সাজা কমাতে ৫ কোটির মিশন!

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২২, ০৩:০৯ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফের আত্মসমর্পণকারী ১০১ ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ বুধবার। কিন্তু রায় ঘোষণার আগেই সাজা কমানোর আশ্বাস দিয়ে আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলছে একটি চক্র। চক্রটি অন্তত ৫ কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করেছে বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তথ্য আছে। যদিও প্রশাসন বলছে, মাদক কারবারিরা অপরাধী হলে অবশ্যই সাজা ভোগ করতে হবে। 

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কক্সবাজার জেলার ১০২ জন মাদক কারবারি। তারা প্রায় ২১ মাস কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট মো. রাসেল নামে এক আসামি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর ১০১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে জামিনে বের হয়ে তাদের বেশিরভাগই ফের কারবারে সক্রিয় হলেও ১৫ নভেম্বর রায়ের তারিখ ঘোষণার আগ পর্যন্ত অনেকেই মাদক ও অস্ত্র মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। তবে ১৫ নভেম্বরের পর থেকে চিহ্নিত ইয়াবা কারবারিরা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেইদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। তবে জেলা পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, আত্মসমর্পণ করা ৮১ জনের হদিস মিলছে না। তারা কোথায় আছেন তা বের করতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। সাজা কমানোর কথা বলে টাকা উঠানো হয়েছে বলে আমরাও তথ্য পেয়েছি।

রায় ঘোষণার তারিখের পর থেকে টেকনাফের বিভিন্ন ইউনিয়ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ১৫ নভেম্বর থেকে টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ওরফে জিহাদ, ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এনামুল হক ওরফে এনাম, সাবরাং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামসুল আলম ওরফে শামশু, ৮নং ইউপি সদস্য রেজাউল করিম ওরফে রেজু, টেকনাফ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল বশর ওরফে কাউন্সিলার নুরশাদ, হ্নীলা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল হুদা ও ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ জামাল ওরফে জামাল ইউপি কার্যালয়ে যাননি। আত্মসমর্পণকারী ইয়াবাকারবারির মধ্যে উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ৪ ভাইসহ ১২ জন আত্মীয়স্বজন রয়েছে।

এই বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার আদালতের পিপি ফরিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলোচিত মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় ১০১ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে কাজ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আমি আশাবাদী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। তিনি আরও বলেন, ১৫ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় ১৮ আসামি উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ১ জন কৌশলে পালিয়ে যান। পরে তাকেসহ বাকি ৮৪ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তিনি আরও বলেন, রায়কে ঘিরে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর, দেশবাসীর চোখ আদালত ও বিচারকের নাম ভাঙিয়ে অপপ্রচার করা হলেও রায় যা হওয়ার তা হবেই। মামলার মেরিট নিয়ে চিন্তা করলে তাদের কঠিন শাস্তি নাও হতে পারে। তবে তারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিষয়টি যেহেতু স্বীকৃত, সেহেতু তাদের শাস্তি হবেই। আর শাস্তি নিশ্চিত বুঝতে পেরে হয়তো তারা আত্মগোপনে চলে গেছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে সমাজ ও মাদক কারবারিদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মাদক ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুটি মামলায় ২১ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে আদালত। এর মধ্যে বাদীসহ ১৪ জন পুলিশ এবং বাকি ৭ জন সাধারণ জনগণ।

পুলিশ সূত্র জানায়, দায়ের হওয়া দুটি মামলার পাবলিক সাক্ষী ও সাফাই সাক্ষীদেরসহ মামলাসংশ্লিষ্ট অনেককেই মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছে ইয়াবা কারবারিদের চক্রটি। ওই দুটি মামলা থেকে খালাস পেতে কিংবা কম সাজা হওয়ার জন্য সকল আসামি প্রায় ৫ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করেছে বলে আলোচনা চলছে টেকনাফজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুস শুক্কুরের নেতৃত্ব চক্রটি এসব টাকা তুলেছে। টাকা জমা রেখেছেন বদির আরেক ভাই আবদুল আমিন। ক্যাশিয়ার নিযুক্ত হন আবদুল শুক্কুরের বড় ভাই আব্দুল আমিন। তবে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ উঠেছে, ওই মামলার আসামিদের মধ্যে কেউ ১০-১৫ লাখ, গডফাদাররা ১৫-২০ লাখ, মেম্বাররা ৫-১০ লাখ এবং অন্যরা ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে দিয়ে সেই ফান্ড গঠন করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামে আত্মগোপনে থাকা এক ইয়াবা কারবারি বলেন, মামলার অভিযোগপত্র সাক্ষ্যপ্রমাণ সবই আমাদের পক্ষে রয়েছে। আশা করছি রায়ে আমরা সকলে খালাস পাব। যদি না পাই, তবে উচ্চ আদালতে যাব। এর সকল প্রস্তুতি নেওয়া আছে। আমরা ১৫ জন একসঙ্গে রয়েছি। বাকিরা এভাবে দলবদ্ধভাবে অবস্থান করছে।

মামলার একাধিক সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা আদালত থেকে জানিয়েছেন পুলিশের এজাহারে উল্লেখ থাকা সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবা ও অস্ত্র সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১০২ জনকে আত্মসমর্পণ করতে দেখেছেন। এক সাফাই সাক্ষী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৬ সালের  ১১ ফেব্রুয়ারি আমি একটি আমন্ত্রণপত্র পাই। সেই আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের মাদককারবারিরা আত্মসমর্পণ করবেন। সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি ১০২ জন আত্মসমর্পণকারী মঞ্চে উঠছেন। আর তাদের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বরণ করছেন অতিথিরা। এসব কথা আমি আদালতকে জানিয়েছি।

আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেটে জাহাঙ্গীর বলেন, যদি সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রায় ঘোষণা হয়, তবে সকল আসামি খালাস পাবে। আর যদি আবেগের কারণে হয় সেক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু হতে পারে। তিনি আরও বলেন, জলদস্যু আত্মসমর্পণে আমরা দেখেছি সরকার তাদের মামলা প্রত্যাহার করেছে। তাদের আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। ইয়াবা কারবারিদের বেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে বলেছিলেন তাদের পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু এখনো তাদের জন্য কিছু করেনি সরকার।

টেকনাফ থানার ওসি আবদুল হালিম বলেন, ‘আদালত থেকে এখনো আমরা কোনো পরোয়ানা পাইনি। তবুও অন্য একটি মামলা থাকায় আত্মস্বীকৃত মো. হোসাইন নামের ইয়াবাকারবারিকে আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত