যৌবনে ইসলাম পালন

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩, ১০:৩৮ পিএম

পৃথিবী যত দিন থাকবে, ধর্মও তত দিন থাকবে বরং পৃথিবীর পরে পরকালেও ধর্মানুসারেই মানুষের বিচার হবে। মানুষ ও মানুষের যৌবন আসবে-যাবে কিন্তু ধর্মের আদর্শ নিয়মনীতি থেকে যাবে। তাই ধর্ম যেখানে, যৌবনও সেখানে। ধর্ম যখন কারও যৌবনকে পরিচালিত করে, তা হয় স্থায়ী ও সমাদৃত। ধর্ম হচ্ছে বীজ বা গাছের মতো, যৌবন তার ডালপালা। এই বীজ কোনো যুবকের যৌবনে একবার প্রবেশ করানো গেলে সেখান থেকে পাতা-পল্লব বের হবে, তার ফলও ধরবে। বিষয়টি কোরআন মাজিদের হাফেজদের দিকে তাকালে বোঝা যায়। তাদের কিশোরকালে না বুঝেই মুখস্থ করতে দেওয়া হয়, তা সারাজীবন তাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে।

মানুষ এমন এক জীব, প্রথম জীবনে যা কিছু মেধায় প্রবেশ করায় তা স্থির চিত্রে থেকে যায়। বুঝে হোক, অবুঝে হোক, জীবনের প্রথম সবকিছু মনের স্পটে ভেসে থাকে। কিন্তু যৌবনে এসে তার অর্থ ও মর্ম উদ্ঘাটনের পর একটা ব্যাকুলতা লক্ষ করা যায়। তাই যৌবনের প্রথম সময়টি হোক ইসলাম ধর্মে নিবেদিত। ইসলাম মনে করে, কারও যৌবন যখন শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে নির্মিত হয় তখন তার মনের যৌবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়নীতি, সত্যবাদিতা ও সেবামূলক জীবন। সমাজে এই যৌবনের চাহিদা হয় স্থায়ী। তাই নবী করিম (সা.)-এর যৌবনকালের আল আমিন উপাধিই তাকে বিশ্বের সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহামানবে পৌঁছে দিয়েছে। তার জীবন গঠিত হয়েছে তাৎপর্যমণ্ডিত ও চির যৌবনের।

আমরা জানি, নবী করিম (সা.) যে ধর্ম নিয়ে এলেন তা পুরাতন অপরিপক্ব ঘুণে ধরা সমাজকে ভেঙে নতুন আঙ্গিকে নতুন করে সুন্দর ও স্থায়ী যুবসমাজের রূপরেখা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাই সময়ের সুন্দর ও সার্থক প্রচেষ্টায় জীবন-যৌবনকে সফল করে তোলাই সময়ের দাবি। যৌবনের ধর্ম হলো যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া, যখন যিনি প্রভাব খাটাতে পারেন তখন তার যৌবন। এর সঙ্গে যোগ হয় ক্ষমতার। ক্ষমতা থাকলে অবয়সেও যৌবন এসে ধরা দেয়। রাজনৈতিক কর্তাদের কথাই বলি, যার হাতে ক্ষমতা ও প্রশাসন থাকে তখন তার বয়স যতই হোক না কেন তার সময় কিন্তু যৌবনের। তিনি ইচ্ছা করলে অনেক ভালো দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে সরকারি জায়গা দখল করে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ, সম্পদের পাহাড় গড়ে নিজেও উঁচুস্থান অর্জন করতে পারেন। যাকে ইচ্ছা তাকে শাসানো, মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে বছরের পর বছর আটকে রাখতে পারেন। এমনকি নিজের কাজের সামনে কাউকে বাধা মনে করলে তখন সময়ের কাজ সময়ে করে নেন, সেটাই হয়ে ওঠে সময়ের যৌবন।

মানুষের বয়সের যৌবনটাই শিক্ষা ক্ষেত্র। যৌবনে জ্ঞানার্জনের পিপাসা থাকে, কঠোর পরিশ্রম করা যায়। যৌবনের সঠিক শিক্ষা মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে বের করে আনে। যৌবনের শিক্ষায় নীতিবান উদ্যোগী তৈরি করে। সে শিক্ষায় যুবসমাজের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি ও সুসম উন্নয়ন হয়। এখন যুবকরা শুধু ঘরের খবর রাখলেই চলবে না, বিশ্বের প্রতিটি মানবের প্রত্যেকটি পদক্ষেপের সঙ্গেই নিজের পরিচয় রাখতে হবে। নিজের স্বার্থে সবার স্বার্থে থাকতে হবে সদা জাগ্রত ও সতর্ক। যুবকদের লক্ষ্যমাত্রা শুধু কাগজের সনদ, স্বীকৃতি, উন্নত জীবন আর পুরস্কারের দিকে থাকলে হবে না, আধুনিক মন-মানসিকতায় ধর্মীয় চেতনায় বিশ্ববিজয়ী হতে হবে। থাকতে হবে উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী শক্তি, কর্মের দৃঢ়তা, অনড় মনোবল, কর্মী চালানোর দক্ষতা, সদাচরণ ও চিন্তাশক্তি।

‘জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশেও যাও’ কথাটি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন। কথাটি আমরা জ্ঞানার্জনের পথে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমরা প্রায়ই বলি। কী আশ্চর্যের বিষয়! দেড় হাজার বছর আগে বলা কথাগুলো এখনো গবেষণার মতো। বর্তমানে চীন কীভাবে সারা পৃথিবীর কর্র্তৃত্ব নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তা করে। কীভাবে সুকৌশলে সামান্য কর্মের মধ্য দিয়ে কোনো দেশে ঢুকে তারপর সেই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সম্প্রতি তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য বিভিন্ন দেশে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ হাজার বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের কর্মের গুরুত্ব দিয়ে গেলেন। এমনকি সেখানে গিয়ে হলেও শিক্ষা অর্জনের কথা বলে গেলেন। এর মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের পথে কষ্ট, দূরে অবস্থানসহ নানা বিষয় যেমন আলোচনার দাবি রাখে, তেমনি শুধু চীনের বিষয়, প্রভাব, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা-গবেষণা হতে পারে।

যৌবনের শিক্ষা হলো, গবেষণা করে তাৎপর্য উদ্ঘাটন করা। এর একটি উদাহরণ হতে পারে এমন প্রত্যেক নবী-রাসুলকে আল্লাহতায়ালা পরীক্ষা করেছেন যৌবনকালেই। বস্তুত যুবকদের ত্যাগ আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। আর আল্লাহতায়ালা বলেই দিয়েছেন পছন্দের বান্দাদের পরীক্ষা করা ছাড়া সফলতা দেবেন না। যৌবনকাল হচ্ছে, পরীক্ষার সময়। এ সময়টিকে যে কাজে লাগাবে সে উন্নতি করতে পারবে। যে এ সময়কে হেলাখেলায় নষ্ট করবে, সে জীবনে কোনো উন্নতি করতে পারবে না। কারণ, মানুষের যৌবনকাল, দুটি দুর্বলতা বাল্যকাল ও বার্ধক্যকালের মধ্যে একটি শক্তি। সুতরাং এ সময়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া ও কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। এ কারণেই হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‌আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের পূর্বে সুবর্ণ সুযোগ মনে করো। তোমার যৌবনকে কাজে লাগাও বার্ধক্য আসার পূর্বে, সুস্থতাকে কাজে লাগাও অসুস্থতার পূর্বে, সচ্ছলতাকে কাজে লাগাও অসচ্ছলতার পূর্বে, অবসরকে কাজে লাগাও ব্যস্ততার পূর্বে, আর তোমার জীবনকে কাজে লাগাও মৃত্যু আসার পূর্বে।’ মুসতাদরাকে হাকিম : ৭৮৪৬

যৌবন মানুষের জীবনে একবারই আসে, বারবার আসে না। একবার চলে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসবে না। যৌবনের সময়কে কাজে না লাগিয়ে অবহেলায় নষ্ট করলে, যেমন দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে অনুরূপভাবে আখিরাতে আল্লাহর কাছে তার জবাবদিহি করতে হবে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া, কোনো আদম সন্তান আল্লাহর সামনে থেকে পা সরাতে পারবে না। তার জীবনকে কোথায় ব্যয় করেছে। যৌবনকে কোথায় ক্ষয় করেছে, সম্পদ কোথায় থেকে অর্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করছে। আর যা জেনেছে, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করছে।’ জামে তিরমিজি : ২৪১৬

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত