বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইদানীং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বিভিন্ন ইস্যুতে দল দুটির মধ্যে টানাপড়েন চলছে। তবে এখন পর্যন্ত তারা একে অপরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে যায়নি। তাদের বিচ্ছেদ এখনো হয়নি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর তৎপরতায় লিপ্ত, পাশাপাশি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইতিমধ্যে একশ’র বেশি আসনে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১-এ জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য আসনগুলোর প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
গত ২৬ সেপ্টেম্ব^র রাজধানী ঢাকায় দলের এক কর্মসূচিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পরকীয়া সম্পর্ক চলছে।’ পরের দিন জামায়াতে ইসলামী গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টুকুর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। জামায়াতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি জামায়াতকে উদ্দেশ করে কিছু বলিনি। যা বলেছি আওয়ামী লীগের সমালোচনায় বলেছি।’ টুকুর এ কথার জবাবে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ এখন আর বোকা নেই। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যা বলেছেন তা দেশের মানুষ বোঝে। তার শব্দচয়ন ঠিক হয়নি।’
২৭ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, ‘ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। দেশবাসীকে তা বিস্মিত করেছে। এটা কোনো রাজনীতিকের ভাষা হতে পারে না। তার বক্তব্য স্বৈরাচারী শাসনকে প্রলম্বিত করার ক্ষেত্র তৈরি করবে।’
টুকুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আকন্দ গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ও বেআইনি ঘোষণাসংক্রান্ত বিষয়ে টুকুর কথায়, তার মর্মবেদনায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দেবে। কার স্বার্থে এবং কাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন? জামায়াতে ইসলামী কখনো আপস করে না; গোপন এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, করার প্রশ্নই আসে না।’
জামায়াত নিয়ে দেশে-বিদেশে চাপে বিএনপি : বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বাঁধার কারণে দেশে-বিদেশে বেকায়দায় পড়েছি আমরা। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে বিএনপির সঙ্গে দলটির মতভিন্নতা দেখা দেয়। দলটির নেতাদের ফাঁসি শুরু হলে তাদের পক্ষে বিএনপির বিবৃতি আশা করেন জামায়াত নেতারা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার বিএনপি জামায়াতের পক্ষে বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তখন থেকেই সমস্যা প্রকট হতে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন আঁতাত রয়েছে। ভিন্ন নামে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়া হবে। বিনিময়ে তারা আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাবে। শুধু তা-ই নয়, এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জামায়াত নেতাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধাপরাধী আছে কিনা সরকারের একটি সংস্থা খোঁজ নিচ্ছে। তারা গ্রিন সিগন্যাল দিলে ভিন্ন নামে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়া হবে।’
নতুন নামে নিবন্ধন নেওয়ার বিষয়ে জামায়াত নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি নয়। আমরা যা কিছু করব প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই করব। নতুন নিবন্ধনের বিষয়ে আমাদের দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে জামায়াত নির্বাচনমুখী একটি দল। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন আসনে সক্ষমতা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’
বগুড়া-৭ আসন (গাবতলী-শাহজাহানপুর) যেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন করেন সেই আসন বাদে অন্য সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। খালেদা জিয়ার আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মতিউর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে সব আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’
গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঠাকুরগাঁও শহর শাখার উদ্যোগে সদর থানার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমাকে সংগঠন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
জানা গেছে, দলের নিবন্ধন না থাকায় নিজস্ব নামে ও প্রতীকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না জামায়াতের প্রার্থীরা। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে ১২০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর নীলফামারীর তিনটি আসনের জামায়াত প্রার্থীদের একটি তালিকা ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি জামায়াতের নীলফামারী জেলা শাখার প্রাথমিক তালিকা বলে দাবি করেন দলটির নেতারা। প্রার্থীরা হলেন নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে জেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুস সাত্তার; নীলফামারী-২ (নীলফামারী সদর) আসনে জেলা নায়েবে আমির ড. মো. খায়রুল আনাম ও নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে সৈয়দপুর উপজেলা আমির হাফেজ আবদুল মুনতাকিম।
