দেওয়ার কারণে পর্যটকদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘অদৃশ্য শক্তির’ ইশারায় ১৩ পরিবার সব অপকর্ম চালাচ্ছে। তাদের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে। জায়গা বিক্রি করতে হলে তাদের অনুমতি নিয়ে করতে হচ্ছে। তাদের আত্মীয়স্বজনরা দোকানপাট তৈরি করে ব্যবসা চালাচ্ছেন।

একটি দ্বীপ ইউনিয়ন যদি এইভাবে দখলে যায়, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে- এর নেপথ্যে কারা আছেন? তারা কি এতই শক্তিশালী যে- প্রশাসনও কিছু করতে পারছে না! প্রশাসনের কেউ কেউ এ ব্যাপারে জড়িত থাকলেও, নিশ্চয়ই সমস্ত কর্মর্কতা দুর্নীতিগ্রস্ত নন। তাহলে কি ইচ্ছাকৃতভাবে, অর্থগন্ধে অচেতন রয়েছেন- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ!

স্থানীয় মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা এবং পর্যটনশিল্প বিকাশের জন্য, স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা জরুরি। যদি পর্যটনশিল্পের বিকাশ চাই, যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে চাই- তাহলে এই দুষ্টচক্রের দখল উৎসব বন্ধ করা দরকার। একইসঙ্গে জনগণের মৌলিক সমস্যার সমাধান জরুরি। জনমানবশূন্য প্রবাল দ্বীপ যেমন পর্যটনের জন্য নিরাপদ নয়, তেমনি এই দ্বীপ নিয়ে দখল উৎসবও দুঃখজনক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত