‘অনুমতির’ কাফকায়েস্ক

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:৩২ এএম

আমাদের যাপিত সময়কে বিশেষ করে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ‘কাফকায়েস্ক’ শব্দটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এর আগে, ফ্রানৎস কাফকার নামে প্রচলিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। একবার সরকারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সভায় কাফকাকে আমন্ত্রণ জানাতে এলো কিছু লোক। কাফকা তাদের কাছে জানতে চাইলেন এই সভার অনুমতি সরকার দিয়েছে কি না। আয়োজকরা জানালেন যে হ্যাঁ তারা অনুমতি পেয়েছেন। কাফকা তখন আয়োজকদের বললেন, সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভার আয়োজনে সরকারই অনুমতি দেয়, সেটা তো আপনারা যে ঘটনার প্রতিবাদ জানাবেন তার চেয়েও বড় অপরাধ। গল্প অনুযায়ী কাফকা সেই আয়োজনে যাননি। এটা কাফকাকে নিয়ে একটি চালু গল্প। তবে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই শোনা গল্পটির ‘কাফকায়েস্ক’ বাস্তবতা রয়েছে। কাফকার গল্প-উপন্যাসে যে অসহনীয়, কঠিন বাস্তবতার অমীমাংসিত নিয়তিজাত পরিস্থিতি তাকে বোঝাতে ‘কাফকায়েস্ক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনেকটা যেন আমরা বাস করছি কাফকার বাস্তবতায়। ‘কাফকায়েস্ক’ শব্দের অর্থ করা যেতে পারে অর্থহীন, বিভ্রান্তিকর, ভীতিকর জটিলতা অথবা পরাবাস্তব বিকৃতিতে ভরা নৈরাজ্যের বোধ-জাগানো অনুভূতি কিংবা দুঃস্বপ্নপীড়িত রকমের উদ্ভট কিছু। প্রতিটা শব্দই চারপাশের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে আপনি মেলাতে পারবেন।

শুরুতে কাফকার নামে শোনা গল্পটির কথাই ধরা যাক। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, কর্মসূচিতে পুলিশের অনুমতির বিষয়টি আমাদের এখানে হালে বেশ আলোচনায় আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদের ৩৭ ধারায় বলা হয়েছে ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ কাজেই, যে কোনো দল বা মতের যে কোনো লোকের সভা-সমাবেশ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে যে, এই সভা সমাবেশে কোনো ভায়োলেন্স হয় কি না।

সরকারের জাতীয় জরুরি সেবা ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল করা যাবে। এ জন্য শুধু মহানগরীতে পুলিশ কমিশনার আর জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারের কাছে একটা আবেদন করতে হবে। অনুমতি পেলে দু-চার দিন পর্যন্ত পুলিশ নিরাপত্তা দেবে। সাম্প্রতিককালে আমরা দেখে আসছি, কেউ, বিশেষ করে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করার জন্য পুলিশের অনুমতি চাইলে তারা অযাচিত শর্তারোপ করে এবং কোনো কারণ ছাড়াই সভা-সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ ও জননিরাপত্তার কথাও জানায় পুলিশ। ফলে এই অনুমতির বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

সংবিধান ও ওয়েবসাইটে সভা-সমাবেশের অনুমতি ও তাতে অংশ নেওয়া যত সহজ হিসেবে দেখাচ্ছে, আসলে তা নয়। গত ১৫ বছর সভা-সমাবেশে বিরোধীদের সরকার দাঁড়াতেই দেয়নি। সভা-সমাবেশের অনুমতি পেলেও কৌশলে তা পণ্ড করেছে। হয় সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী, নইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন ও সমমনা সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশ করার অভিজ্ঞতা এর বিপরীত। এক্ষেত্রে পুলিশি আবেদন, অনুমতি এবং শর্তের কোনো আলাপই ছিল না। ঢাকা মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পুলিশ কমিশনার জনসাধারণের শান্তি বা নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যখনই প্রয়োজন মনে করবেন এবং যে সময়ের জন্য প্রয়োজন মনে করবেন, তখনই জনসমক্ষে উচ্চৈঃস্বরে বক্তৃতা দেওয়া, ব্যঙ্গসূচক অঙ্গভঙ্গি করা, ছবি, প্রতীক, প্ল্যাকার্ড বা এমন অন্য বস্তু বা মালামাল প্রস্তুত, প্রদর্শন বা বিতরণ করা, যা তার বিবেচনায় শালীনতা বা নৈতিকতার পক্ষে ক্ষতিকর অথবা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত হয়, সেগুলো নিষিদ্ধ করতে পারেন।

এখানে ‘অনুমতি’ শব্দটির ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। অনুমতি নিয়ে সভা-সমাবেশ করতে হবে কেন, এই প্রশ্নও উঠছে। কারণ অনুমতি শব্দটির ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকারের চেয়ে কর্তৃপক্ষ বেশি প্রকট থাকে। বরং আয়োজকরা সভা-সমাবেশের কথা কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে পারে, যেন আয়োজনটি নির্বিঘ্ন হয়। 

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে সভা-সমাবেশের কতগুলো আবেদন জমা পড়ে এবং কতগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়, তার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সবশেষ গত বছরের ২ ডিসেম্বর অনুমতি ছাড়া ঢাকা মহানগরীতে যেকোনো ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ডিএমপি। অনুমতি ছাড়া কেউ সভা-সমাবেশ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পুলিশের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তর সমালোচনাও হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর জন্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দায়ী। তারা ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার কথাও বলছেন।

গত এক যুগে সভা-সমাবেশ করেছে কিংবা করার চেষ্টা করেছে এমন রাজনৈতিক দলগুলো হলো আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ভোটের হিসাবে তৃতীয় স্থানে থাকা চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো। দেখা যাচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নানা রকম পুলিশি নিষেধাজ্ঞা, অধ্যাদেশের ফলে তাদের কর্মসূচি পালনে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে আসছে। অন্যদিকে তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলন এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা এখনো পায়নি যে অনুমতি ছাড়া তারা রাজপথে নামবে। গত এক যুগে তিন থেকে চারটি স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ হয়েছে ঢাকায়। এসব আয়োজনে অনুমতির প্রসঙ্গ আলোচনাতেই আসেনি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চ টানা তিন মাস সমাবেশ করে। এ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরে একই বছর ৫ মে সমাবেশ ডাকে, যা পরে সহিংসতায় গড়ায়। ২০১৫ সালে অতিরিক্ত ভ্যাট বাতিলের দাবিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘নো ভ্যাট’ আন্দোলন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং ওই একই বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন ছিল উল্লেখ করার মতো ঘটনা। এ আন্দোলনগুলোর সূত্রপাত হয় প্রতিবাদী স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ থেকে। অনুমতি নিয়ে, কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে যা সম্ভবই হতো না। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার প্রসঙ্গ উল্লেখ না করেই ‘আরব বসন্তের’ কথা স্মরণ করা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতনের ঘটনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। জিল স্কট হেরনের ‘বিপ্লব টিভিতে দেখাইব না’ গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে ‘বিপ্লব টিভিতেও দেখাইব না, অনুষ্ঠিতও হইব না/ প্রচারিতও হইব না, সম্প্রচারিত ভি হইব না/ বিপ্লব কখনোই পুনঃপ্রচারিত হইব না, ভাইজান/ বিপ্লব হইব এক্কেরে সামনাসামনি-জ্যাতা-জিন্দা-টাটকা-গরমাগরম।’ (তর্জমা: নাসিফ আমিন) রাজনৈতিক দলগুলো গত ১৫ বছরে কতগুলো সভা-সমাবেশ করেছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধীরা সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বলছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীনরা বলছে সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। এই ‘কাফকায়েস্ক’ পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠ গরম হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বক্তব্য জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য জনসভার আয়োজন করে থাকে। এসব জনসভায় যারা যোগদান করে তাদের অনেককে দেখা যায় শোভাযাত্রার মাধ্যমে জনসভার স্থলে উপস্থিত হয়। আমাদের দেশে যেভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত উন্মুক্ত স্থান, সড়ক অবরোধপূর্বক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্র্তৃক জনসভার আয়োজন করা হয় পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে এভাবে জনসভা অনুষ্ঠিত হয় না। সভা-সমাবেশ আয়োজনে পুলিশের অনুমতি না পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই জনদুর্ভোগ, জননিরাপত্তার কথার এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মসূচির চরিত্র বদলের কথা ভাবতে হবে। না হলে তাদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া, সংগ্রাম, আন্দোলনের চেয়ে পুলিশের অনুমতি পাওয়া না পাওয়ার টানাপড়েনের মধ্যেই অনেকটা শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। আর সেই কাক্সিক্ষত স্বতঃস্ফূর্ততা পেলে আন্দোলন তো আটকে থাকবে না, অনুমতি ছাড়াই জনতা তার রাজপথ দখল নেবে। স্বতঃস্ফূর্ততার অনুমতি লাগে না।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত