কারসাজির কারবারি

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ১১:৫৯ পিএম

প্রতিদিন বেড়ে চলেছে বাজারদর। টালমাটাল নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজার। পুঁজিবাজারও এর বাইরে নয়। সবকিছুতে ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মানুষ দেখছে সবকিছুই দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেখা গেছে, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কারসাজির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে মুনাফার সুযোগ নিয়ে থাকে। পুঁজিবাজার ও পণ্যবাজার উভয় ক্ষেত্রেই একই চিত্র।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘ভোগ্যপণ্যে ভোজবাজি’ শিরোনামে ও ‘দাম বাড়ে সিন্ডিকেটে কমে চাপে’ উপশিরোনামে প্রকাশিত কোলাজ প্রতিবেদনটিতে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনটির বিভিন্ন উপশিরোনাম দেখলেই পরিস্থিতি টের পাওয়া যাবে। যেমন ‘কিন্তু ফেরে না আগের দামে’; ‘এক মাসেই দ্বিগুণ পেঁয়াজের দাম’; ‘করপোরেটের দখলে ব্রয়লার’; ‘ডিমের দামে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কোম্পানি’; ‘সিন্ডিকেটই ঠিক করে তেলের দাম’ এবং ‘চিনির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে’। প্রতিটি উপশিরোনামের বক্তব্যই বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদন হয়ে উঠতে দেখেছি আমরা। যা বলে দেয় যে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

শেয়ারের কৃত্রিম সংকট ও গুজব ছড়িয়ে কারসাজির মাধ্যমে যেভাবে দাম বাড়ানো হয়, একইভাবে ভোগ্যপণ্য কিংবা নিত্যপণ্যের দামও অস্বাভাবিক হারে বাড়াতে দেখা যায়। পুঁজিবাজারের মতো এখানেও রয়েছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট, যারা সরবরাহজনিত কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। পুঁজিবাজার ও পণ্যবাজারে কারসাজির একই হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে শেয়ারবাজারে কারসাজির তদন্ত এবং কখনো কখনো দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা শোনা গেলেও নিত্যপণ্যের মূল্য কারসাজির হোতারা অধরাই থাকেন। ধারণা করা যায়, ভোগ্যপণ্য কিংবা নিত্যপণ্যের কারসাজিকারকরা পুঁজিবাজারের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এ কারণে এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থাও নিতে দেখা যায় না সরকারকে। আমদানি করা হয় না, এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে। পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক যুগে বাংলাদেশের ভোক্তামূল্য সূচক (সিপিআই ইনডেক্স) দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বর্তমানে ১১১ দশমিক ৪৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।

বিশ^বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হলে তা দেশের বাজারে প্রভাব পড়বে এটি সাধারণ বিষয়। তবে পরে বিশ^বাজারে দাম কমলে সে অনুযায়ী আর দাম সমন্বয় করা হয় না। এছাড়া, ভোক্তাকে ন্যায্যমূল্য পেতে হলে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রয়োজন, তা নেই। গুটি কয়েকজনের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় বাজারব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। এর জন্য টিসিবির মতো নানান পদক্ষেপ নিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তবে তা জনসংখ্যার হিসাবে পর্যাপ্ত নয়। সরকার চাইলে নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি করে বিক্রি করতে পারে। এতে রাষ্ট্র লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের জনগণও স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য পাবেন।

যে কারণেই হোক, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বেপরোয়া। তাই আজ পেঁয়াজ, কাল লবণ, পরশু চাল, পরদিন অন্য কোনো পণ্য নিয়ে তারা বাজারে পাগলা ঘোড়ায় বাজি ধরছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সরকারের নীরব থাকার উপায় নেই। অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। শুধু হুঁশিয়ারি যথেষ্ট নয়। দু-একটি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাতেই অসাধুদের টনক নড়তে পারে।

গত বছর এ বিষয়ক এক রিট শুনানিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছে, ‘‘আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় নিত্যপণ্যের বাজার ‘জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর’ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।” বাজার নিয়ন্ত্রণে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। একদিকে, সরকার খাদ্যপণ্যের বাজারদর ঠিক করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, একটি মহল জোটবদ্ধ হয়ে সেসব পণ্য মজুদ করে সুযোগ মতো দাম বাড়িয়ে তা বাজারে ছাড়ছে। এটা ভাবা দরকার যে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো থেকে শুরু করে সরকারের সাম্প্রতিক কোনো সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত