গত মাসের শুরুর দিকের কথা। সেদিন ছিল রবিবার। দুপুর ১টা। প্রতিদিনের মতো সম্পাদকীয় মিটিং। সহকর্মীসহ সম্পাদকের রুমে। শুরু হলো কথা বলা। উপসম্পাদকীয় এবং সম্পাদকীয় চূড়ান্ত হলো। এরপর কথা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন বললেন একটা বিষয় শুরু করলে কেমন হয়? আমরা বললাম কী!
তিনি বললেন যদি আমাদের ‘চিন্তা’ পাতায় ষাট-সত্তর দশকের জনপ্রিয় কলাম লেখকদের কলামগুলো রিপ্রিন্ট করি, তাহলে কেমন হয়? আমরা চমকে উঠলাম! বললাম দারুণ হবে। এ সময়ের কলাম লেখক এবং সাংবাদিকরাও তাতে উপকৃত হবেন। তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। এরপর বললেন তাইলে আপনি লেখাগুলো সংগ্রহ করার দায়িত্ব নেন! তখনই বললাম এ বিষয়ে পিআইবির মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ সম্ভবত সহযোগিতা করতে পারবেন। তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কলামগুলো সংগ্রহের কথা বললেন।
মঙ্গলবার এ বিষয়ে কিছু ভাবলাম। পিআইবিতে যাওয়ার আগে গেলাম দৈনিক সংবাদে। পুরানা পল্টনের সেই অফিসে। সেখানে যাওয়ার পর জানা গেল, সাধারণের জন্য কোনো পত্রিকা সংগ্রহে নেই। পুরনো সব পত্রিকা মালিকপক্ষের কাছে। এরপর সেখান থেকে পিআইবি। দেখা হলো, মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদের সঙ্গে। তিনি অসম্ভব সমাদর করলেন। শুনলেন প্রয়োজনের কথা। বললেন আমাদের এখানে আছে। তবে সেটা ১৯৮৩ সাল থেকে। এর আগের পত্রিকা দরকার হলে বাংলা একাডেমি বা আর্কাইভে যেতে হবে। পরদিন মিটিংয়ে বিষয়টি সম্পাদককে জানালাম। তিনি বললেন এখন কী করবেন? বাংলা একাডেমির কথা বলা হলো। তিনি মাথা নাড়লেন।
পরদিন প্রধান ফটোসাংবাদিক শাহাদাৎ পারভেজের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলো। তিনি অসম্ভব উৎসাহ নিয়ে বললেন কোনো সমস্যা নেই। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমিতে আমি আপনার সঙ্গে যাব। পরদিন দুপুরে শাহাদাৎ পারভেজকে ফোন করা হলো। জানালেন, এই মুহূর্তে তিনি বাংলা একাডেমিতেই আছেন। তাড়াতাড়ি যেন যাই। একাডেমির লাইব্রেরিতে ছিলেন তিনি। বললেন এই রুমে পাওয়া যাবে না। ওটা আরেক বিল্ডিংয়ে।
পাশেই স্যাঁতসেঁতে একটি বিল্ডিং। নাকে আসছে বাজে গন্ধ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে গেলাম আমরা। পারভেজ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সব বললেন। তিনি জানালেন এখন তো সময় নেই। ৩টার সময় বন্ধ হয়ে যাবে। বাকি আছে ১০ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে কতটুকু কী করবেন? বললাম সমস্যা নেই। আগে বলেন আপনাদের সংগ্রহে দৈনিক ইত্তেফাক কত সাল থেকে আছে? তিনি বললেন ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। তিনি দ্রুত সেই ফাইল বের করলেন। বললেন পৃষ্ঠাগুলো খুব নরম। পানি দিয়ে কোনোভাবেই পাতা উল্টানো যাবে না।
পত্রিকা উল্টাতেই পাওয়া গেল ভীমরুলের মিঠে-কড়া! পর দিনের পত্রিকায় মোসাফিরের রাজনৈতিক মঞ্চ। শাহাদাৎ একের পর এক লেখার ছবি তুলছেন। এভাবে অনেকগুলো। ততক্ষণে সময় শেষ। আমাদের বলা হলো পরদিন সকালে আসার জন্য। সেই কলামগুলো অনেক যত্নে, ফটোশপে নিয়ে সাইজ করলেন শাহাদাৎ। এরপর দেওয়া হলো আমাদের কাছে। সেখান থেকে পাঠানো হলো কম্পিউটারে।
লেটার ব্লকে ছাপা সেই সময়ের ইত্তেফাক নিয়ে কিছু বলা দরকার। ৪ পৃষ্ঠার পত্রিকার মাস্টহেডে রয়েছে ২টি তারিখ। বামে যেদিন পত্রিকা ছাপা হচ্ছে, সেইদিন দেওয়া। ডানে দেওয়া পরদিনের তারিখ। বোঝা গেল, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন ছিল? কারণ নির্ধারিত দিনে পত্রিকা পেতেন শুধু ঢাকার পাঠক। সারাদেশের পাঠক পেতেন পরদিন। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সেই সময়ের কলামে কোনো শিরোনাম ছিল না! শুধু একটি মোটিভ আর ছদ্মনাম!
মূলত যে কারণে দেশ রূপান্তরের এই উদ্যোগ, তা হচ্ছে ক্ষুরধার লেখার সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ স্থাপন। একই সঙ্গে সাংবাদিক এবং পাঠকদের মধ্যে একটি গঠনমূলক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। তাদের মধ্যে এমনও চিন্তার উন্মেষ ঘটতে পারে লেখার চাতুর্য এবং কীভাবে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানকে মিশিয়ে ভয়ংকর শব্দবাণে অত্যাচারীকে আঘাত করতে হয়! আজও ভাবতে অবাক লাগে, শিরোনামহীন এই লেখাগুলোই কাঁপিয়ে দিয়েছিল স্বৈরশাসকের ভিত।
সাংবাদিকতা জীবনের ৩৪ বছরে মনে পড়ে না, জাতীয় কোনো পত্রিকায় এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময়ের পাঠক ও তরুণ সাংবাদিকরা যদি তাদের কলামগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন তবেই আমাদের চেষ্টা সার্থক হবে। একই সঙ্গে প্যারাসাইট কলাম লেখার ঢেউ, উল্টে যেতে পারে। কলাম লিখতে হলে পড়াশোনা এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে ধারণা রেখে, প্রখর চিন্তা নিয়ে শব্দবাণ ছুড়ে দিতে কজন কলাম লেখক পারেন! যিনি পারেন, তিনি এবং তার লেখা পায় অমরত্বের ছোঁয়া। এ সময়েও কিছু উপসম্পাদকীয় লেখক বেড়ে উঠেছেন, তুখোর চিন্তাশক্তি আর শব্দের চাতুর্য নিয়ে এটিই আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া।
লেখক : সাংবাদিক