প্রয়াণ দিবসে হুমায়ূন স্মরণ

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ১১:০১ পিএম

আজ বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস। প্রায় এক দশক তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রয়ে গেছেন পাঠক, ভক্ত, দর্শক আর প্রিয়জনের অন্তরে। তার প্রিয় চার অভিনয়শিল্পী স্মৃতিচারণ করেছেন। লিখেছেন আল মাসিদ

চরিত্রানুযায়ী অভিনেতা নিতেন

মুনমুন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। একে অপরের ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও আমরা দাওয়াত পেতাম। তাই কাজের সম্পর্কের বাইরেও আলাদা একটা সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি কাজের ক্ষেত্রে অন্য মানুষ হয়ে যেতেন। সেখানে শুধু কাজটাকেই বড় করে দেখতেন। শুধু পরিচিত বলেই যে একটি চরিত্রে কাউকে কাস্ট করবেন, সেটা তার ক্ষেত্রে হয়নি। যে চরিত্রে যাকে মানাবে তাকে দিয়েই অভিনয় করাতেন। আমি তার শেষ দুটি সিনেমায় কাজ করেছি। ‘আমার আছে জল’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমা দুটিতে তিনি আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। আমার নাচের ক্যারিয়ার অনেক দীর্ঘ হলেও অভিনয় করি খুব বেছে। তার মধ্যেও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ আমার অন্যতম প্রিয় কাজ। চরিত্রটিতে অভিনয়ের অনেক জায়গা ছিল। স্যার কারও অভিনয়, নাচ খুব পছন্দ করলেও সরাসরি বলতেন না। কাজের মাধ্যমে তা বুঝিয়ে দিতেন। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ করার সময় ঘেটু নাচের জন্য দারুণ সেট তৈরি করেছিলেন। আমার ইচ্ছে করছিল ওমন সুন্দর সেটে আমার নাচের কিছু কাজ করার। সেটা জানা মাত্রই তিনি আমাকে সেই সেট আমার নাচের রেকর্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেদিন বুঝেছিলাম তিনি আমার নাচ পছন্দ করেন।

বাসু চ্যাটার্জির পর তিনিই

ফেরদৌস আহমেদ

সত্যি বলতে হুমায়ূন স্যারের চলে যাওয়া আমি আজও মেনে নিতে পারিনি। আমি মাঝেমধ্যেই তার উপস্থিতি মিস করি। তার চলে যাওয়া অপরিসীম ক্ষতি। প্রতিটি বইমেলা আসে আর আমি ভাবি, এবারও স্যারের নতুন কোনো বই বের হবে না। তাকে ছাড়া বইমেলাকেই আমার কাছে সম্পূর্ণ লাগে। আজ আমরা করোনার মতো এই মহামারীর মুখোমুখি হয়েছি, স্যারের জীবদ্দশায় এমন ঘটনা ঘটলে তিনি সেটাকে কীভাবে বইয়ের পাতায় তুলে আনতেন না জানতে খুব ইচ্ছে করছে। তিনি হয়তো অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিস্থিতিকে দেখতেন। কিছুদিন আগে তার ‘এইসব দিনরাত্রি’ আর ‘বহুব্রীহি’ দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এত আধুনিক নাটকগুলো। ‘এসো’ নামের একটি নাটকের মাধ্যমে প্রথমে স্যারের নির্দেশনায় কাজ করি। আমি তখন চলচ্চিত্রের চাহিদাসম্পন্ন তারকা। তার পরও শুধু স্যারের কথা ভেবে কাজটি করেছিলাম। আর কখনো নাটক করিনি। এরপরই তিনি আমাকে ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমায় আমাকে সুযোগ দেন। তখন অনেকেই স্যারকে বলছিল, আমাকে গ্রামের ছেলের চরিত্রে মানাবে না। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, গ্রামেও তো সুন্দর ছেলে থাকতে পারে। এই সিনেমা আমার সিনেমা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। পরে গল্পনির্ভর সিনেমা করে আমি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। বাসু চ্যাটার্জির পরে আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল হুমায়ূন স্যারের কাজগুলো। 

দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছিলেন

রিয়াজ আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা। কয়েক প্রজন্ম তার গুণমুগ্ধ ভক্ত। তবে আমার চোখে তিনি একজন অসাধারণ মমতাময় মানুষ। বাইরে থেকে বোঝা যেত না তার ভেতরটা কেমন। একটা শক্ত খোলস দিয়ে নিজেকে আবৃত করে রাখতে পছন্দ করতেন। আমার মনে হয়, আগামী ১০০ বছরেও তার মতো একজন সৃষ্টিশীল মানুষ জন্মাবে না। আমার সৌভাগ্য, তার নির্দেশনায় দারুণ কিছু কাজ করেছি। প্রথম যখন তার সঙ্গে সিনেমা করি তখন আমি বাণিজ্যিক সিনেমার তুমুল চাহিদাসম্পন্ন নায়ক। কিন্তু একই ধাঁচের সিনেমা করতে করতে ক্লান্ত লাগছিল। তিনি আমাকে দিয়ে নানা ধরনের চরিত্রে কাজ করিয়েছেন। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই বুঝেছি জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে কাজ করার মজাই আলাদা। সিনেমা নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছিল। তাই ক্যারিয়ারের ঝুলিতে কিছু ভালো কাজ রয়েছে আমার। এজন্য স্যারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

সিনেমায় হাতেখড়ি তার মাধ্যমেই

বিদ্যা সিনহা মিম

আমার ক্যারিয়ার হুমায়ূন আহমেদ স্যারের হাত ধরে শুরু। ২০০৭ সালে লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার হই এসএসসি পাস করার আগেই। ২০০৮ সালে অভিনয় শুরু করি তার ‘আমার আছে জল’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। তিনি আমাকে হাতে ধরে অভিনয় শিখিয়েছিলেন। কীভাবে একটি চরিত্রের মধ্যে ঢুকতে হয় শিখিয়েছিলেন। সিনেমাটিতে আমার সহশিল্পী ছিলেন জাহিদ হাসান, ফেরদৌস আহমেদ, মেহের আফরোজ শাওন, মুনমুন আহমেদ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনয়শিল্পীরা। তাদের সঙ্গে কাজ করেছিলাম বলেই বুঝতে শিখেছিলাম সিনেমায় আর্ট আর বাণিজ্য বলে কিছু নেই। যে গল্পটি ভালো, সে সিনেমাটিতেই আমি কাজ করতে চাই। এজন্যই হয়তো পরে ‘জোনাকীর আলো’র মতো সিনেমা করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। আমি প্রায়ই স্যারকে মিস করি। তখন খুব খারাপ লাগে। তিনি থাকলে অনেক ভালো কাজ আমরা পেতাম। তবে আমার মনে হয় তিনি যে নেই, এটা ঠিক নয়। তিনি তো আমার মতো কোটি ভক্তের হৃদয়ে বেঁচে আছেন তার লেখা, নাটক, সিনেমার মাধ্যমে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত