‘ওরা ১১ জন’ মুক্তির ৫০ বছর

মেলেনি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ০১:৪০ এএম

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ মুক্তির ৫০ বছরপূর্তি আজ। ঐতিহাসিক এই চলচ্চিত্রটির প্রযোজক নন্দিত চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’ নানা কারণেই এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য অনবদ্য। তবে দুঃখের বিষয় হলো- যে চলচ্চিত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল স্বরূপ, তার ভাগ্যে জোটেনি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এমনকি এর প্রযোজক, পরিচালক, অভিনয়শিল্পী কেউ কোনো সম্মাননা পাননি এই ৫০ বছরেও। ছবিটি যখন নির্মাণের কথা ভাবেন, সোহেল রানা তখন স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রস্থল বলে অভিহিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ছাত্র। সদ্য মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। সেখানে তখন আনাগোনা সব নামকরা ছাত্র রাজনীতিকের। নাম বললে সে তালিকা হবে দীর্ঘতর। সেখানে মাঝেমধ্যে আসতেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। সোহেল রানা জানান, প্রধানমন্ত্রী তার চেয়ে পড়াশুনার দিক দিয়ে এক ক্লাস জুনিয়র। সে সময় ইকবাল হলে ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। এক একজন তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তাতে উঠে আসে আলাদা শ্রেণি-পেশার মানুষের আলাদা আলাদা ত্যাগের গল্প। সেই গল্পগুলোকেই এক সুতায় গাঁথার জন্য ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণের কথা ভাবেন সোহেল রানা। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৭২ সালে আর কী গল্প মাথায় আসতে পারে? আমি তো সিনেমার মানুষ নই। তবে এর আগে গল্প লিখতাম, সিনেমা নিয়ে পড়াশুনা করতাম। চিত্রবাণীতে সিনেমা নিয়ে লেখালেখিও করতাম। একদিন হলের দারোয়ান বলল, ‘স্যার আপনারা তো অনেকে ফিরে এলেন। সব স্যার তো ফিরলেন না।’ কথাটা আমার মধ্যে দারুণভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখনই ভাবি, যারা আর ফিরলেন না, যারা এত ত্যাগের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীন করলেন তাদের এই গল্পগুলো মানুষকে জানানো উচিত। তখন শুধু একটা বিষয়ই মাথায় এসেছিল, তা হলো- মুক্তিযুদ্ধ যে হয়েছে সেটার প্রমাণ যেন থাকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এ থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সহায়তায় ছবিটি শেষ করি।’

আজ সেই ছবির রজতজয়ন্তী! বিষয়টি নিয়ে কী অনুভূতি জানতে চাইলে সোহেল রানা বলেন, ‘আমার সেভাবে কোনো অনুভূতি নেই। তবে এই ছবিটির জন্য আমি কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছি কি না সেটি যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলব না, আমি কিছুই পাইনি। এ নিয়ে আমি আগেও কয়েকবার কথা বলেছি। দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা এটি। সেই দিক থেকে হলেও তো চলচ্চিত্রের কেউ যদি স্বাধীনতা পদক পায় সেটি আমারই পাওয়ার কথা। কিন্তু আমি সেসব কিছু পাইনি। আমি একজন অভিনেতা হিসেবে, চলচ্চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পেয়েছি, এটুকুই। আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত শিল্পীদের চাওয়া-পাওয়া নিয়েও আমি কথা বলেছি। যেহেতু এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, তাই বিভিন্ন সরকারি ও সম্মানজনক আয়োজনে আমাদের অন্তত ভিআইপির মর্যাদা দেওয়া হোক- সেটি নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তেমন কোনো অগ্রগতি দেখিনি। তবে সত্যি বলতে এগুলো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো মাথাব্যথা নেই। আমার কোনো ক্ষোভ নেই। আমি সৃষ্টিকর্তার রহমতে যা পেয়েছি তাতেই অনেক বেশি খুশি। আমাকে দেশের মানুষ যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান দিয়েছে তার চেয়ে কোনো সম্মানই আমার কাছে বড় মনে হয় না।’

তবে তিনি বিশেষ একটি দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, সেটি এই সময়ের বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘যোগ্য মানুষের সম্মান করা, গুণীদের কদর করা না হলে সে দেশে ভালোকিছু হয় না। একটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয় তখন কিন্তু জাতি হিসেবে নিজস্বতা বলতে কিছু থাকে না। এ কারণেই আজ চলচ্চিত্র শিল্পের এই দশা। এখন আর সেই গান কোথায়? এক লালন সাঁইকে নিয়ে একটু চর্চা হয়, সেটিও হবে না যদি এভাবে গুণীকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। সেই চিত্রশিল্প কই? জয়নুল আবেদিন নেই, কামরুল হাসান নেই- এখন এই শিল্পের কী অবস্থা জানি না।’

তবে সোহেল রানা নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ করেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ব্যথাই তাদের মধ্যে অনুভব করাতে না পারি তাহলে তারা কেন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যথা বুঝবে? কেনই বা তারা গুণীদের চিনবে?’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত