শেষ মুহূর্তে নৌকার জয়

আপডেট : ১৬ জুন ২০২২, ০৪:৫৯ এএম

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে প্রায় সব প্রার্থীরই শঙ্কা ছিল। গতকাল বুধবার সকালে সেই ভোট শুরুর সময়টি বৃষ্টি বিঘিœত হলেও সারা দিন শান্তিপূর্ণই ছিল। কিন্তু ফল ঘোষণার শেষ পর্যায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর ওপর হামলার ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ভোটের পরিবেশ। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাতকে অনেকটা নাটকীয়ভাবেই বিজয়ী ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ভোট পর্ব।

মনিরুল হক সাক্কু ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, তার কাছে ১০৫ কেন্দ্রের ফলাফল রয়েছে। তাতে তিনিই এগিয়ে আছেন বলে দাবি করেন। সাক্কু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ৯৮৭ ভোটে জিতেছি।’

তার আগে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার শায়েদুন্নবী চৌধুরী। এই ফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাত নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুল হক সাক্কু টেবিল ঘড়ি প্রতীকে পেয়েছে ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী নিজাম উদ্দিন কায়সার ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ হাজার ৯৯ ভোট। সাক্কু ও কায়সার দুজনই বিএনপির রাজনীতি করতেন। দলের নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

ফল ঘোষণার আগে রাত ৯টার কিছুক্ষণ আগে মিলনায়তনের সামনে রিফাত ও সাক্কুর সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। এ সময় সাক্কুর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

গতকাল সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলে।

রিটার্নিং অফিসার জানান, ১০৫ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। মোট ভোটগ্রহণ হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৪। অবৈধ ও বাতিল করা হয়েছে ৩১৯টি ভোট।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ভোটের ফল ঘোষণা শুরু হয়। শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের মঞ্চ থেকে ভোটের ফল ঘোষণা করতে থাকেন রিটার্নিং অফিসার শায়েদুন্নবী চৌধুরী। এ সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) ফারুক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

কেন্দ্রভিত্তিক ফল ঘোষণায় কখনো রিফাত, কখনো সাক্কু এগিয়ে থাকছিলেন। একেবারে শেষ মুহূর্তে রাত ৯টার কিছুক্ষণ আগে ফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন রিটার্নিং অফিসার। ওই সময় ১০১ কেন্দ্রের ফল ঘোষণায় সাক্কু প্রায় এক হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। রিটার্নিং অফিসার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তা আলাদা কক্ষে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আধা ঘণ্টার মতো কথা বলেন। এরপর এসে ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

এবার কুমিল্লা সিটির নির্বাচন মেয়র পদে প্রার্থী ছিলেন পাঁচজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের আরফানুল হক রিফাত, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত গত দুবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু, বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান বাবুল (হরিণ) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাশেদুল ইসলাম (হাতপাখা)। এছাড়া ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১০৬ ও ৯টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৬ জন প্রার্থী নির্বাচন করেন।

কুমিল্লার নগর সংস্থার ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার ৯১৮। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২ এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬ জন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সতর্ক অবস্থানের কারণে কোনো কেন্দ্রে কোনো অনিয়মের খবরও পাওয়া যায়নি। ভোটগ্রহণ হয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। কোথাও বড় কোনো মারামারি ও গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পরপরই র‌্যাব-পুলিশের তৎপরতায় কেন্দ্রের বাইরে অবস্থানকারী মানুষরা পিছু হটেছেন।

দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাঘুরি করা সন্দেজনক বেশ কয়েকজনকে আটক করেছেন আবার ছেড়েও দিয়েছেন। কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লার সাধারণ মানুষের দাবি, নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে নতুন নির্বাচন কমিশন। ভোট শুরুর আগে সিইসির একটি বক্তব্য মানুষকে হতাশ করলেও ভোটের পরিবেশ দেখে সেই হতাশা কেটে গেছে।

জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, ৪টার পরও যারা লাইনে ছিলেন তাদের সবার ভোট নেওয়া হয়েছে।

এবারই প্রথম নির্বাচনী এলাকার সব কেন্দ্র ও ভোট কক্ষে ছিল ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। ঢাকায় নির্বাচন ভবন থেকে এবং কুমিল্লায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে সেসব ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ করা হয় ভোট পরিস্থিতি। এই পর্যবেক্ষণে দারুণ সুফল পাওয়া গেছে বলে জানান নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কয়েকটি অভিযোগ পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে, তারা ছিলেন বহিরাগত। এছাড়া একজন জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করায় তাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়া এ ১১ জনের বজ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে দুই বহিরাগতকে সাত দিনের কারাদণ্ড এবং ফরিদা বিদ্যায়ন কেন্দ্রে তিন বহিরাগতকে তিন দিন করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজা মতিন এবং সোহেল রানা।

২৩ নম্বর ওয়ার্ডে দিদার হোসেন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভোট কার্যক্রমকে ‘প্রভাবিত’ করার অভিযোগে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমান। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শুভাশিস ঘোষ নির্বাচনী আচরণ নিশ্চিত করতে আরেক ব্যক্তিকে তিন দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পিটিআই স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনী আচরণ ভঙ্গের দায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দের কাছ থেকে তিন মাসের কারাদণ্ডাদেশ পেয়েছেন দুজন।

তবে ইভিএমে ভোট হওয়ায় গণনার কাজও চলেছে দ্রুতগতিতে। এর আগে ভোটের শুরুতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে কিছুটা বিপত্তির মুখে পড়েন ভোটাররা। বৃষ্টি চলে ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত। মুষলধারের এ বৃষ্টিতে মাঠের লাইন ভেঙে ভোটাররা আশ্রয় নেন কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে। কাউকে কাউকে লাইনে দাঁড়িয়েই ভিজতে দেখা যায়। বৃষ্টির মুখে পড়ে অনেকেই বাড়িও চলে যান। বৃষ্টির ওই ব্যাঘাত পার করে বেলা ১১টার পর আবার ভিড় বাড়ে ভোটকেন্দ্রে। বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও ভেতরে ভোটগ্রহণে কিছুটা ধীরগতির অভিযোগ পাওয়া যায়।

এদিকে নিকট অতীতে ভোটের সময় ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে সরকার দলের সমর্থকদের সরব উপস্থিতি ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা কঠোর থাকায় এবার সেটা হয়নি। কেন্দ্রের বাইরের রাস্তায় নৌকার ব্যাজ পরা নেতাকর্মীদের অবস্থান দেখা গেছে। তবে সেভাবে দেয়াল ঘড়ি কিংবা ঘোড়ার প্রতীকের প্রার্থীর কর্মীদের অবস্থান দেখা যায়নি। কেন্দ্রের আশপাশে অযথা ঘোরাঘুরির জন্য শাস্তিও পেয়েছেন অনেকেই। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা থাকায় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা সতর্ক ছিলেন।

সকাল ১০টার দিকে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা শায়েদুন্নবী চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি, সবাই সুন্দরভাবে ভোট দিচ্ছেন। বৃষ্টি আসার কারণে ভোটার উপস্থিতি একটু কম আছে।’

সকালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল কেন্দ্রে ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নৌকার প্রার্থী রিফাত নিজের জয়ের ব্যাপারে ‘শতভাগ আশাবাদ’ ব্যক্ত করেন।

একই কেন্দ্রে ভোট দেন ঘোড়া মার্কার প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। ইভিএমে ভোট প্রয়োগে ‘বয়স্কদের জন্য সমস্যা’ হয় এবং ভোটের গতি ‘শ্লথ’ হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরে হোচ্চা মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়ে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী সাক্কু বলেন, ‘সবকিছু ঠিক আছে। শুধু ইভিএম পদ্ধতিতে একটু ত্রুটি হচ্ছে।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকা ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবেদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের চোখে কোনো বিশৃঙ্খলা বা গণ্ডগোল ধরা পড়েনি। ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধাদানের অভিযোগে আমরা পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘বোঝা যাচ্ছে ভোটের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ বেড়েছে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক বিষয়।’

রিফাতকে বিজয়ী ঘোষণার পর কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সিটি করপোরেশন, সেনানিবাস এলাকা) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘কত ব্যবধানে জিতল না জিতল সেটা কোনো বিষয় নয়। নৌকা বিজয়ী হয়েছে এটাই বড় কথা।’

ফল ঘোষণার পর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : ফল ঘোষণার পর কোনো প্রার্থী কিংবা তার সমর্থকরা বিজয় মিছিল বা কোনো বিজয় উল্লাস করতে পারবেন না বলে নির্বাচনী আচরণবিধিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু সেই বিধি ভেঙে গতকাল রাতেই রিফাত সমর্থকদের কুমিল্লা নগরীতে বিজয় উল্লাসে নেমে পড়তে দেখা যায়। কান্দিরপাড়ের চারমুখী রাস্তার সবদিক থেকেই নৌকা প্রতীকের মিছিল নিয়ে বের হন রিফাতের কর্মী-সমর্থকরা। মধ্যরাতে অবশ্য নিরাপত্তা বাড়ানো হয় নগরীতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত