মঞ্জুর মুক্তকচ্ছ চাঁদাবাজি

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৭ এএম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট থেকেই মাসে কোটি টাকার বেশি আয়। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০১১ সাল থেকে টানা আট বছর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন টিকাটুলীর এই মার্কেটের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি তিনি। তার নামে দুই মার্কেটের ১৭৮৮ দোকান থেকে প্রতি মাসে ৯৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। এর বাইরে ঈদে বা পূজায় দিতে হয় বাড়তি টাকা। জেনারেটর, বেয়ারসহ অন্যান্য খরচের নামেও দিতে হয় চাঁদা। তার বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে বছরের পর বছর অভিযোগ ও মামলা করেও কোনো লাভ হয়নি। মঞ্জু ও তার বাহিনী এতটাই বেপরোয়া

যে, সেখানে মঞ্জুর কথাই যেন আইন। তার কথার অবাধ্য হলেই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে টর্চারসেলে নির্যাতন করা হয়। চাঁদাবাজির সময় হাতেনাতে কয়েক দফায় তার লোকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও মার্কেটে চাঁদাবাজি বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।

সম্প্রতি মঞ্জু ও তার বাহিনী চাঁদাবাজি করার আরেকটি ‘সুযোগ পেয়েছে’ বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের একটি চিঠির ‘কল্যাণে’। ওই চিঠিতে মঞ্জুর আবেদন ও দেন-দরবারের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের দোতলায় পাইপ ও ট্রাস অ্যাঙ্গেল দিয়ে ৮৪টি দোকান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের জামানত নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, এ সুযোগে মঞ্জু প্রতিটি দোকান থেকে ‘অগ্রিম’ হিসেবে ৮-১০ লাখ টাকা করে আদায় করছেন। তিনি নিজেই নির্মাণকাজ তদারকি করছেন।

তবে মার্কেটে চাঁদাবাজি ও দ্বিতীয় তলায় নির্মাণাধীন মার্কেটে দোকানের ভাড়ার অগ্রিম আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঞ্জু। গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, মার্কেট দুটি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের। দোকান নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়া সব তারাই করছে। আমি মার্কেটের সভাপতি হিসেবে আমাকে অবহিত করা হয়েছে মাত্র। ট্রাস্টের লোকজন সেখানে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে দোকান তৈরির কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। মার্কেটে চাঁদাবাজি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সার্ভিস চার্জ দেন। সেটা মার্কেটের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হয়।’

মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আরও জানান, সম্প্রতি মঞ্জুর চেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে প্রতিটি ৩৫ বর্গফুট আয়তনের দোকান নির্মাণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এতে শর্তের মধ্যে রয়েছে দোকানগুলো বরাদ্দ নয়, ভাড়া দেওয়া হবে। দোকানের নামজারি দেওয়া হবে না, ভাড়া দেওয়ায় দোকানির কোনো স্বত্ব জন্মাবে না। প্রতিটি দোকানের মাসে ভাড়া হবে ২ হাজার টাকা। গত আগস্ট মাসে এই চিটি পাওয়ার পর মঞ্জু প্রতিটি দোকান ভাড়ার অগ্রিম বাবদ ৮-১০ লাখ টাকা করে আদায় করতে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, এই দোকানগুলো হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো নির্মাণ হলে নিচে যাদের দোকান তাদের দোকানগুলোর মূল্য কমে যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোকানের মাঝখানে বা সামনে পিলার বসাতে হবে। এতে নিচতলার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই তারা একজোট হয়ে দোকান নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। দুই মার্কেটে মঞ্জু ও তার লোকজন নম্বরবিহীন ২৬টি দোকান বরাদ্দ দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দোতলায় দোকান নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের প্রতিষ্ঠানপ্রধান আবদুল মোন্তাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি চিঠি হয়েছে। কাজ পুরোপুরি শুরু হয়নি। পরবর্তী নির্বাহী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

 

দেবোত্তর সম্পত্তিতে ‘নজর’ : মঞ্জু ও তার ক্যাডার বাহিনীর দৃষ্টি পড়েছে টিকাটুলীর ১২, কেএম দাস লেনে ৭ বিঘা ১৬ কাঠা সম্পত্তির ওপর। এই সম্পত্তি রক্ষার দাবিতে ইতিপূর্বে সংবাদ সম্মেলন করেছে শ্রী শ্রী স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্ট। ওই ট্রাস্টের ট্রাস্টিরা জানান, ওই জমিতে শ্রী শ্রী স্বামী ভোলানন্দাগিরি আশ্রম কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। সনাতন ধর্মীয় চর্চার উদ্দেশ্যে স্বর্গীয় যোগেশ চন্দ্র দাস ও তার ছোট ভাই স্বর্গীয় শচীনন্দন দাস ২০১২ সালের ২৩ জুন ৩৬৩৪ নং রেজিস্ট্রিযুক্ত দলিলে এই জমি দান করেন। আশ্রমের শতকোটি টাকা মূল্যের জমি মঞ্জুসহ ‘প্রভাবশালী একটি মহলের’ যোগসাজসে কিছু অংশ জবরদখল হয়ে আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানকার এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মঞ্জুসহ একটি কুচক্রী মহল এই সম্পদ দখল করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলাও হয়েছে।’

 

বাস্তবায়ন হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ : রাজধানী সুপার মার্কেট নিয়ে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও চাঁদাবাজির প্রমাণ উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ওই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয় চিঠি দিয়ে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওই নির্দেশ পাঠানো হয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে। ডিএমপি কমিশনার ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ও ওয়ারী থানাকে সেই নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। চিঠিতে বলা হয়, মার্কেটে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে বৈধ কমিটি আসলেই মঞ্জু বাহিনীর চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। কিন্তু কোনো নির্বাচনই হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মঞ্জু নির্বাচন না দিয়ে নানা কৌশলে সময়ক্ষেপণ করছেন। এছাড়া মার্কেটের ১ হাজার ৭৮৮টি দোকান থেকে বিদ্যুৎ বিল ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকা করে আদায় করেন মঞ্জু। এভাবে তিনি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা ওঠালেও বিল জমা দেন ১২-১৩ লাখ টাকা। বাকিটা আত্মসাৎ করেন। মার্কেটের প্রতিটি দোকান থেকে জেনারেটর বিল বাবদ আদায় করা হয় ১৭৫ টাকা করে। বিগত কয়েক বছর তেমন লোডশেডিং না হওয়ায় এর পুরো টাকাই আত্মসাৎ করা হচ্ছে। মার্কেটে বাতাস চলাচলের জন্য বেøায়ার বসানোর নামে প্রতিটি দোকান থেকে ২০ হাজার টাকা করে এককালীন আদায় করা হয় ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বেøায়ারে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে নেওয়া হয় আরও ১ হাজার টাকা করে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। যার সিংহভাগই আত্মসাৎ করা হয়েছে। মার্কেট সমিতি প্রত্যেক দোকান থেকে ‘ভ্যাট’ আদায় করে। এসব ভ্যাট সঠিকভাবে জমা দেওয়া হয় না।

 

আট বছর ধরে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি : মঞ্জুর বিরুদ্ধে কয়েক দফা সংবাদ সম্মেলন করেছেন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। এসব সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মঞ্জু কোনো নির্বাচন ছাড়াই বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ২০১১ সালের জুলাই মাস থেকে মার্কেট মালিক সমিতির ‘স্বঘোষিত সভাপতি’ হিসেবে পদ দখল করে আছেন। তিনি মার্কেটের ১ হাজার ৭৮৮টি দোকান মালিকদের কাছে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে কয়েক লাখ টাকার চাঁদা নিয়েছেন। কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে না চাইলে তার দোকানে তালা ঝোলাচ্ছে মঞ্জুর লোকজন। প্রতিবাদ করায় হুমকি পেয়ে ব্যবসায়ী আজমল হোসেন, হাফিজুর রহমান, ফজলুল হক, সেন্টু চৌধুরী, আবু বকর ও মতিউর রহমান ওয়ারী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

 

ফুটপাতে দোকান : মঞ্জু তার লোকজন দিয়ে ফুটপাতে দোকান বসিয়েছেন। সেগুলো থেকে নিজস্ব লোকজন দিয়ে নিয়মিত চাঁদা তোলেন। মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় পাঁচ শতাধিক দোকান থেকে দৈনিক হিসেবে চাঁদা নেন মঞ্জু। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মার্কেট জমানোর স্বার্থে ফুটপাতে দোকান বসিয়েছি। কারণ ফুটপাতে দোকান না থাকলে মার্কেট জমে না।’

অভিযোগ রয়েছে, এছাড়া মঞ্জুর ক্যাডার বাহিনী কেএম দাস লেন, অভয় দাস লেন, টয়েনবী সার্কুলার রোড, জয়কালী মন্দির রোড, ভগবতী ব্যানার্জি রোড, ফোল্ডার স্ট্রিট, হাটখোলা রোড ও আর কে মিশন রোড এলাকার ফুটপাত ও খালি জায়গায় দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করেন। এসব এলাকা থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামেও চাঁদা তোলে মঞ্জুর লোকজন। কাউন্সিলর ছাড়াও মঞ্জু বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাবের সভাপতি। টিকাটুলীর এই ক্লাবেও জুয়ার বোর্ড চালানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

 

১৫ বোর্ড সভায় অনুপস্থিত : দখল চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত থাকলেও মঞ্জু ডিএসসিসির ১৯টি বোর্ড সভার মধ্যে ১৫টিতেই অনুপস্থিত ছিলেন। কাউন্সিলরদের মধ্যে অনুপস্থিতির তালিকায় তার অবস্থান সবার ওপরে। যেখানে সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, মেয়র অথবা কাউন্সিলর তার স্বীয় পদ হতে অপসারণযোগ্য হবেন, ‘যদি তিনি যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে সিটি করপোরেশনের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন।’ অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ডের সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক নেই। স্থানীয় লোকজন জরুরি প্রয়োজনে তার কার্যালয়ে গেলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর তার দেখা পান। ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগেও একই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। বোর্ড সভায় না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মঞ্জু বলেন, ‘আমি অভিমান করেই সভায় উপস্থিত হচ্ছি না। কারণ ওইসব সভায় গিয়ে কোনো কথা বলা যায় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত