সংঘাত নয় সংলাপেই সমাধান

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৩, ১০:২৮ পিএম

বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দ্বিদলীয়। একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি। বাকি দলগুলো নিজ নিজ সুবিধামতো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ছায়াতলে থাকে। দুদলের মধ্যে ব্যবধানও আকাশ-পাতাল। আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের আকাক্সক্ষা থেকেই বিএনপির জন্ম। দুদলের আদর্শিক ব্যবধানও সুস্পষ্ট। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলে। স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার দায় বিএনপির। আদর্শিক ব্যবধান আকাশ-পাতাল হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোটের ব্যবধান খ্বু বেশি নয়। এই দ্বিদলীয় রাজনীতি বাংলাদেশে একধরনের ভারসাম্য এনেছিল।

কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে সে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আর টানা ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া। আর যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় ফিরতে চায় বিএনপি। দুদলের এই মরিয়া চাওয়া রাজনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। দুদলই পয়েন্ট অব নো রিটার্নে অবস্থান করছে। বিএনপি এতদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছিল। কিন্তু এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে সরকার পতনের একদফা নিয়ে মাঠে নেমেছে। বিএনপির পাশাপাশি মাঠে আছে আওয়ামী লীগও। তাদেরও এক দফা সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন। দুদলের একদফার ফারাকটা এত বেশি, রেললাইন বহে সমান্তরাল, কখনোই যেন মিলবে না।

আমরা পছন্দ করি আর না করি, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশের ভেতরের চেয়ে বাইরের লোকের মাথাব্যথা বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি করছে। র‌্যাবের কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি ঘোষণা করেছে এবং তার কিছুটা কার্যকরও করেছে। ভিসানীতির পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশেরও নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। বিএনপি এখন নির্বিঘেœ তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে। বিএনপির কর্মসূচির দিনে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগও মাঠে থাকছে। মার্কিন ভিসানীতি সরকারি ও বিরোধী দলের জন্যই প্রযোজ্য। হয়তো সে কারণেই দুদলই এখন অনেক সংযত। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে বিএনপি আন্দোলনের নামে যে নৃশংসতা চালিয়েছে, চাইলেও তার পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই তাদের সামনে।

আবার এখন যে স্টাইলে আন্দোলন করছে, তাতে সরকারের পতন ঘটানোর মতো পরিস্থিতি নেই দেশে। আবার আওয়ামী লীগও আগের মতো দমন-পীড়ন করে বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে পারবে না। এখন যে অবস্থা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে বিএনপি সরকার পতনের দাবিও আদায় করতে পারবে না, আবার বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনেও যাবে না। কিন্তু টানা ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষে আরও একটি নির্বাচন বর্জন করে নেতাকর্মীদের ধরে রাখার সক্ষমতা আছে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আবার আওয়ামী লীগের পক্ষেও বিএনপিকে ছাড়া আরও একটি একতরফা নির্বাচনের দায় কাঁধে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা আছে কি না, সেটাও বড় বিবেচনা। একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাক্সক্ষা জনগণের, এটা নিশ্চিত করার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু দুদলের অনড় অবস্থানের কারণে সে আশা সুদূর পরাহত।

সম্প্রতি রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছে সংলাপ প্রসঙ্গ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রাক-নির্বাচনী দল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সফরকালে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের এই সফরে মূল ফোকাস ছিলÑ সংলাপ। তারা বারবার জানতে চেয়েছেন, সংলাপ সম্ভব কি না। মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বৈঠকে আলোচনার মধ্যে বিএনপির দাবির বিষয়টি এসেছে। তারা বলেছে, কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? আমরা বলেছি, কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের জন্য স্পেস থাকতে হয়। সেই স্পেস বিএনপি রাখেনি, ব্লক করে দিয়েছে।’ ওবায়দুল কাদেরের অভিযোগ দৃশ্যত সত্যি মনে হতে পারে। কারণ যারা সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন করছে, তাদের অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ কোথায়। পরে বিএনপি নেতারাও বলেছেন, শুধু নির্বাচনকালীন সরকারের ইস্যুতেই তারা আলোচনা করতে পারেন।

ওবায়দুল কাদেরের কথাকে যদি সত্যি বলে ধরে নিই, বিএনপি স্পেস রাখেনি, ব্লক করে দিয়েছে। তাহলে সরকারি দল তো চাইলে স্পেস সৃষ্টি করতে পারে। ফেসবুকের ভাষায় যদি বলি, ব্লক করা গেলে, সেটা আনব্লক করারও উপায় আছে। প্রশ্ন হলো, আমরা আনব্লক করতে চাই কি না? আন্তরিকতা থাকলে স্পেস তৈরি করা সম্ভব, আনব্লক করা সম্ভব। কম্প্রোমাইজ, অ্যাডজাস্টমেন্ট সবই সম্ভব।

‘আপসহীন’ বিশেষণটি রাজনীতিতে ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আপসহীনতা সবসময় ইতিবাচক নয়। নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেও আপস করা যায়, সমঝোতা করা যায়। যে কোনো অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনা, সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দুপক্ষকে অনড় মনে হলেও নিজ নিজ অবস্থানে থেকে একটু একটু ছাড় দিলে এই অবস্থায়ও সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক সমঝোতা মানেই আদর্শিক ছাড় নয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কথা উঠেছিল। বিএনপি তখন সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচনে এলে আজকের বাংলাদেশের পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। বিএনপিকেও হয়তো এত লম্বা সময় ক্ষমতার বাইরে থাকতে হতো না। তারা যদি গোঁ ধরে থাকে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ছাড়া আলোচনা হবে না। তাহলে কখনোই আলোচনা হবে না। আলোচনার টেবিলে বসলে অনেক রকম সমাধানই আসতে পারে। এমনকি সংবিধানের আলোকেও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। যারা সংসদে আছেন, তাদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নেওয়া যায়, যারা নেই টেকনোক্র্যাট কোটায় তাদের মধ্য থেকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। আলোচনার টেবিলে বসলে সম্ভাবনার অনেক দুয়ারই খুলে যেতে পারে।

তবে এটা ঠিক, বাংলাদেশে সংলাপের অতীত ভালো নয়। আব্দুল জলিল আর মান্নান ভুইয়ার মধ্যকার ব্যর্থ সংলাপের কথা আমরা জানি। অতীতে বিদেশি অনেক সম্মানিত অনেক ব্যক্তি এসেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন। আসল কথা হলো, আমি সমাধান চাই কি না। চাইলে খোলা মনে, শর্তহীনভাবে সংলাপে বসতে হবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসা বা ছাড় দেওয়াকেই পরাজয় মনে করেন। আর আলোচনার টেবিলে পরাজয় মানেই যেন নির্বাচনে পরাজয়। তাই কেউ আগে থেকে ছাড় দিতে চান না। 

দুদলের কাছেই যদি একটা প্রশ্ন করি, সংলাপ ছাড়া এই সংকট সমাধানের আর কোনো বিকল্প কি আপনাদের জানা আছে? আমি জানি, সংলাপে সমাধান না হলে সংঘাত আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যাদের জন্য রাজনীতি করেন বলে মুখে বলেন, সেই জনগণ কিন্তু সংঘাতময় পরিস্থিতি মেনে নেবে না। আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, তাতে রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় নেই। রাজনৈতিক সংঘাত অর্থনীতিকে আরও নাজুক করে তুলবে। তারচেয়ে বড় কথা হলো, দেশের মানুষকে পাত্তা না দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আপনারা ঠিকই পাত্তা দেন। তাদের কথা ভেবে হলেও সংলাপে বসুন। সংঘাতময় পরিস্থিতি হলে কিন্তু মার্কিন ভিসানীতি সরকারি-বিরোধী সবার জন্যই প্রযোজ্য হবে।

আপনারা যদি মানুষকে ভালোবাসেন, দেশকে ভালোবাসেন; তাহলে খোলা মনে আলোচনায় বসুন। একটা সুষ্ঠু, অবাধ, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের উপায় বের করুন। জনগণ ভোট দিয়ে ঠিক করবে, তারা ক্ষমতায় কাকে চায়?

লেখক: বার্তা প্রধান এটিএন নিউজ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত