পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ভূঁইয়া এনুর ৩২টি সিন্দুক রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি বংশালের ইংলিশ রোডের ‘শাবনাজ স্টিল কোং’ থেকে বিশেষ ফরমায়েশ দিয়ে এগুলো বানানো হয়। গত বুধবার বানিয়ানগর মুরগিটোলা ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে এনুর তিনটি সিন্দুক উদ্ধার করে র্যাব। ওই সিন্দুক থেকে ৫ কোটি টাকা, ৭৩০ ভরি সোনা ও ৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বাকি সিন্দুকগুলোর এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।
এনু ও তার ভাই রশিদুল হক ভূঁইয়া ও রুপন ভূঁইয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল্লাহ বুলবুল গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী থানা পুলিশ ও সিআইডি তার তদন্ত করবে। আদালত বা মন্ত্রণালয় যদি মনে করে তাহলে র্যাবের কাছে সেটার তদন্তভার দিতে পারে। তদন্তভার পেলে র্যাব তদন্ত করবে।’
৩২ সিন্দুকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শাবনাজ স্টিল কোংয়ের লোকজন আমাদের বলেছে তারা এনুর কাছে পাঁচটি সিন্দুক বিক্রি করেছে। আরও সিন্দুক বিক্রি করে থাকলে আমরা সেটার খোঁজ নেব। তথ্য পেলেই সেগুলো উদ্ধার ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করব।’
রাজধানীর ফকিরাপুলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের অংশীদার এনু-রুপনের একটি, বন্ধু হারুন-উর-রশিদ এবং কর্মচারী আবুল কালাম আজাদের বাসা থেকে গত বুধবার তিনটি সিন্দুক উদ্ধার হয়। ওই সিন্দুকে টাকা, অস্ত্র ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধারের ঘটনায় মানি লন্ডারিং, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও অস্ত্র আইনে সাতটি মামলা করে র্যাব। এর মধ্যে সূত্রাপুর থানায় চারটি, ওয়ারী থানায় দুটি ও গেন্ডারিয়া থানায় একটি মামলা করা হয়। এরপরই বানিয়ানগর মুরগিটোলার ভূঁইয়া পরিবারের ‘উত্থান ও সাম্রাজ্য বিস্তারের’ কাহিনী বেরিয়ে আসতে থাকে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এনুদের পরিবারের ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা হয়েছেন। আর এসব পদ বাগিয়ে নিতে তাদের খরচ হয়েছে ৫ কোটি টাকার মতো। এছাড়া থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশকে এনু-রশীদ ও রুপন দৈনিক, মাসিক ও এককালীন হিসেবে ‘বেতন’ দেন। ক্যাসিনোর পাশাপাশি রাজধানীতেই তাদের পাঁচটি জুয়ার আসর চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বাড়ি ও স্থাবর সম্পদ নিয়েও মিলেছে বিস্ময়কর তথ্য।
র্যাব বলছে, এনু-রশীদ ও রুপনের ১৫টি বাড়ির তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, তাদের বাড়ির সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০টি। এছাড়া কেরানীগঞ্জে ১০০ বিঘা ও ভারতের শিলিগুড়িতেও তাদের বিপুল পরিমাণ জমিজমা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার ভাষ্য, মাত্র পাঁচ-সাত বছর আগেও সিরাজ ভূঁইয়া ছয় ছেলে নিয়ে নারিন্দায় টিনশেড বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তারা জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো, চোরাচালান, দখলবাজিসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এনু ভ্রাতৃত্রয় রাজধানীতে পাঁচটি ক্যাসিনো চালাতেন। এর মধ্যে ফকিরাপুলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, নারিন্দায় জুনিয়র লায়ন্স ক্লাব ও পুরানা পল্টনের প্রীতম জামান টাওয়ারে নেপালিদের নিয়ে একটি ক্যাসিনো চালাতেন। এছাড়া ৪৫/১, দয়াগঞ্জে একটি ও নিজেদের বাসায়ও একটি জুয়ার বোর্ড চালাতেন তিন ভাই। গত ফেব্রুয়ারিতে এনু-রুপনের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা দয়াগঞ্জের ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়টি দখল করে নেন। পরে জাতীয় পার্টির এক এমপিকে দিয়ে বিশাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেখানে ক্লাবের উদ্বোধন করে বসানো হয় জুয়ার বোর্ড। জুয়া খেলার পাশাপাশি সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত চলত মাদক সেবনও। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাই ওই অনুষ্ঠানে যাননি।
৫ কোটি টাকায় ১৭ নেতা : আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, ৫ কোটি টাকা খরচ করে এনু-রুপন নিজেদের পাশাপাশি পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ ১৭ জনকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা বানিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন ভাই রশীদ ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং এনু গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও রুপন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া রশীদের ছেলে বাতেনুর রহমান বাঁধন ৪১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ভাতিজা তানিম হক একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও নারিন্দা জুনিয়র ক্লাবের ১২ কর্মচারীকেও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতৃত্বে বসিয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ব্যবস্থাপক পাভেল রহমান ৪০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, কর্মচারী জাহাঙ্গীর আবদুল্লাহ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আসলাম ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক, মো. রাজ্জাক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, মো. হারুন নির্বাহী সদস্য। এছাড়া আফতাবউদ্দিন আফতাব ৪১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, মো. তারেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক, মো. রতন ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, মনজুরুল কাদের মামুন সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক, মিজানুর রহমান মিজান যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক এবং মো. মঞ্জু ও কুতুবউদ্দিনকে কার্যনির্বাহী সদস্য করা হয়। এভাবে এনু সংসদ নির্বাচন এবং রুপন ও রশীদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চেষ্টা চালান। এছাড়া এনু ঢাকা-৬ আসনের বিভিন্ন এলাকায় ঈদের শুভেচ্ছা ও বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে ব্যাপক পোস্টার টানান। গত নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর পক্ষে তারা ২ কোটি টাকা খরচ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেতনভুক নেতা : এনু-রশীদ ও রুপন গেণ্ডারিয়া ও সূত্রাপুর থানা এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়মিত ‘বেতন’ দেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন গেণ্ডারিয়া থানার সহসভাপতি মো. হানিফ, নূর হোসেন ওরফে ফ্রিডম নূরু; ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি প্রদীপ কুমার দাস ও সহসভাপতি আমীন মোহাম্মদ, সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন লালা, সহসাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দীন সাইফু ও নয়ন সাহা এবং গেণ্ডারিয়া থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলী হাসানি শিশির। তাদের কয়েকজনকে দৈনিক পকেট খরচ হিসেবে ১ হাজার টাকা, মাসে ২০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। এছাড়া ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে দেওয়া হয় ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। নেতাদের মধ্যে হানিফ ও ফ্রিডম নূরুকে মাসে ২৫ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হয়। এছাড়া আমিন মোহাম্মদকে প্রতি মাসে দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। এসব টাকা বিতরণের দায়িত্ব পালন করেন এনুর ভাতিজা পাভেল। এনু, রশীদ ও রুপন উপস্থিত থেকে শুধু সবাইকে ঈদ সালামি দিতেন।
হত্যা মামলার আসামি ছিলেন বাবা : স্থানীয়দের ভাষ্য, এনু-রুপনের বাবা সিরাজ ভূঁইয়া দুটি বিয়ে করেছেন। তার বড় ছেলে শহীদ লেদ মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার ভাই রশীদও ছিলেন লেদ মেশিন অপারেটর। তাদের বাবা ১৯৭৬ সালে পুরান ঢাকার লালকুঠি ক্লাবে জুয়ার বোর্ড চালানো নিয়ে বিরোধের জেরে আবু সাঈদ কমিশনারের বড় ভাইকে খুন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আত্মগোপন করেন। ওই সময়ের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পরে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়া সাদেক হোসেন খোকার মাধ্যমে ওই মামলা থেকে রেহাই পান সিরাজ ভূঁইয়া। এরশাদ সরকারের আমলে তিনি পুরান ঢাকার জাতীয় পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়েন।
তারা আরও বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের সময় খোকার মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এনু-রুপন। তারা এখনো খোকার জন্য মাসে মাসে টাকা পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসার পর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শহীদুল্লাহ মিনুকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে দলে সক্রিয় হন দুই ভাই। ২ কোটি টাকা খরচ করে চেষ্টা করেন কাউন্সিলর মনোনয়ন নিতে। কিন্তু মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিগত কাউন্সিলে মহানগর দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতাকে টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ করে’ আওয়ামী লীগের পদ বাগিয়ে নেন এনু, রশীদ ও রুপন।
কেরানীগঞ্জে টর্চার সেল : গেণ্ডারিয়া-সূত্রাপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা এলাকায় উপজেলা পরিষদের কাছে এনু-রশীদের একটি টর্চার সেল আছে। জমি, জুয়ার বোর্ড বা অন্য কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ হলে তাকে ধরে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের লোগোওয়ালা ভক্সি গাড়িতে তুলে সেখানে নেওয়া হতো। পরে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে কার্যসিদ্ধি করতেন তারা। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে এভাবে বহু মানুষকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
ম্যাচিং ব্রাদার : এনু ও রুপন এলাকায় ‘মিস্টার ম্যাচিং’ বা ‘ম্যাচিং ব্রাদার’ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই ভাই সবসময় স্বর্ণের মোটা চেইন পরেন; যার একেকটির ওজন ৮-১০ ভরি। প্রতিটি আঙুলে পরেন হীরা, দামি পাথর ও সোনার আংটি। তারা যখনই বাইরে বের হতেন কালার ম্যাচিং করে জামা, জুতা, বেল্ট পরতেন। এভাবেই এলাকায় তারা ‘মিস্টার ম্যাচিং’ বা ‘ম্যাচিং ব্রাদার’ নামে পরিচিতি পান। চলাফেরার সময় সামনে-পেছনে থাকত দেহরক্ষীদের বিশাল বহর।
জমির একক ক্রেতা : এনু-রুপন ও রশীদ ছিলেন নারিন্দা এলাকায় জমির একক ক্রেতা। এলাকাবাসী জানিয়েছে, তাদের ঘোষণা ছিল তারা ছাড়া কেউ এলাকায় কোনো জমি কিনতে পারবেন না। এসব জমির দরদাম ঠিক করতেন তাদের ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা মো. হানিফ। করাতিটোলায় এক নারীর ১৫ কাঠা জমি তারা দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আসগর আলী হাসপাতালের পাশে ১৫ কাঠা জমির দখল নিয়ে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়। ওই ব্যবসায়ীর চেয়ে দেড়গুণ বেশি দাম দিয়ে এনু-রশীদ ওই জমি কেনেন বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। জমি ও বাড়ির দখল নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ হলে ছাত্রলীগ নেতা শিশিরকে দিয়ে তাদের শায়েস্তা করা হতো।
দখল বাণিজ্য : এনু, রশীদ ও রুপনের বিরুদ্ধে পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দখল বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা টাকার বিনিময়ে ‘ঠিকাদারি’ নিয়ে বিভিন্নজনের জমি দখল করে দিতেন। ডাকাত শহীদের সহযোগী সাবেক যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আবদুল্লাহ, মিল্টন নামে আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা ও ডাকাত শহীদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত হেদায়েতুল ইসলাম স্বপনের মাধ্যমে এই দখল বাণিজ্য পরিচালনা করতেন তারা।
পুলিশের ভাষ্য : এনু-রুপনের বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ বলেন, র্যাব মামলা করেছে। সেগুলো তদন্ত হবে। তাদের অপকর্মের বিষয় তদন্তে বেরিয়ে আসবে। এমনিতেই অনেকে অনেক কথা বলেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না।
