কেউ যদি বলেন মশা না থাকলে, এক শ্রেণির মানুষের পকেট ভারী হবে না; তাহলে কি বাড়তি বলা হবে? কেউ যদি বলেন, মশাবাহিত রোগের কারণেই বেঁচে আছেন লাখ লাখ মানুষ এটাও কি ভুল উক্তি? যারা এমন কথা বলেন, তাদের যুক্তিটাও কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো না।
তারা বলছেন, মশা কামড়াবে। এর ফলে মানুষের রোগ হবে। মানুষ যাবেন চিকিৎসকের কাছে। তারা আক্রান্ত রোগের বিরুদ্ধে ওষুধ দেবেন। এর জন্য আছে বিভিন্ন ওষুধের কারখানা। শুধু ওষুধ নয়। আছে কয়েল এবং অ্যারোসল। মশা না থাকলে, রোগ হবে না। রোগ না হলে, এসব ওষুধেরও দরকার হবে না। তখন কী অবস্থা হবে? সুতরাং মশাকে ভালোমতো যত্ন করতে হবে। তাদের প্রজনন বৃদ্ধি করার সুযোগ দিতে হবে। মানুষ যাতে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে! না হলে তো হবে না? মশার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পর, মশা না থাকলে এই টাকাগুলো লস হবে না! বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে যাবে। সুতরাং মশাকে বাঁচাতে হবে। মানুষ রোগাক্রান্ত হবে। ডাক্তারের কাছে যাবে। চিকিৎসা নেবে। এর বাইরে সিটি করপোরেশন যে টাকা নয়ছয় করছে, সেটা তেমন কিছু না! মশা নিধনের নামে, এই প্রতিষ্ঠান ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ করে, ২৭ বছরে গচ্চা দিয়েছে ১২৭৫ কোটি টাকা। এই টাকাটা কার! ক্ষতিটা কোন পক্ষের হলো?
গতকাল দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘মশার পেটে ১২৭৫ কোটি’ শীর্ষক সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের কাছ থেকেই। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দেখে তিনি বলেছিলেন, ঢাকা শহরে মশা নিধনে যে প্রক্রিয়ায় কাজ করা হয় তা ভুল।
মেয়রের এই স্বীকারোক্তি ধরে নিলে এত দিন যে ভুল পদ্ধতিতে মশা নিধনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে এর পেছনে যে খরচ হয়েছে তা পুরোটাই গচ্চা গেছে। ডিএনসিসির বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ওষুধ কেনা ও ছিটানোয় খরচ হয়েছে ৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আর যন্ত্রপাতি কেনায় খরচ ৬৫ লাখ টাকা। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওষুধ কেনা ও প্রয়োগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৬ কোটি টাকা। আর যন্ত্রপাতি কেনায় বরাদ্দ ২৫ কোটি টাকা। ডিএসসিসির মশক নিধন বিভাগের বর্তমান স্থায়ী জনবল ৩৭৫ জন। তারা সবাই সরকারি বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। তাদের মাসিক গড় বেতন ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ডিএসসিসি স্থায়ী জনবলের মাসে বেতন-ভাতা দিচ্ছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার। গত ১১ বছরে বেতন-ভাতায় খরচ ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর বাইরে ডিএসসিসির মশক নিধন বিভাগে তিন বছর ধরে অস্থায়ীভাবে কাজ করছে ৭১০ জন। তাদের দৈনিক গড় বেতন ৫৫০ টাকা। সেই হিসাবে দৈনিক বেতন খাতে খরচ ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকা। আর প্রতি মাসে ১ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এই হিসাবে ৩ বছর তাদের বেতন দেওয়া হয়েছে ৪২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এই যে বছর বছর টাকা দেওয়া হচ্ছে, এই টাকাটা জনগণের। মশার কামড় খাবে জনগণ, রোগাক্রান্ত হবে জনগণ এবং আক্রান্ত রোগ থেকে সুস্থ অথবা মরবেও জনগণ। তাহলে, সমাধানটা কী হলো?
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মশা নিধনে সত্যিই যদি আন্তরিক হয়, তাহলে দেশের জনগণকে প্রথমেই সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এরপর যত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে, তার প্রয়োগও সহজ হয়ে যাবে। মশামুক্ত শহর গড়তে চাইলে অযথা কোটি কোটি টাকা গচ্চা না দিয়ে, এ বিষয়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শমতো অগ্রসর হলেই সমাধান আসবে।
