সর্বাত্মক যুদ্ধ হাইতি একা পারছে না

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৩, ০১:১২ এএম

একজন সংক্রামক রোগের ডাক্তার হিসেবে হাইতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি আমি। অসংখ্য ট্র্যাজেডির সঙ্গে লড়েছি। এইচআইভি, যক্ষ্মা, কভিড-১৯, ভূমিকম্প, হারিকেন এবং ভয়াবহ বন্যার মতো সমস্যা মোকাবিলা করেছি। প্রতিবারই আমরা স্বাস্থ্যকর্মীরা, পুলিশ সদস্যরা, মানবাধিকার কর্মীরা, সরকারি কর্মকর্তারাসহ নাগরিকরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শামিল হয়ে হাইতিয়ানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হয়েছি। এতে সফলও হয়েছি। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের দেশে এখন প্রায় ২০০টি সন্ত্রাসী গ্যাং আছে, যারা সামরিক-গ্রেডের অস্ত্রে সজ্জিত এবং চারপাশে তাণ্ডব চালাচ্ছে। নাগরিকদের হত্যা, অপহরণ এবং ধর্ষণ করতে তারা সিদ্ধহস্ত। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা এত বেশি, মনে হচ্ছে দেশে সর্বাত্মক যুদ্ধ চলছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সম্প্রতি আমাদের পরিস্থিতিকে ‘জীবন্ত নরক’ বলে অভিহিত করেছেন।

আমাদের সরকার নেই। আমাদের রাষ্ট্রপতি জোভেনেল মোইসকে প্রায় দুই বছর আগে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পদে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিও বহাল নেই। সেনাবাহিনী দুর্বল আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সমরাস্ত্র তাদের নেই। মাত্র ০৯ হাজার সদস্যের শক্তি-সহায়হীন একটি পুলিশ বাহিনী আছে, যারা ভয়ংকর গ্যাংগুলোর সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বা তাদের বাধ্যতামূলক নিয়োগের শিকার। গুটিকতক হাইতিয়ান আছেন, যারা পরিবর্তনের জন্য মরিয়া। তারা নিজেরাই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষা দিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আমাদের গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। ১১ মিলিয়ন নাগরিক জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তাই ডাক্তার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, ছাত্র সবাই একটি সমাধান খুঁজে বের করার পথে নেমেছেন।

গত কয়েক মাসে এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, সমাধানটা আমরা একা করতে পারব না। হাইতিয়ানরা একাই এমন একটি সংকট কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখে না। দেশের এত খারাপ অবস্থা আমার গোটা জীবনে আর দেখিনি। বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়া তাই কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।

কখনো ভাবিনি যে, নিজের মাতৃভূমির জন্য বিশ্বের কাছে বিদেশি সৈন্য পাঠানোর আবেদন করতে হবে। আমি নিতান্ত একজন ডাক্তারÑ রাজনীতিবিদ বা সমর কুশলী নই। হাইতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের দুঃখজনক ইতিহাস আছে। একটি স্বাধীন জাতি হওয়া সত্ত্বেও অতীতে পশ্চিমা শক্তিগুলো স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করেছে আমাদের। যার ফলে হাইতি আজ কাঠামোগত দুর্দশা এবং অত্যন্ত দারিদ্র্যে পতিত হয়েছে। তবুও আজ আমরা বিকল্প কোনো সমাধানের কথা ভাবতে পারছি না।

এই হাইতিতেই আমার জন্ম। চার দশকেরও বেশি আগে আমেরিকার ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণ শেষে চিকিৎসা অনুশীলনে দেশে ফিরেছি। আশির দশকের গোড়ার দিকে বিশ্বের প্রথম কয়েকটি এইচআইভি কেস নির্ণয়ে অবদান আছে আমার। এর পরপরই হাইতির স্বাস্থ্যসেবার পেশাদার সদস্যদের নিয়ে কাপোসিস সারকোমা ও অপরচুনিটিস ইনফেকশন (এঐঊঝকওঙ) অধ্যয়নের জন্য একটি হাইতিয়ান প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। তখনো এইচআইভি সম্পর্কে বিশ্বে তেমন জানাশোনা ছিল না। তারপর থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠান হাইতিতে রোগীদের যতেœ প্রথম সারিতে রয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভ্যুত্থান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়েই সবসময় আমাদের কাজ করতে হয়েছে। ২০১০ সালের ভূমিকম্প দেশের বেশিরভাগ ক্লিনিক ভবন ধ্বংস করেছে এবং শহরে আমাদের সেন্টারকে একটি বিশাল শরণার্থী শিবিরে পরিণত করেছে। কিন্তু স্থানীয় সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় আমরা তাঁবু খাটিয়ে খোলা মাঠে হাসপাতাল স্থাপন করেছি। সে-সময় ভূমিকম্প পরবর্তী হাজার হাজার রোগীর নিরাময়ের আয়োজন চলেছে এখানে। একবারও দরজা বন্ধ করিনি আমরা এবং একদিনের জন্যও সেবা কার্যক্রম থেমে থাকেনি।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে, অচিরেই সব কার্যক্রম ক্লোজ করে দিতে বাধ্য হব। চিকিৎসকরা প্রায়ই অপহরণের শিকার হচ্ছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অপহৃত চিকিৎসা কর্মীদের মুক্তির চেষ্টায় পথে নেমেছি। কয়েকদিনের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বন্ধও রাখতে হয়েছে। গত বছর আমাদের প্রায় এক- তৃতীয়াংশ কর্মী নিজেদের এবং পরিবারকে রক্ষা করতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি পরিষেবাগুলো রোগীর ভিড় সামাল দিতে পারছে না। গুলি-বোমায় হতাহতরা চিকিৎসার জন্য হাহাকার করছে। গল্কফবপরহং ঝধহং ঋৎড়হঃরèৎবং-এর মতো স্বাস্থ্যসেবায় অংশীদার আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ গ্যাংশটের শিকার হয়ে তাদের অপারেশন স্থগিত বা পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়া তাই আমরা সংকটের আপাতত কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছি না। রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীকে সমর্থন ও প্রশিক্ষণ দিতে এবং আমাদের সরকার পুনর্গঠনের সময় নিরাপত্তা দিতে প্রয়োজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক বাহিনী। বিকল্প টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে সন্ত্রাসী গ্যাংগুলোর নিয়োগের ঝুঁকিতে থাকা তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক কর্মসূচিতে আনা সম্ভব হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগও দরকার। জাতিসংঘের রিপোর্টে দেখা গেছে হাইতিতে বন্দুকের প্রধান উৎস, অর্থাৎ হাইতিয়ান গ্যাংগুলোর কাছে অস্ত্রের অবৈধ চালান আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সেটা বন্ধ করতে তাই বাইডেন প্রশাসনের উদ্যোগী হওয়া জরুরি। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে আমাদের নিজেদের সক্ষম করে তোলার জন্য হলেও বিশ্বের উচিত হাইতির সাহায্যে এগিয়ে আসা।

যদি তা না হয়, তাহলে অনেক মানুষ মারা যাবে, আরও বহু প্রাণ অঘোরে নষ্ট হবে। অবিলম্বে হাইতির জনগণের সাহায্যে এগিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমরা জোর অনুরোধ করছি। হাইতিকে নীরবে জ্বলতে দিতে পারি না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

লেখক : হাইতির লেস সেন্টার GHESKIO-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং এবং নিউ ইয়র্কের ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর করেছেন মনযূরুল হক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত