মহামান্য যদি মিস্টার হন

আপডেট : ০৩ মে ২০২৩, ১২:০৫ এএম

সংসদীয় গণতন্ত্র ধাঁচের সরকার হোক কিংবা রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার এ নিয়ে এতটুকু সন্দেহও কারও নেই যে, প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতিই হচ্ছেন অসীম মর্যাদায় দেশের এক নম্বর ব্যক্তি। এমন কি পুতুল-রাষ্ট্রপতি হলেও মর্যাদায় তার সর্বোচ্চ অবস্থানের সাংবিধানিক গ্যারান্টি রয়েছে। আনুষ্ঠানিক সব সম্বোধনে রাষ্ট্রপতি ‘মহামান্য’-ই থাকবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন, পৃথিবী গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো আন্তঃদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ট্রিগারে তার যত শক্তিশালী হাতই থাকুক না কেন তার মহামান্য হওয়ার সুযোগ নেই। আমেরিকানদের কাছে এবং বিশ্ববাসীর কাছে তিনি মিস্টার প্রেসিডেন্ট। ‘মিস্টার’ হওয়ার কারণে পৃথিবী আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মর্যাদা এতটুকুই কমিয়ে দেয়নি আবার মহামান্য হওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের মর্যাদা একই পৃথিবী সামান্যও বাড়ায়নি।

সামন্ত ভাবনা, ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও এ ধরনের এক ডজন কারণ দেখিয়ে স্যার, হুজুর, মাননীয়, এক্সিলেন্সি, মাই লর্ড, মহামান্য ইত্যাদি সম্বোধনকে বুদ্ধিজীবীরা গালমন্দ করতে কবতে প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠিতই করে থাকেন। পাছে প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায় কিংবা এর মধ্যে প্রাপ্ত সম্পদ কিংবা খেতাব হাতছাড়া হয়ে যায় এই আশঙ্কায় ‘স্পিকিং ট্রুথ টু দ্য পাওয়ার’ দক্ষিণ এশিয়া বুদ্ধিজীবীরা কমই করে থাকেন। খেতাবযুক্ত নামে সম্বোধন করার প্রবণতা বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানেই বেশি। সম্বোধিত হতে হতে তা যেন পিতৃপ্রদত্ত নামের অংশ হয়ে ওঠে। স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় কেউ যদি সংযুক্ত অংশ ছেড়ে উচ্চারণ করেন, মেজাজ বিগড়ে যায়। মেজাজ আরও বেশি বিগড়ে যায় মোসাহেবদের। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখান ওই দেখলেন তো ব্যাটা নচ্ছার কেমন আপনাকে অপমান করল! তাকে শূলে চড়ানো দরকার।

হালে বাংলাদেশে স্যার বলা না বলার বাহাসটা বেশ বাজার পেয়েছে। স্যার সম্বোধন না শুনে চেয়ারধারী কজন বেশ চটে উঠছেন। অমনি না বলার পক্ষে ডেমনস্ট্রেশন শুরু হয়ে যাচ্ছে। সেসব স্যাররাও বলতে শুরু করেছেন : ঠিক আমাকে নয় চেয়ারটাকে তো স্যার বলতেই হবে, এটা তো একটা ইনস্টিটিউশন! ভাবখানা এমন যেন, চেয়ার নামের কাষ্ঠাসনটিকে স্যার সম্বোধন না করলে তা ভেঙে খান খান হয়ে পড়ে যাবে। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় রাষ্ট্রপতির নামে। রাষ্ট্র অর্থ ব্যয় করে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল অথোরিটি অনুযায়ী। সার্বভৌমের এক নম্বর প্রতীক রাষ্ট্রপতি। তিনি যদি একবার বলে দেন, ঢের হয়েছে, আর মহামান্য শুনতে চাই না, এখন থেকে আমি হলাম আপনাদের মিস্টার প্রেসিডেন্ট দেখবেন অমনি সম্বোধনের তাসের ঘর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে।

মন্ত্রী যত বড়ই হোন এমনিতেই তারা ভাইতে অভ্যস্ত। প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পরপরই তারা বলে দেবেন– থাক, তাহলে আমাদেরও মাননীয় বলার দরকার নেই। সচিবদের নেতারা বলে দেবেন, আরে এটা তো ছিল আমারও মনে, আমাদের স্যার স্যার বলার দরকার নেই। সচিব যদি স্যার না হতে চান তাহলে বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, কমিশনার বা ডিসি কিংবা ইউএনও স্যার হতে চাইবেন এটা মনে করার কোনো কারণই নেই। পদের সঙ্গে কিংবা নামের সঙ্গে মিস্টার যোগ করে ডাকতে থাকুন মিস্টার শফিউল আজম কিংবা মিস্টার কেবিনেট সেক্রেটারি, মিস্টার নূর মোহাম্মদ কিংবা মিস্টার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি (শফিউল আজম একদা কেবিনেট সেক্রেটারি এবং নূর মোহাম্মদ প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ছিলেন, দুজনই প্রয়াত)।

যদি মিস্টার ব্রিটিশ কলোনিয়াল বলে মনে হয় তাহলে ফ্রেঞ্চ কলোনিয়াল পথে হাঁটুন, মঁশিয়ে বলুন। চন্দননগরের যুদ্ধে মঁশিয়ে ডুপ্লে যদি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের হারিয়ে ভারত মহাসাগর-ছাড়া করতে পারতেন, আমরা ফরাসি কলোনিই হতাম, মঁশিয়ে প্রাইম মিনিস্টারই বলতাম। সেনাপ্রধান পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই চিফ সম্বোধিত হন, প্রধান বিচারপতিকে মিস্টার চিফ জাস্টিস বললে পৃথিবীর কোনো দেশই আপনাকে আদালত অবমাননার দোষ দেবে না। মাই লর্ড, লর্ডশিপ, ইউর অনার বলা অপরিহার্য নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৬ জানুয়ারি ২০১৪ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, জাস্টিস এইচএল দত্ত এবং জাস্টিস এসএ বোবড়ের বেঞ্চ উল্টো আইনজীবীদের জিজ্ঞেস করেছেন, কবে আমরা বলেছি এসব সম্বোধন বাধ্যতামূলক? এসব সম্বোধনকে চিহ্নিত করা হয়েছে ঔপনিবেশবাদের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে। তবে এটা তো অবশ্যই মান্য যে, সম্বোধন অবশ্যই সম্মানজনক হতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের সূত্র ধরে উচ্চ আদালত থেকে মাই লর্ড, ইউর লর্ডশিপ অন্তর্হিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বাকি রয়ে গেলেন শিক্ষকরা। প্রেসিডেন্ট যদি মিস্টার প্রেসিডেন্ট হয়ে যান তা হলে মিস্টার ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। সেসব ভাইস চ্যান্সেলর ইউরোপ আমেরিকার পিএইচডি নিয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গদিনসিন হয়েছেন তারা কি তাদের শিক্ষকদের স্যার বলতেন?

আমি গত শতকের আশির দশকের শেষটাতে ময়মনসিংহ জেলায় কর্মরত ছিলাম। সে সময় আমাদের অনেকেরই প্রিয় মান্নান ভাই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিলেন এবং কিছুকাল পর জাতীয় সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হলেন। তার কাছ থেকেই শোনা : আগে প্রায় সবাই তাকে স্যার সম্বোধন করতেন, এমপি হওয়ার পর স্যার আর শুনছেন না, শুনছেন শুধু ভাই আর ভাই। অবশ্য এ নিয়ে তার কোনো খেদ নেই। কিন্তু যিনি তাকে ভাই বলছেন, তিনি তার ছাত্র ইউএনওকে তার সামনেই স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তুলছেন।

সাবেক স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চক্ষুবিশেষজ্ঞ আবদুল মতিনের জেলা সিরাজগঞ্জে আশির দশকে চাকরি করেছি। জেলাতে তার বিরোধিতা থাকলেও তিনি বিরোধী নেতাদের ডেকে কখনো কখনো সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে বৈঠকও করতেন। বৈঠকের আয়োজন সহযোগী হিসেবে কখনো কখনো সেখানে আমারও থাকার সুযোগ হতো। এমনি একটি বৈঠক চলাকালে একজন বন্ধ দরজা প্রায় ঠেলে মাথা গলিয়ে বললেন, মতিন ভাই শোনেন, কথা আছে।

মন্ত্রী বললেন, গত চব্বিশ ঘণ্টা তো আমার আশপাশেই ছিলে, তবুও তোমার কথা বলা হয়নি। এখন ডিস্টার্ব করো না।

অতঃপর তিনি বললেন, এই হচ্ছে ভাই হওয়ার জ¦ালা। রাজনীতিতে আসার আগে সব মেডিকেলের ছাত্র, রোগী, অধিকাংশ ডাক্তারের আমি ছিলাম স্যার। এখন হাতেগোনা কজন সরকারি লোক ছাড়া আর কেউ স্যার বলেন না।

বর্ষীয়ান মির্জা মুরাদুজ্জামান বললেন, কী করবেন মন্ত্রী সাহেব, আপনার জন্য স্যারের কোটা কমে গেছে, ভাই বেড়েছে। আল্লাহতায়ালা যার জন্য যে সম্বোধন বরাদ্দ করেছেন সে কোটা শেষ হয়ে গেলে ভাই হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। অপর বর্ষীয়ান এবং শ্রদ্ধেয় মোতাহার হোসেন মাস্টার (পঁচাত্তরের একজন গভর্নর) বললেন,  মাস্টারি করেছি বলেছে নাম হয়ে গেছে মোতাহার মাস্টার। ছাত্ররা এখনো স্যার বলে, কিন্তু নাতির বয়সীরা বলে মোতাহার ভাই।

আমাদের অন্তরে ‘স্যার’ শোনার একটা অদম্য আগ্রহ থেকেই যায়। স্যার না বলার দুর্দমনীয় তারুণ্যে সিভিল সার্ভিসে ঢুকে চেষ্টা করছি কাছাকাছি ব্যাচের ঈষৎ জ্যেষ্ঠদের স্যার বলা এড়িয়ে যেতে। লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের কেবল শুরু। অর্থনীতির পাণ্ডিত্য থাকা সেখানকার একজন সহকারী পরিচালক আমাদের ভিকটিম তিনি আমাদের পড়াচ্ছেন, কিন্তু আমরা বলছি ভাই, স্যারের আশপাশ দিয়েও যাচ্ছি না। তিনি আমাদের কজনকে ডেকে বললেন, আপনারা বিসিএস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সদস্যরা যদি স্যার না বলেন অন্য ক্যাডার সে সুযোগটা নেবে। তা ছাড়া কয়েক বছর পর আপনারা যখন আমার জায়গায় আসবেন তখন আপনাদের জুনিয়ররাও আপনাদের স্যার বলবে না। এমন করলে ইনস্টিটিউশন নষ্ট হয়ে যাবে। ইনস্টিটিউশন যে কেবলই স্যারনির্ভর কে জানত? আমি ধরে নিচ্ছি, আমাদের কথিত শিক্ষিতজনের অন্তর্গত মানুষটি হয়তো স্যারই শুনতে চান। কিন্তু কেন?

একটি গল্পে স্যার বলা না বলার একটি ছবি দেখা যাবে প্রকাশকের একজন লেখকের নাম হুমায়ূন আহমেদ, অপর একজন আতিকুর রহমান।  হুমায়ূন আহমেদের বই সংস্করণের পর সংস্করণ হয়, আতিকুর রহমানের বই এক মেলায় ১৩টা বিক্রয় হয়, ১২টা আবার তারই টাকায় স্বজনদের কেনা। প্রকাশক  হুমায়ূন আহমেদকে স্যার বলেন, তাকে বলেন, আতিক ভাই। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আতিকুর রহমান বলেন, আমি তো হুমায়ূনের অনেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি, তার পাঁচ বছর আগে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে পিএইচডি করেছি। তাপরও হুমায়ূন স্যার আর আমি আতিক ভাই! এই অনাচার মানা যায় না। স্যার ও ভাইয়ের ব্যবধান  ইউরোপে নেই, দক্ষিণ আমেরিকায় নেই, উত্তর আমেরিকায় নেই, অস্ট্রেলিয়াতেও নেই । গার্সিয়া মার্কেজকে কেউ স্যার বলছেন না কিংবা কার্লোস ফুয়েন্তেসকে কেউ বলছেন না কী বড় ভাই চলছে কেমন। কিংবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ে জন স্টাইনবেকের টুঁটি চেপে ধরে বলছেন না– ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে। কিংবা ‘স্যার বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে’– এমন কথা হুমায়ূন আহমেদও কখনো বলেছেন শুনিনি।

সম্মান আসলে কী?

লিফটম্যান এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের কাহিনিটি বহুল প্রচলিত। আর একবার শোনাই।

আমেরিকার একটি স্কাই স্কাই স্ক্র্যাপরের বড় লিফট। প্রাইমটাইমে লিফটম্যান ভেতরে থাকেন। লম্বা কিউ হয়, কখনো কখনো সবার ঠাঁই হয় না, পেছনের যাত্রীরা সামনে আসেন, তাদের পেছনে কিউ বড় হতে থাকে।

লিফটম্যান গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমেই দেখলেন লম্বা কিউ, কিন্তু দুজন নিরাপত্তা প্রহরী অপর একজনকে কিউর বাইরে থেকে লিফটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

লিফটম্যান, জিজ্ঞেস করলেন, হু ইজ হি?

নিরাপত্তা প্রহরীদের একজন বললেন, দ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট।

লিফটম্যান বললেন, ওহ্ ইয়েস।

তিনি লিফটে ঢুকতে যাচ্ছেন, অপারেটর বললেন, জাস্ট ওয়েট। আপনি কীসের ভাইস প্রেসিডেন্ট?

তিনি বললেন, অব ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।

লিফটম্যান বললেন, কাম অন, আমি ভেবেছিলাম আমাদের কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। যান পেছনে লাইনে গিয়ে দাঁড়ান।

কাহিনির সমাপ্তি এখানেই। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট, তাতে লিফটম্যানের কী আসে যায়। তার কাছে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিছুটা ছাড় পেতে পারেন। এই ছাড়টুকু হচ্ছে বাহ্যিক সম্মান।

পাদটীকা : বিশ্বায়নের প্রায় সব কিছুই আমরা গ্রহণ করেছি। এ দেশেও একদিন মিস্টার/মাদাম প্রেসিডেন্ট, মিস্টার/মাদাম প্রাইম মিনিস্টার, মিস্টার ফিন্যান্স মিনিস্টার/মিস্টার সেক্রেটারি চালু হবে এটা নিশ্চিত। যে প্রেসিডেন্ট নিজে থেকে উদ্যোগটা নেবেন, কেবল তিনিই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত