রাজপথেই ফয়সালা হবে : ফখরুল

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৩, ০৬:১২ এএম

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ২৭ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেছেন, বিরোধী দলকে দমনে গায়েবি মামলা দেওয়া হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে তারা (সরকার) বিরোধী দলকে দূরে রেখে নির্বাচন করার অপকৌশল করছে। কিন্তু নির্দলীয় সরকার ছাড়া এবার কোনো নির্বাচন হবে না। রাজপথেই ফয়সালা হবে। দাবি একটাই, সেটা হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগ। এই দাবিতেই আগামী বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে।

গতকাল শনিবার ‘দেশ বাঁচাতে তারুণ্যের সমাবেশের’ আয়োজন করে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশ শুরু হয় দুপুর ২টায়। তবে গত শুক্রবার রাত থেকে ঢাকার আশপাশের জেলার নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। ভোর থেকেই বিভিন্ন উপজেলা, ঢাকার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে উদ্যানে প্রবেশ করতে শুরু করেন। ‘মামলা দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘গুম করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘চলছে লড়াই চলবে, খালেদা জিয়া লড়বে’, ‘এই মুহূর্তে দরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার’, ‘চোর চোর ভোট চোর, শেখ হাসিনা ভোট চোর’ ইত্যাদি স্লোগান দেন তারা।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন মোড়, শিল্পকলা একাডেমি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে সমাবেশে আসা বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব দিকে (ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের টেনিস কোর্ট-সংলগ্ন) মঞ্চ করা হয়। বেলা সোয়া ২টার দিকে মঞ্চ ভেঙে পড়তে পারে আশঙ্কায় নেতাকর্মীদের মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বারবার মাইকে ঘোষণা দিয়ে অনুরোধ করতে শোনা যায়। পৌনে ৩টার দিকে সমাবেশ মঞ্চের কাছে গিয়ে দেখা যায়, মঞ্চ ভেঙে গেছে। ভাঙা মঞ্চটি পেছনের দিকে কিছুটা হেলে রয়েছে। পরে আয়োজকরা ৩টার দিকে সেখানে সাদা রঙের একটি ছোট পিকআপ ভ্যান আনেন। সোয়া ৩টার দিকে সেই পিকআপের ওপর বক্তব্যের জন্য মঞ্চ (ডায়াস) করে ও প্লাস্টিকের চেয়ার বসিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। মঞ্চ ভেঙে পড়ার ঘটনায় বাংলা টিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শিউলী আক্তার (৪৪) ও ছাত্রদলের কর্মী নাঈম হোসেনকে (২২) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি-সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটক, রমণা কালীমন্দির-সংলগ্ন ফটক এবং জাতীয় তিন নেতার মাজার-সংলগ্ন ফটক তালাবদ্ধ ছিল। ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়।

সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভীরু এবং কাপুরুষের দল। তাই তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে ভয় পায়। সরকার বিদেশিদের বলছে, আমরা অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন দেব, অথচ নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে গায়েবি মামলা দিয়ে নির্বাচনী মাঠ খালি করছে। এই চক্রান্ত মানুষ সহ্য করবে না। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে আওয়ামী লীগ ১০টি আসনও পাবে না।’

তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে একদিকে স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দিচ্ছে গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্রগুলো, অপরদিকে তারা (সরকার) অন্যায়, অবিচার অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচনকে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে রাতারাতি পাল্টিয়ে ফেলেছে ডিসি এবং এসপিদের। নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্বস্তদের দিয়ে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন। সরকার অন্যায়ভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় বসে আছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সরকার বড় বড় কথা বলছে। তারা নাকি ক্ষমতায় এলে গণতন্ত্র আসে, জনগণ অধিকার ফিরে পায়, দেশবাসী দেখেছে ২০১৪ কীভাবে অনির্বাচিতদের দ্বারা সংসদ নির্বাচিত হয়েছিল। ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে কীভাবে হয়েছিল। এই আওয়ামী লীগ সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাতারাতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার কথা বাতিল করেছে।’ 

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে ক্ষমা চেয়ে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর, ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, ‘আজ কি ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়া হয়েছে? ১০ টাকা দরে চাল পাচ্ছে? পাচ্ছে না। চাকরি তারাই পাচ্ছে, যারা আওয়ামী লীগ করে। অথবা ২০ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে চাকরি হচ্ছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ভালো ভোটের আলামত দেখতে পেলাম ঢাকা-১৭ আসনে। বেচারা হিরো আলমকে কীভাবে মারধর করা হলো। হিরো আলম বাচ্চা ছেলে, খুব কষ্ট পেলাম। আওয়ামী লীগ তাকেও ভোট করতে দেয়নি। এরা কাউকে সহ্য করতে পারে না। এরা দেশটা মনে করে বাপের তালুকদারি। এরা সাধারণ মানুষের টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করছে, দেশটাকে ফোকলা বানিয়ে ফেলেছে। রাজধানী ছাড়া কোথাও বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ খাত থেকেই ১৪ লাখ কোটি টাকা তারা লুট করেছে। দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আর তারা ব্যস্ত বিদেশে টাকা পাচারে।’

তিনি বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা শুধু বিএনপি নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলনও বলেছে, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনোই সম্ভব নয়।’

মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে খালেদা জিয়া, বিএনপি নেতা রফিকুল আলম মজনু, সাইফুল ইসলাম নিরব, শেখ রবিউল আলম রবি, আব্দুল মোনায়েম মুন্না, ইউসুফ বিন জলিল কালু, এস এম জাহাঙ্গীর, মিয়া নূরুদ্দিন অপু, গোলাম মাওলা শাহীন, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জয়নাল হোসেনসহ কারাবন্দি সব নেতাকর্মীর মুক্তি দাবি করেন।

যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, আব্দুস সালাম, এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান খান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।

সমাবেশে ‘গুমের’ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল বক্তব্য দেন।

এদিকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ মহাসমাবেশের কর্মসূচি পালন করবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ১২-দলীয় সমমনা জোট, লেবার পার্টিসহ বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনরত সমমনা দলগুলো। রাজধানীর পূর্ব পান্থপথে এফডিসি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ করবে এলডিপি। শনিবার এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দীন রাজ্জাক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। ১২-দলীয় জোট বিজয়নগর পানির ট্যাংকি এলাকায় মহাসমাবেশ করবে বলে জানিয়েছে জোটের সমন্বয়ারী সৈয়দ এহসানুল হুদা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। পৃথক বিবৃতিতে লেবার পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারাও সমাবেশ করবে। এর আগে গতকাল দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের ডিওএইচএসের বাসভবনে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে দলটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত