জামায়াতের গণতান্ত্রিক অধিকার

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩, ১২:৩৮ এএম

জামায়াতে ইসলামী বরাবরই সময়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইসলামপন্থি এই দলটি কখনোই জনাকাক্সক্ষা, বাস্তবচিত্র বা জনমানুষের প্রত্যাশা অনুসারে রাজনীতি করতে পারেনি। যে কারণে এই দলটির পক্ষে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়া সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বরং জামায়াতে ইসলামী ভুল কৌশল অবলম্বন করে সময়ের চোরাশ্রোতে ভেসে গিয়েছে। গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন, গুম, বিনা বিচারে হত্যা বন্ধের দাবিতে দেশ এক চূড়ান্ত মুহূর্তের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছে। হয় এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি ঘটবে। অথবা আরও গহিন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে দেশ। দেশজুড়ে এখন নিত্যনতুন গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে। এই গুঞ্জনের পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে জামায়াতের একটি সমাবেশ। এই সমাবেশকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, চরম দমন নিপীড়নের মুখে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের আপস হয়েছে কিনা। 

যদি এমনটি হয়ে থাকে তবে জামায়াতের রাজনীতিতে এটা হবে আরেকটি ভুলের পালক। ঐতিহাসিকভাবেই ভুলের বৃত্ত থেকে দলটি কখনোই বের হতে পারেনি। শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়ার পর জামায়াত দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। ২০১৩ সালের পর প্রকাশ্যে সমাবেশ করতে পারেনি। সভা-সমাবেশ করা যে কারও গণতান্ত্রিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে জামায়াতেরও সভা-সমাবেশ করার অধিকার আছে। ফলে এটা তো বলাই যায়, দীর্ঘদিন জামায়াত গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। স্বভাবতই অস্তিত্ব বজায় রাখতে অনেকটা মরিয়া হয়েই চেষ্টা করছে জামায়াতে ইসলামী।

কিন্তু এই মুহূর্তে সরকারের অনুমতি নিয়ে সমাবেশ করা জামায়াতের গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে কিনা কিংবা এর মাধ্যমে দলটির অস্তিত্ব রক্ষা হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরং জামায়াতের এই সমাবেশ আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেবে বলেই মনে করি। এ কারণেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, নতুন ভিসানীতি এবং সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ এখন চাপের মুখে আছে। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তির মধ্যে সময় অতিবাহিত করছে। ভূরাজনৈতিক কারণে বহির্বিশ্বের চাপ ছাড়াও ডলার সংকট, বেপরোয়া দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বিদ্যুৎ খাতের অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ সব কিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগের এখন দিশেহারা অবস্থা।

রাজনীতি ও অর্থনীতির মাঠের এই দিশেহারা অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বা পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের এখন নতুন মিত্র দরকার। সরাসরি মিত্র হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং বিপরীত মেরুর হলে ভালো হয়। ১৪ দলের মিত্রদের দিয়ে এই সংকট আওয়ামী লীগের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব না। রাজনৈতিকভাবে সুষ্ঠু ও সমঅধিকারের পরিবেশ বজায় রাখতে হলে বিরোধী পক্ষের কিছু রাজনৈতিক দলের সহায়তার প্রয়োজন আওয়ামী লীগের। তাই রাজনীতির মাঠে এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি দরকার, যারা কট্টর আওয়ামী বিরোধী বলে পরিচিত কিন্তু নখদন্তহীন। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের পছন্দ হতে পারে ইসলামপন্থি দলগুলো। কথিত আছে, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন অনেকদিন ধরেই সরকারের ছত্রছায়ায় সভা-সমাবেশ করছে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতের এই সমাবেশকে দুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, সরকারের সঙ্গে জামায়াতের কিছু কিছু শর্তের ভিত্তিতে এক ধরনের সমঝোতা হতে পারে। কী সেই সমঝোতার বিষয়বস্তু? প্রথম শর্ত হতে পারে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়া। জামায়াতের নিবন্ধনের বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। তাই নিবন্ধন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জামায়াতকে দিয়ে কিছু লোক দেখানো কর্মসূচি পালন করাতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া। বিএনপির বিকল্প হিসাবে জামায়াতকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখানো। আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল না এলে জামায়াতকে কিছু আসনে ছাড় দেওয়া, জেলবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি দেওয়া। এ ধরনের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে জামায়াতকে মাঠে নামানো। এর আগেও এমনটা হয়েছে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে না যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপি অনঢ় থাকলেও শেষ পর্যন্ত যেতে বাধ্য হয়। মূলত জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর কৌশল ও চাপের মুখেই বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তখনো জামায়াতকে বিএনপির বিকল্প হিসেবে  জায়গা দেওয়ার মুলা ঝোলানো হয়েছিল। এরপর কী হয়েছে এটা জানা। কিন্তু মনে হয় না জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার অভ্যাস আছে। ইতিহাসের দায় শোধের বোধও দলটি মধ্যে অনুপস্থিত। জামায়াত বরাবরই আওয়ামী লীগের কাছ থেকে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পেতে চায়। এ কারণেই সম্ভবত ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি রাজনীতি করেছে জামায়াত। তবে এবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা আঁতাত হয়ে থাকলে জামাতায় তথ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রকাশ করে দিতে পারে। সভা-সমাবেশ করার থেকে এটা করে বেশি লাভবান হবে জামায়াত।

এটা না করে সভা-সমাবেশের চেষ্টা করা জামায়াতের জন্য হবে অসময়ে মাঠে নামা। অসময়ে এ জন্য বলা যে, জামায়াতসহ ইসলামপন্থিদের এ সময়ে মাঠে নামাতে পারলে আওয়ামী লীগই লাভবান হবে। একদিকে তারা আমাদের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিদেশিদের কাছে তুলে ধরতে পারবে মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের কথা। তারা বারবার বলবে জামায়াতে ইসলামীর মতো যুদ্ধাপরাধীদের দলকে আমরা নির্বিঘ্নে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছি। একই সঙ্গে আবার ইসলামপন্থিদের উত্থান সম্পর্কে পশ্চিমাদের সতর্ক করে দেওয়া যাবে। ইতিমধ্যেই ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বিগত সময়ে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে বিশাল বিশাল সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশ থেকে সরকারবিরোধী কড়া কড়া বক্তব্যও দিয়েছে। আওয়ামী লীগ মূলত এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের বন্দোবস্ত করেছে চাপের মুখে থাকা ইসলামপন্থি দলগুলোকে দিয়ে।

সভা-সমাবেশ করা নিয়ে জামায়াতের কৌশল হতে পারে আওয়ামী লীগের ওপর চাপকে ব্যবহার করে রাজনীতির ময়দানে পুনরায় ফিরে আসা। এখন যেহেতু আওয়ামী লীগকে রাজনীতির স্বাভাবিক পরিবেশ প্রমাণ করতে হবে, তাই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া। কিন্তু এভাবেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী বারবার ভুল কৌশল অবলম্বন করছে। ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮ সালে জামায়াতের অবস্থান ও কৌশল ছিল ভুল। এ সময়ে জামায়াত ইতিহাস, সময় ও জনদাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এবারও যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে গিয়ে অযথাই মাঠ গরমের  চেষ্টা করে তবে আবারও ভুল করবে জামায়াতে ইসলামী। এখন দলটির পক্ষে শক্তি দেখানো বা মাঠ দখলের সময় না। দেশের রাজনীতি এখন যুগসন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হয়েছে। রাজনীতি বা যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকতে হলে কখনো কখনো কয়েক কদম  পেছাতে হয়। সার্বিকভাবে বিবেচনা করে জামায়াতে ইসলামকে এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। মাঠের রাজনীতি না করেও অনেক সময় গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করা যায়। ঘরোয়া রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুডকে জামায়াতের লোকজন ইসলামি আন্দোলনের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে। হালে তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সঙ্গে জামায়াতের ভালো সম্পর্কের কথা শোনা যায়। তুরস্কে এরদোয়ান জনপ্রিয় নেতা। একে পার্টি গত দুই দশক ধরে ক্ষমতায় আছে। মিসরেও ভিন্ন নামে নির্বাচন করে মুহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, মরক্কো বা আরবের অন্যান্য দেশেও ইখওয়ান প্রভাবিত দলগুলোর ভালো অবস্থান আছে। এই দলগুলোও বিভিন্ন সময়ে চাপের মুখে ঘরোয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু যখনই সুযোগ পেয়েছে রাজনীতিতে ফিরে এসে নিজেদের শক্তি জানান দিয়েছে। মিসর ও তিউনিশিয়াতে সরকার গঠন করেছে। তুরস্কে ওরাই এখন ক্ষমতায় আছে। আরবে ইখওয়ান প্রভাবিত দলগুলো জাতীয়তাবাদী ও পশ্চিমা বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত। ওই সব দেশের সঙ্গে তুলনা করলে জামায়াতে ইসলামী দার্শনিক ও আদর্শিক জায়গা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। জামায়াত ভোটের হিসাবের একদম তলানিতে অবস্থান করছে। ৫ শতাংশের নিচে বা এর আশপাশেই জামায়াত অবস্থান করে। এর কারণ হচ্ছে জামায়াতের অসময়ে ভুলনীতির অবলম্বন।

রাজনীতিতে সময়ের হিসাব খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক দল হিসাবে টিকে থাকতে হলে বুঝতে হবে কোন সময়ে কোন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ঠিক এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যাওয়া বা অযথাই সভা-সমাবেশ করে মাঠ গরম করা মানে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন এ দেশে আর সম্ভব না। একচেটিয়া নির্বাচন যেহেতু হচ্ছে না তাই কোনো ধরনের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ তৈরি করে দিলে ভবিষ্যতে গণদুশমন বলে পরিচিতি পাবে যেকোনো দল। এটা জামায়াতের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এক সময়। স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির পাশাপাশি গণদুশমনের তকমা জামায়াতের পক্ষে বহন করা আর সম্ভব না।

লেখক: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত