ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সোনালি অধ্যায় ছিল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। টিকিটাকা ফুটবলের জাদুতে সেবার বিশ্বজয় করেছিল স্পেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর, সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে চায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার প্রথম সেমিফাইনালে হট ফেভারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে লা ফুরিয়া রোহারা। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সঙ্গে হতাশাজনক গোলশূন্য ড্র করা দলটিই এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিধ্বংসী, সবচেয়ে সুশৃঙ্খল দল হিসেবে নিউ ইয়র্কের ফাইনালে।
স্পেনের এই পুনরুত্থান এবং ফাইনালের টিকিট পাওয়ার পেছনে কাজ করেছে নিখুঁত দলগত পরিকল্পনা, কোচের দূরদর্শিতা এবং তরুণ তুর্কিদের অবিশ্বাস্য পরিণত মানসিকতা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ফ্রান্সের তারকাখচিত ব্যক্তকেন্দ্রিক ফুটবলকে কোণঠাসা করে দেয় স্পেনের লড়াকু সমন্বিত ফুটবল। প্রথমার্ধেই মিকেল ওয়ারসাবালের পেনাল্টি এবং দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো পোরোর চোখ ধাঁধানো গোলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশমও স্বীকার করেছেন যে, স্পেনের মাঝমাঠের আধিপত্যের কাছে তারা অসহায় ছিলেন। ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে ম্যাচের পর বলেন, ‘আমি মনে করি না আমরা কৌশলী, প্রযুক্তিগত বা সামগ্রিক পারফরম্যান্সের দিক থেকে যেমন খেলতে চেয়েছিলাম তেমনটা পেরেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল তাদের ওপর হাই প্রেস করা, যাতে তারা খেলাটিকে ধীরগতির, নিয়ন্ত্রিত ছন্দে নিয়ে যেতে না পারে। কারণ খেলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়ে সেরা। আমরা তা করতে ব্যর্থ হয়েছি।’
এমবাপ্পের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কতটা অসাধারণ ছিল। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে অনেকেই এই বিশ্বকাপে কিছুটা ‘বোরিং’ বা আক্রমণভাগে ধারহীন বলে সমালোচনা করছিলেন। আলভারো মোরাতার অনুপস্থিতি কিংবা লামিন ইয়ামাল-নিকো উইলিয়ামসদের ইনজুরি কাটিয়ে ধুঁকতে থাকা ফর্ম নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু নকআউট পর্বের প্রান্তে এসে ঠিকই নিজেদের সেরাটা বের করে এনেছে স্পেন। দলের এই নিখুঁত টাইমিং নিয়ে গর্বিত কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “ম্যাচের আগে আমার বার্তা ছিল আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দলের বিরুদ্ধে খেলছি ঠিকই, কিন্তু তাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, তারা আজ মুখোমুখি হয়েছে বিশ্বের ‘সেরা’ দলটির! এই খেলোয়াড়রা মাঠে অসাধারণ প্রতিশ্রুতি, একতা ও প্রতিভা দেখিয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের ড্রেসিংরুম এখন আনন্দে ভাসছে, পুরো দেশ আমাদের পেছনে দাঁড়িয়েছে। আমরা ২০১০ সালের সেই বিশ্বজয়ী দলের চেতনাকে আবার ফিরিয়ে এনেছি। দলের চরিত্র বোঝা যায় তখনই, যখন ম্যাচ শেষে যারা খেলার সুযোগ পায়নি তারাও মাঠে এসে অতিরিক্ত ঘাম ঝরায়। খেলোয়াড়দের এই অসাধারণ প্রজন্মের এত দুর্দান্ত মনোভাব রয়েছে এবং তারা অনেক দামি রোল মডেল। আমরা একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ। এখন আমাদের শেষ ধাপ, সবচেয়ে কঠিন ধাপ। আমাদের উন্নতি করতে হবে এবং আমরা তা করার চেষ্টা করব।’
গ্রুপ পর্বের সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে কোচ স্পষ্ট জানান, সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে, ‘অবশ্যই প্রথম ম্যাচটি জিততে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এটি একটি প্রক্রিয়া এবং এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আমাদের সেরা ফর্মে পৌঁছানোর জন্য এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। এখন আমরা দুর্দান্ত ফর্মে আছি, খেলোয়াড়রা খুব উত্তেজিত এবং আমরা এই দীর্ঘ মৌসুমের পর একটি শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছেছি।’
স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাস যেমন সুন্দর, তেমনি কিছু সবিরোধিতায় ভরা। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে যুগোসøাভিয়ার বিরুদ্ধে ড্রাগন স্টয়কোভিচের ফ্রি-কিকের সময় ডিফেন্সিভ ওয়ালে মিচেল লাফ না দেওয়ায় বিদায় নিতে হয়েছিল স্পেনকে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ঠিক বিপরীত বক্সে যেন সেই অধরা লাফটি দিলেন ২০ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিগনে যখন ভলি করে বল ক্লিয়ার করতে গেলেন, ইয়ামাল অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় বক্সে শরীর ভাসিয়ে ফাউলটি আদায় করেন। মিকেল ওইয়ারজাবাল সেই পেনাল্টি থেকে গোল করতে কোনো ভুল করেননি। এরপর দানি ওলমোর পাস থেকে টটেনহ্যাম রাইট-ব্যাক পেড্রো পোরোর গোল যেন ফ্রান্সের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত পোরো বলেন, ‘এটি একটি স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। এমনকি আমার বন্যতম স্বপ্নেও আমি গোল করার কথা ভাবিনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলের মনোভাবে আমি খুব খুশি। আমরা দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছি, এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবকিছু করেছি।’
নিকো উইলিয়ামসের ইনজুরি, পেদ্রির নিষ্ক্রিয়তা, কিংবা ইয়ামালের শতভাগ ফিট না থাকা কোনো কিছুই স্পেনের জয়রথ থামাতে পারেনি। কারণ এই স্পেনের সবচেয়ে বড় তারকা কোনো ব্যক্তি নন, বরং দল নিজেই। পেপ গার্দিওলা পরবর্তী যুগে গড়ে ওঠা এই স্প্যানিশ দলটির প্রতিটি খেলোয়াড়ের ডিএনএ-তে মিশে আছে পাসিং ফুটবল আর রক্ষণের প্রতি সমান দায়বদ্ধতা।
১৬ বছর আগে জোহানেসবার্গে যে সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন ইকার ক্যাসিয়াস-আন্দ্রেস ইনিয়েস্তারা, এবার নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি কিংবা ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম যার মুখোমুখিই হতে হোক না কেন, লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই ‘নতুন স্পেন’ ২০১০-এর সেই বিশ্বজয়ের গৌরব ফিরিয়ে আনতে পুরোপুরি প্রস্তুত।