প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপিকে সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। যদিও বিএনপির ঢাকার রাজপথ দখলে নিতে চাওয়ার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে তারা চিন্তিত নন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা বিএনপিকে সামাল দেওয়ার সুযোগ হাতে পেতে চান। এজন্য বিএনপির কর্মসূচি পালনে আগের মতো বাধা দেওয়ার কৌশলও আপাতত নেই ক্ষমতাসীনদের। তবে বিএনপির কর্মসূচিতে তাদের কড়া নজর রয়েছে।
গত কয়েক মাসে দেশের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। গত ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায়, যারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধা দেবে বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তাদের ক্ষেত্রে এই ভিসানীতি ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ভিসানীতির আওতায় রয়েছে নির্বাচনে ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, সহিংসতা, সংগঠনের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ক্ষুণœ করা। এর বাইরে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীলসমাজ বা গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রচারে বাধা দেওয়ার পদক্ষেপও এই ভিসানীতির আওতায় পড়বে। ভিসানীতি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে গেছেন। এ ছাড়া প্রাক-নির্বাচনী তথ্যানুসন্ধানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফর করে গেছে।
এর আগে থেকেই বিদেশি কূটনীতিকরা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার। বিভিন্ন সময় তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও বৈঠকে বসেছে।
বিদেশিদের তৎপরতার পাশাপাশি বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি চলছে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলার সংকট ইত্যাদি কারণে সরকার অস্বস্তিতে রয়েছে। ফলে বিএনপির রাজপথে উপস্থিতি ক্রমেই আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিরোধীদের কর্মসূচির দিন সরকারি দল মাঠে থাকলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তবে যেকোনো সময় পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির আন্দোলন-কর্মসূচি থেকে ইস্যু হাতে পেতে চায় ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের এই নেতাদের ভাষ্য, জুতসই সুযোগ পেলে বিএনপির ওপর চড়াও হওয়ার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকারি দল।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মসূচি রয়েছে। এ নিয়ে সংঘাতসহ নানা আশঙ্কা রয়েছে মানুষের মধ্যে। তবে আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই মূলত মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনগণ যাতে হতাশ না হয়, ভীত না হয় সেজন্য মাঠে রয়েছে আওয়ামী লীগ।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচির ভেতরে বিএনপিকে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এর আড়ালে কোনো চক্রান্ত করে সফল হওয়ার সুযোগ নেই।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে সংঘাত-সহিংসতা করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ বরাবরই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আচরণে বিশ্বাসী।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, বিএনপির লক্ষ্য হলো সংঘাত-সহিংসতা। এই তথ্য সরকার ও আওয়ামী লীগের কাছে রয়েছে। ফলে বিএনপিকে দমন করার সুযোগ তারাই সরকারের হাতে তুলে দেবে। সেই সুযোগই কাজে লাগিয়ে বিএনপির আন্দোলন সামলাবে আওয়ামী লীগ। পাল্টাপাল্টি ও পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মসূচিগুলো এখনো পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ রয়েছে। অশান্ত হয়ে উঠলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে কোনো নড়চড় হবে না। রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, তাদের মতো গণভিত্তিসম্পন্ন দলের জন্য বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা করা তেমন কোনো ঘটনা নয়। ভেতরে-ভেতরে আওয়ামী লীগ সেই প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছে। সারা দেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সার্বক্ষণিক মাঠে থাকতে বলা হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা যেমন আছে, আন্দোলন কীভাবে দমন ও মোকাবিলা করতে হয় সে অভিজ্ঞতা আরও বেশি আছে।
তারা আরও বলেন, বিএনপির সর্বোচ্চ আন্দোলন ছিল ২০১৪ সালের জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ। সেটা মোকাবিলা করেছেন তারা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে যখন কারাগারে নেওয়া হয় তখনো বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছেন। মতিঝিলে হেফাজতের ইসলামের তাণ্ডব মোকাবিলা করেছেন। সবার ভিত্তি-শক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ওয়াকিবহাল।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা আরও বলেন, বিএনপিকে মুঠোবন্দি করতে আরও কিছু কৌশল নেওয়া আছে ক্ষমতাসীনদের। মাঠের শক্তিতে বিএনপি কখনই আওয়ামী লীগের সঙ্গে পেরে উঠবে না, সেই বিশ্বাস ক্ষমতাসীনদের রয়েছে। সেটার জন্য সময় ও সুযোগের প্রয়োজন রয়েছে। মাঠ আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে, নির্বাচন পর্যন্ত দখলে রাখা হবে। আওয়ামী লীগ সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করছে।
দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, দেশ-বিদেশে বিএনপির অভিযোগ, কর্মসূচি পালনে সরকার তাদের ‘স্পেস’ দিচ্ছে না। বিএনপিকে মাঠে নামার সুযোগ দিয়ে বিদেশিদের বোঝাতে চান বিএনপির এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিদেশিদের তারা জানিয়েছেন বিএনপির আন্দোলন মানে সংঘাত-সহিংসতা, সেটা প্রমাণ করার প্রয়োজন বলে এই ছাড় দেওয়া। বিএনপি নিশ্চয়ই সুযোগ দেবে এর সদ্ব্যবহার আওয়ামী লীগ করবে।
দলের কেন্দ্রীয় আরও কয়েকজন নেতা বলেন, কৌশলে আরও রয়েছে। তা হলো বিএনপির নিচের ও মধ্যমসারির নেতাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা। এজন্য তাদের বাসাবাড়িতে পুলিশের তল্লাশি অব্যাহত রাখা। বড় নেতাদের বিরুদ্ধে পুরনো ও নতুন মামলা দিয়ে যতটা নিষ্ক্রিয় ও দমন করা যায় সেই কৌশলও আছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতা অনেকের পুরনো মামলার রায় দিয়ে তাদের নির্বাচনে অযোগ্য করার কৌশলও আছে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির সিনিয়র একটা অংশকে আওয়ামী লীগ হাতে আনার পথ পেয়ে যাবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। বিএনপির বড় একটি অংশের নেতাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কিছু সম্পর্ক, কিছু অনিয়মের রেকর্ড আছে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে, প্রয়োজন পড়লে অস্ত্র হিসেবে সেগুলোও ব্যবহার করা হবে। ইস্যু হাতে না নিয়ে বিএনপিকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার কোনো পদক্ষেপ এ মুহূর্তে নিতে চায় না সরকারি দল।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টি করে সুযোগ নিতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত হাতে দমন করবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি রাজনীতির ভেতর থাকলে সবকিছু ঠিক থাকবে। এর বাইরে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করতে চাইলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে বিএনপিকে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, ‘যদি কোনো ধরনের সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি হয়, তাহলে তার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রয়েছে, তারা পদক্ষেপ নেবে। আমরা মূলত জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি পুরনো রাজনৈতিক দল। রাজনীতির অপশক্তির সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় তা আওয়ামী লীগ ভালোভাবেই জানে। এ কারণেই তারা কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় আছেন। প্রতিদিন আওয়ামী লীগের লোকজন রাস্তায় থাকবে।
আজম বলেন, যখন যে ধরনের ঘটনা ঘটবে তার পরিপ্রেক্ষিতেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে আওয়ামী লীগ।
