টেক্সাসের গ্যালারিতে যখন হাজারো সমর্থক কিলিয়ান এমবাপ্পের জাদুকরী মুহূর্ত দেখার অপেক্ষায়, ঠিক তখন মাঠের ভেতরে ফরাসি অধিনায়কের আচরণে ছিল কেবলই অস্থিরতা। ২০১৮ ও ২০২২ সালের টানা দুটি ফাইনালে যে খেলোয়াড়টি ছিলেন প্রতিপক্ষের ত্রাস, সেই এমবাপ্পেই স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালের রাতে ছিলেন ছায়ামাত্র। ফ্রান্সের টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠার স্বপ্নযাত্রা থামল, তবে কি এমবাপ্পের সেই চিরচেনা ফর্মের অভাবেই? উত্তরটা পুরোপুরি এমবাপ্পে না হলেও এদিন নিজের দাপটের বিপরীতে বড্ডই বেমানান ছিলেন তিনি।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই বিধ্বংসী ফর্মে থাকা এমবাপ্পে স্পেনের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগের সামনে এদিন যেন ছিলেন পুরোপুরি অচেনা এক মানুষ, যার নিষ্প্র্রভ পারফরম্যান্সে আর্লিংটন স্টেডিয়ামের আঙিনায় সমাধি হলো ফরাসিদের ফাইনালে খেলার স্বপ্নের।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই এমবাপ্পে ছিলেন দুর্দান্ত। আসরে ৮ গোল করে তিনি ছিলেন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। ভক্তদের বিশ্বাস ছিল, এই ম্যাচটিও হয়তো এমবাপ্পের ক্যারিয়ারে নতুন কোনো পালক যোগ করবেন। কিন্তু ম্যাচের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। পুরো ৯০ মিনিটে মাত্র ৩৪ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছেন তিনি। গোলের উদ্দেশে তিনটি শট নিলেও তার একটিও ছিল না লক্ষ্য বরাবর। আর বল হারিয়েছেন এক-দুই না, মোটে ১৪ বার।
ম্যাচের ৮৬ মিনিটে স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমোনের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও ধাক্কাধাক্কি করে হলুদ কার্ড দেখা যেন তার সেই অসহায়ত্বেরই দর্শন। পরাজয়ের আগমুহূর্তে এমবাপ্পের অঙ্গভঙ্গি ছিল চোখে পড়ার মতো। নিজের বাম হাত ঝাপটিয়ে তিনি দলের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন, জার্সি দিয়ে মুখ মুছছিলেন আর বিড়বিড় করছিলেন। দলের সবচেয়ে বড় ভরসার এই নি®প্রভ রূপ পুরো ফ্রান্সকে ভাসিয়েছে গভীর হতাশায়।
ফ্রান্সের এ ভরাডুবির পর দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে এমবাপ্পেকে ঘিরে চলছে কঠোর সমালোচনা। বিখ্যাত পত্রিকা ‘লেকিপ’ তাদের প্রচ্ছদে এমবাপ্পের হতাশায় ডুবন্ত ছবি দিয়ে শিরোনাম করেছে ‘পতন’। তারা এমবাপ্পেকে দিয়েছে মাত্র ৩ রেটিং। দেশটির অধিকাংশ গণমাধ্যমই তাকে এ পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ‘লে পারিসিয়েন’ শিরোনাম করেছে ‘কঠোর বাস্তব’, যেখানে তারা লিখেছে ফরাসি বাহিনী স্পেনের রক্ষণভাগ ভাঙার চাবিকাঠি খুঁজে পায়নি। সব মিলিয়ে গোটা ফরাসি সংবাদমাধ্যম যেন একাট্টা হয়ে এমবাপ্পের পারফরম্যান্সের ব্যবচ্ছেদ করছে।
পরাজয়ের পর এমবাপ্পে অবশ্য অজুহাত না দেখিয়ে দায়ভার নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। ম্যাচপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি সব দায় নিচ্ছি। আমরা কৌশলগতভাবে ভুল করেছি, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আমাদের যে যোগাযোগ ছিল, সেখানে বড় ঘাটতি ছিল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এমন ভুল করলে জেতা কঠিন।’
স্পেনের মিডফিল্ড জেনারেল রদ্রি, দানি ওলমো এবং ফাবিয়ান রুইজদের নিয়ন্ত্রণের কাছে এদিন ফ্রান্সের মাঝমাঠ পুরোপুরি ধসে পড়েছিল। এমবাপ্পেও স্বীকার করেছেন, স্পেনের প্রেসিংয়ের সামনে তাদের টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল ভুলগুলোই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতার তালিকায় ছাড়িয়ে যাওয়ার যে হাতছানি ছিল, সেটিও এই ম্যাচে এসে থমকে গেল। কোচ দিদিয়ের দেশমের অধীনে এটিই ছিল বড় কোনো টুর্নামেন্টে এমবাপ্পের সবচেয়ে কঠিন রাত। এমবাপ্পে যখন এই পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণে ব্যস্ত, তখন ফ্রান্সের ভক্তরা খুঁজছে সেই পুরনো এমবাপ্পেকে, যিনি মাঠের যেকোনো প্রান্ত থেকে গোল করতে পারেন অবলীলায়।